ফিরে দেখা ঘটনাপ্রবাহ বলছে, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে ৮টা। এশার নামাজ আদায় করতে নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে উপস্থিত হয়েছিলেন ৩৮ জন মুসল্লি। হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ। এতে দগ্ধ হন সবাই। আর এই ঘটনায় ৩৪ জনের প্রাণহানি পুরো দেশকে কাঁদিয়েছিল।
নিশ্চয়ই এখনো সবার মনে আছে রাজধানী ঢাকার মগবাজার ওয়্যারলেস গেট এলাকার সেই ঘটনাটি। ২০২১ সালের ২৭ জুন রাত ৮টার দিকে ওই এলাকার ৭৯ আউটার সার্কুলার রোডের তিনতলা পুরনো ভবনের নিচতলার একটি শর্মার দোকানে আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান ১২ জন। তিতাস গ্যাসের লিকেজ থেকে গ্যাস জমে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল বলে ফায়ার সার্ভিস তখন দাবি করে।
বড় এই দুই ঘটনার পর তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি যদি পাইপলাইনের লিকেজ সারানোর কাজটি করত, তাহলে নিয়মিত বিতরণে এমন দুর্ঘটনার ঘটনা চলমান থাকত না। রাজধানীর নিকটবর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জে গত ১০ থেকে ১৩ মের মধ্যে তিনটি গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১০ তারিখের ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত একই পরিবারের তিনজন মারা গেছেন। এই দুর্ঘটনার দুটি ঘটনা ঘটেছে তিতাসের পাইপলাইনে লিকেজ থেকে। তিতাসের পাইপলাইনের লিকেজ আর কত মানুষের জীবন কেড়ে নেবে, তা কেউ জানে না। একই সঙ্গে তিতাসের পাইপলাইনে ঠিক কত লিকেজ বা ছিদ্র রয়েছে, তাও তিতাস বলতে পারছে না। পুরনো পাইপলাইন অপসারণ করে নতুন পাইপলাইন বসানোর উদ্যোগও দীর্ঘদিন ঝুলে আছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান দেশ রূপান্তরকে গতকাল সন্ধ্যায় জানান, ১০ মে নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় এক পরিবারের ৫ জনের ৪ জন মারা গেছেন। ১১ মের ঘটনায় এক পরিবারের ৪ জনের ২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং ১৩ তারিখের ঘটনায় ১২ জনের মধ্যে ২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রত্যেকটি ঘটনার পর তদন্ত হয়। ফায়ার সার্ভিস এবং পুলিশি তদন্তে তিতাসের অবহেলা এবং অবহেলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্তও করা হয়। অন্যদিকে তিতাস ঘটনার পর নিজেরাই একটি তদন্ত করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। ইতিপূর্বে দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জ মসজিদে বিস্ফোরণের পর সরকার কঠোর হলে কারওয়ান বাজারের ব্যস্ত রাস্তায় নেমে আসেন তিতাসের কর্মচারীরা। কর্মচারীদের লেলিয়ে দিয়ে পেছন থেকে ফায়দা লোটেন কর্মকর্তারা। তিতাসের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিলে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার ঘটনাও তখন ঘটেছে। এতে করে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। দায়ীদের শাস্তি না হওয়ায় মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অন্তত মগবাজার এবং নারায়ণগঞ্জ বিস্ফোরণের পর এমনটাই দেখা গেছে।
নারায়ণগঞ্জের পাইপলাইন অতিশয় পুরনো
তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির গড়ে ওঠার ইতিহাস বলছে, ১৯৬২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিতাস নদীর তীরে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। এই খনি থেকে ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা কর্র্তৃক ১৪ ইঞ্চি ব্যাসের ৫৮ মাইল দীর্ঘ তিতাস-ডেমরা সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের পর ১৯৬৮ সালের ২৮ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। সেই হিসেবে দেখা যায়, তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বেশিরভাগ লাইন ৭০-এর দশকে অর্থাৎ ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সালে নির্মাণ করা হয়। সংগত কারণে বহু আগেই এসব লাইনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। সাধারণত স্টিল গ্যাস লাইনের মেয়াদ থাকে ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। তবে বাংলাদেশে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি প্রায় লেগেই থাকে। গ্যাস কোম্পানি ছাড়াও সিটি করপোরেশন, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন এবং বিদ্যুৎ কোম্পানিও রাস্তা খুঁড়ে থাকে। এ সময় গ্যাস লাইনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে পাইপলাইনের আয়ু আরও কমে যায়।
তিতাসের পাইপে আসলে কত লিকেজ
তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির একটি জরুরি কল সেন্টার রয়েছে। সেই কল সেন্টারটিতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাধারণ মানুষ ৫ হাজার ৭৯৬টি গ্যাস লিকেজের ঘটনা ফোন করে জানিয়েছে। এর পরের বছর ২০২৩-২৪ সময়ে গ্যাস লিকেজের ৬ হাজার ১০৫টি ফোনকল রিসিভ করা হয়েছে। এছাড়াও তিতাস গ্যাস তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২১-২২ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ঢাকা মহানগর এলাকায় ৮৭ দিনের একটি জরিপ করে তিতাস। এতে ৯৭৯ কিলোমিটার জরিপ করা হয়। এতে তিতাসের হিসেবেই ৭ হাজার ৩৫টি লিকেজ ধরা পড়ে। লিকেজগুলোর মধ্যে রাইজারের ১ হাজার ২৩১টি এবং মাটির নিচে ১ হাজার ২০৪টি লিকেজ সংস্কার করা হয়। তিতাসের ১৩ হাজার ১৯৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন রয়েছে। এর মধ্যে ৯৭৯ কিলোমিটার জরিপ করা হয়েছে। কাজেই নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছে না, তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির পাইপলাইনে কতগুলো লিকেজ রয়েছে।
পাইপলাইন বদলের প্রকল্প দীর্ঘদিন ঝুলে আছে
ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জের একাংশের অতিপুরনো ২ হাজার ১৭ কিলোমিটার পাইপলাইন বদলের জন্য তিতাস একটি প্রকল্প দীর্ঘদিন আগে হাতে নিয়েছে। তবে এখনো এই প্রকল্পে সরকারের অনুমোদন মেলেনি। ৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে ঢাকা মহানগরীর এক-তৃতীয়াংশ এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার পাইপলাইনের একটি অংশ বদল করার কথা ছিল। প্রকল্পটি একবার প্রি-একনেক বৈঠকে উঠেছিল। কিন্তু বিশাল এই কাজ করতে গিয়ে ঢাকার প্রায় প্রতিটি রাস্তা কাটতে হবে। এতে জনদুর্ভোগ বেড়ে যাবে। কী করে তিতাস তা মোকাবিলা করবে, তার পরিকল্পনা করার নির্দেশ দিয়ে প্রকল্পটি ফেরত পাঠানো হয়। তিতাস এরপর সিটি করপোরেশন, ওয়াসাসহ সব সেবা সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করে পুনরায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জ্বালানি বিভাগে পাঠিয়েছে। কিন্তু জ্বালানি বিভাগ এখনো প্রকল্পটির বিষয়ে তিতাসকে কোনো কিছু অবহিত করেনি। তবে গত মাসে এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এই প্রকল্প হলেই যে সব গ্যাস লিকেজ কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বসে বোঝা যাবে, তা নয়। এই প্রকল্পে শুধু গ্যাস স্টেশনের চাপ বোঝার জন্য স্কাডা সিস্টেম রাখা হয়েছে।
জানতে চাইলে তিতাসের প্ল্যানিং ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী সত্যজিৎ ঘোষ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন এই পাইপলাইনের পুরো জায়গায় স্কাডা সিস্টেম বসানো হলে কন্ট্রোলরুমে বসেই গ্যাস লাইনের লিকেজ ধরা সম্ভব হতো। স্মার্ট মিটারিং, স্মার্ট সরবরাহব্যবস্থা যোগ করতে হলে বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। এসব কথা চিন্তা করে তা করা হয়নি।
শুধু জীবন না, সম্পদও বিনষ্ট হচ্ছে
এক সময় দেশের সবগুলো গ্যাস কোম্পানি ক্যাপিটাল গেইন করত। অর্থাৎ যে পরিমাণ গ্যাস তারা পেট্রোবাংলার কাছ থেকে কিনত, তার চেয়ে বেশি বিক্রি করে অর্থ আয় করত। কিন্তু তিতাসে এখন প্রায় ১০ ভাগের মতো ক্রয় ও বিক্রির মধ্যে ঘাটতি রয়েছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিতাস ১৩ হাজার ৭১৭.৯৮ এমএমসিএম গ্যাস বিতরণ করেছে। এতে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩৫ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। তিতাস বলছে, গত বছর তিতাস যে গ্যাস সরবরাহ পেয়েছে, সেখান থেকে ৯ দশমিক ৪৭ ভাগ গ্যাস কম বিক্রি করেছে। অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সিস্টেমলস দুই ভাগ নির্ধারণ করে দেওয়ায় ৭ দশমিক ৪৭ ভাগকে পদ্ধতিগত লোকসান বলছে তিতাস।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, এই দুর্ঘটনায় কারও কারও দায় নেওয়া উচিত। এতগুলো জীবন চলে যাচ্ছে, এটা হতে পারে না। তিতাসের বেশিরভাগ লাইন অনেক পুরনো। এগুলো পরিবর্তন করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব ভাল্ব ও রাইজার ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলোর মান এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার সময় পরিবর্তনের বিষয় নজর রাখা উচিত। তিনি মনে করেন, যে কোনো দুর্ঘটনার পর নির্মোহ তদন্ত হয় না। এতে করে প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায় না।