রাজধানীর শিশুরা দিনে প্রায় ৫ ঘণ্টা থাকে ডিজিটাল স্ক্রিনে

আক্তার হোসেন (ছদ্মনাম)। বয়স ১০ বছর। তৃতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থী মা-বাবার সঙ্গে থাকে রাজধানীর জুরাইনে। স্কুল শেষে বাসায় ফিরেই সে বসে যায় মোবাইল নিয়ে। সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় কাটে মোবাইলে গেমস খেলে বা ভিডিও দেখে। রাতে ক্লাসের পড়া শেষে আবারও হাতে মোবাইল। খাবার সময়েও চোখ মোবাইলের স্ক্রিনে বা টিভি পর্দায়। বাসার সবাই যথাসময়ে ঘুমিয়ে গেলেও আক্তার প্রায়ই জেগে থাকে রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত। তখনো তার হাতে হয় মোবাইল না হয় চোখ থাকে টিভি পর্দায়।

ছেলের এই অস্বাভাবিকতা নিয়ে আক্তারের বাবা বলেন, ‘মোবাইল না পেলে জেদ ও রাগারাগি করে। গেমসের প্রতি প্রচ- নেশা। মোবাইলে কোনো গেম ঠিক মতো খেলতে না পারলে, কান্নাকাটি করে। মেজাজ খিটখিটে থাকে। কথা শুনতে চায় না।’

শুধু আক্তারই নয়; আইসিডিডিআরবি’র সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকার শিশুদের বড় অংশই মোবাইল, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটারে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে। এতে তাদের ঘুম কমছে, ওজন বাড়ছে, মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে বিরূপ প্রভাব। গবেষকরা বিষয়টিকে অদৃশ্য মহামারী বলে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি ২০২২-২০২৪ সময়ে ঢাকার ছয়টি স্কুলের (তিনটি বাংলা মাধ্যম ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যম) ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ শিশুর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনের ফল প্রকাশ করে জার্নাল অব মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চ (জেএমআইআর) হিউম্যান ফ্যাক্টরস।

গবেষণায় শিশুদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের শারীরিক পরীক্ষা করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু সহজ প্রশ্নপত্র ব্যবহার করেছেন গবেষকরা। তাতে তারা দেখেছেন শিশুরা কত সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে, ঠিকমতো ঘুমায় কি-না, ওজন স্বাভাবিক কি-না এবং আচরণ বা মানসিক স্বাস্থ্যে কোনো সমস্যা আছে কি-না। এই প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে শিশুদের ঘুম, আচরণ ও মানসিক অবস্থার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রশ্নপত্রে পিটসবার্গ সিøপ কোয়ালিটি ইনডেক্স, স্ট্রেংদস অ্যান্ড ডিফিকাল্টিস কোয়েশ্চেনেয়ার এবং ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েল-বিয়িং অ্যাসেসমেন্ট (ডিএডব্লিউবিএ) অন্তর্ভুক্ত ছিল।

গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, প্রতি ৫ জন শিশুর মধ্যে ৪ জন শিশু (৮৩%) প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে, যা শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমা ছাড়িয়েছে। এই শিশুরা স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার এবং গেমিং ডিভাইসে দিনে প্রায় ৪.৬ ঘণ্টা সময়  কাটায়।

গবেষণায় আরও জানা গেছে, এক-তৃতীয়ংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথাব্যথায় ভুগছে। যারা দিনে ২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭.৩ ঘণ্টা ঘুমায়, যা এই বয়সের শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ঘুমের তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার এবং যারা বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে তাদের মধ্যে এই হার বেশি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শৈশবে দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের অভাব স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষণা প্রতিবেদন থেকে আরও জানা গেছে, প্রতি ৫ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ২ জন শিশু দুশ্চিন্তা, অতি-চঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যার মতো এক বা একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, রাতে স্ক্রিন ব্যবহার মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে ঘুমের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত করে। তারা বলছেন, অতিরিক্ত সময় স্ক্রিন ব্যবহারে শিশুদের অন্যের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশা কমে যায়, যা তাদের মন-মেজাজ, অনুভূতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে অপর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, স্থূলতা, উদ্বেগ এবং পড়াশোনায় দুর্বল ফলাফলের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এই গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআরবি’র সহকারী সায়েন্টিস্ট ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, ‘বাবা-মায়ের উচিত শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, মাথাব্যথা, চোখের অস্বস্তি, খিটখিটে মেজাজ বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার মতো লক্ষণগুলো উপেক্ষা না করা। কারণ এগুলো অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের বিরূপ প্রভাব হতে পারে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা এক অভিভাবক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সন্তানদের স্ক্রিনে ডুবে থাকার জন্য আমরা বাবা-মায়েরাই দায়ী।’ তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় কান্না থামাতে এবং খাবার খাওয়াতে সন্তানের হাতে আমরাই মোবাইল তুলে দিই। তারপর ধীরে ধীরে শিশু এতে অভ্যন্ত হয়ে ওঠে।’

আক্ষেপ করে বাড্ডার এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমার ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তার বন্ধুদের কারও মোবাইল কারও ট্যাব আছে। এ জন্য প্রায়ই মন খারাপ করে থাকত। পরে ওকেও ট্যাব কিনে দিই। এখন তো ট্যাব নিয়েই সারাক্ষণ পড়ে থাকে।’

এই পরিস্থিতির জন্য শুধু অভিভাবক নয়; সমাজ-সরকার-রাষ্ট্রও দায়ী বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘মা-বাবাকে পুরোপুরি দায়ী করা যাবে না। সামাজিকভাবে যদি এটা চলে তাহলে মা-বাবা কতটা ঠেকিয়ে রাখবেন? এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। সামাজিকভাবে একটা পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘যে দেশে শিশুদের খেলার মাঠ, বিনোদনের পার্ক ইত্যাদি যত কমতে থাকে, সে দেশে কারাগার এবং হাসপাতালের সংখ্যা তত বাড়তে থাকে। এজন্য অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি সমাজকেও দায়বদ্ধ হতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘দখলকৃত খেলার মাঠ, পাবলিক স্পেসগুলো ফিরিয়ে আনা হোক এবং প্রত্যেক অভিভাবককে উৎসাহিত করতে হবে যেন শিশুকে প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টার জন্য খেলতে নিয়ে যান।’

গবেষকরা শিশুদের চোখের যতেœ ‘২০-২০-২০’ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে হবে। আইসিডিডিআরবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘ডিজিটাল ডিভাইস এখন জীবনের অংশ হলেও শিশুদের সুস্থতায় এর সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বাবা-মায়ের উচিত সন্তানের শারীরিক ও মানসিক বেড়ে ওঠায় সাহায্য করতে তাদের ডিজিটাল ডিভাইসমুক্ত পারিবারিক পরিবেশে সময় কাটাতে উৎসাহিত করা।’

গবেষকরা বলেছেন, প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা কোনো সমাধান নয় বরং বাড়িতে ও স্কুলে শিশুদের স্বাস্থ্যকর এবং ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এজন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য সহজ নির্দেশিকা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। তারা বলছেন, শিশুদের এই অদৃশ্য মহামারী থেকে বাঁচাতে পদক্ষেপমূলক গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম শুরুর এখনই উপযুক্ত সময়।