আগস্ট ঘিরে পুলিশে চাপা ‘আতঙ্ক’

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৯ এএম

আগস্ট মাস ঘিরে পুলিশে শুরু হয়েছে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক। সম্প্রতি মেট্রোরেল স্টেশন ও সাভারে বোমা উদ্ধার এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অপতৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সতর্কতা জারি করে সব জেলার এসপিসহ ইউনিট প্রধানদের বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। কোনো স্থানে বোমার তথ্য পেলে তা উড়িয়ে না দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশের প্রত্যেক সদস্যকে সাবধানে চলাফেরার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং পোশাক পরে একা চলাফেরা করতে বারণ করা হয়েছে।

বার্তা পেয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা গতকাল বিশেষ বৈঠক করেছেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ চিহ্নিত অপরাধীদের ধরতে বিশেষ ছক আঁকা হয়েছে। তা ছাড়া দেশের বাইরে থেকে কেউ যেন কলকাঠি নাড়তে না পারে, সেই জন্য মোবাইল ট্র্যাকিং করতে সাইবার ইউনিটের কাছে নির্দেশনা এসেছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশ সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান দিবস এবং ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীকে সামনে রেখে নাশকতার পরিকল্পনা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ পলাতক শীর্ষ নেতা ও দোসররা। একদিকে শোক আরেক দিকে পরাজয়ের মাস হিসেবে আগস্ট ঘিরে নাশকতার নীলনকশা প্রণয়নের চেষ্টা চলছে দলটি। সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের উদ্দেশে বিক্ষোভ মিছিল, মিছিল থেকে নাশকতা ও চোরাগোপ্তা হামলা এ রকমটাই আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দারা। এই নাশকতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামীপন্থি কিছু সদস্যের সহযোগিতারও আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের নাশকতার আশঙ্কাও করা হচ্ছে।

এ ছাড়া সম্প্রতি মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে হাতবোমা এবং ফার্মগেট ও মিরপুর-১০ স্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ বস্তু, সাভারের আশুলিয়ায় বোমা উদ্ধারের ঘটনাও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এরই মধ্যে চরমপন্থি গোষ্ঠী বা অন্য দুষ্কৃতকারীরা পুলিশের গাড়িতে হামলা করতে পারে গোয়েন্দা সংস্থার এমন সতর্কবার্তার পর দেশব্যাপী সতর্কতা জারি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এসব কর্মকাণ্ডে আগস্ট মাস ঘিরে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে পুলিশের মধ্যে।

যদিও সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট কোনো হুমকির তথ্য নেই। তবু অতীতের অভিজ্ঞতা, গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতির কারণে আগস্টজুড়েই নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে নেওয়া হয়েছে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। এর অংশ হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ও প্রবেশমুখে তল্লাশিচৌকি বসানো, আবাসিক হোটেল ও মেসে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সরকারি দপ্তর, কূটনৈতিক এলাকা ও জনসমাগমস্থলে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। সামাজিক মাধ্যমে নজরদারিও করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অপরাধ ও আপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যাতে সক্রিয় হতে না পারে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের সবকটি ইউনিট এই নিয়ে কাজ করছে। তালিকাভুক্ত অপরাধীদের ধরতেও পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

চারটি জেলার পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, নাশকতার সুনির্দিষ্ট কোনো হুমকি নেই। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সভামিছিল করার চেষ্টা করছে। কয়েকটি জেলায় পোস্টার টানাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে নানা গুজব ছড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের যেসব স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা গ্রেপ্তার হননি এবং যারা বিদেশে পলাতক রয়েছেন, তারা নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে শনিবার রাতে বিশেষ নির্দেশনা এসেছে। সেই আলোকে থানাগুলোতে বিশেষ সতর্কমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অভিযান বা টহলে সাবধানে চলাফেরা করতে বলা হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, দেশের ভেতরে গা-ঢাকা দিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে এসব নাশকতায় সম্পৃক্ত হতে। এ ছাড়া অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কিন্তু দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ এমন কর্মীদের বাছাই করা হয়েছে। এসব কাজের জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে। দেশের বাইরে থেকে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে এসব অর্থ।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, দেশজুড়ে ধারাবাহিক বোমা হামলার হুমকি এবং সন্দেহজনক বস্তু উদ্ধারের পর পুলিশকে সম্প্রতি যে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছিল, তা পুলিশের গাড়িতে পরিকল্পিত হামলা সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ছিল না, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের অংশ ছিল। পুলিশ যানবাহন ও স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিতে আগেও একই ধরনের নির্দেশনা জারি হয়েছিল। মতিঝিলে বোমা রাখার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি বা মতাদর্শ প্রচারের জন্যই এসব করা হচ্ছে।

এদিকে অনেক দিন রাজপথে নিষ্ক্রিয় থাকার পর ফের সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। গত ৩১ জুলাই সকালে পল্লবী এলাকায় সরকারবিরোধী মিছিল থেকে ১৭ নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ। এর আগে ১৫ জুলাই গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ২০ জনকে আটক করে পুলিশ। এসব কিছু মাথায় রেখে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ৩১ জুলাই পল্লবী থেকে আটক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে পুলিশ জানতে পারে, বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে প্রতিনিয়ত তাদের যোগাযোগ হয়। সেখান থেকে পরিকল্পনা করা হয় যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ‘ঘোলা পানিতে মাছ’ শিকার করতে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা মাঠে নেমেছে। বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আরও একাধিক গ্রুপ সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে মাঠে নামবে।

ডিএমপির দুজন শীর্ষ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঢাকায় নাশকতার পরিকল্পনা করছে। তাই রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টসহ প্রবেশমুখে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে। সন্দেহজনক ব্যক্তি ও গাড়ির ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি আগামী কয়েক দিন বিশেষ অভিযান চলবে। পুলিশের মধ্যে চাপা আতঙ্ক আছে। তারপরও আমরা সক্রিয় আছি। এই দুই কর্মকর্তাদের দাবি, আওয়ামী লীগের কিছু নেতা অনলাইনে ‘ভার্চুয়াল স্কোয়াড’ গড়ে তুলেছে, যারা ফেসবুক, টেলিগ্রাম ও ইউটিউবভিত্তিক চ্যানেলে সামাজিক অস্থিরতা ছড়ানোর কাজ করছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট ও ১৫ আগস্ট ঘিরে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত হওয়ার আহ্বান করে পোস্ট দিচ্ছেন পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তবে সামাজিক মাধ্যম নজরদারিতে রাখার কথা জানিয়েছেন পুলিশের সাইবার ইউনিটের কর্মকর্তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত