বৈশ্বিক অবস্থানে বড় ধস যুক্তরাষ্ট্রের

দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তনের এক বছর পার হতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় রেকর্ড ধস নেমেছে। শুল্ক আরোপ থেকে শুরু করে উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ ট্রাম্পের এমন নানা সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে যেমন গোলযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিতে। নেতিবাচকভাবে দেখা দেশের তালিকায় বর্তমানে পঞ্চম স্থানে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক ডেটা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নিরা ডেটা’ প্রকাশিত ২০২৬ সালের গণতন্ত্র ও দেশ-সম্পর্কিত এক বৈশ্বিক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। ১২৯টি দেশ ও তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মোট ৪৬ হাজার ৬৬৭ জন উত্তরদাতার মতামতের ভিত্তিতে এই জরিপ তৈরি করা হয়েছে। জরিপটি বলছে, বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় এখন ইসরায়েলকে সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। নেতিবাচকভাবে দেখা দেশের তালিকায় ইসরায়েলের সঙ্গে আছে উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরান। আর বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে ইতিবাচক মনোভাব থাকা শীর্ষ পাঁচ দেশ হলো সুইজারল্যান্ড, কানাডা, জাপান, সুইডেন ও ইতালি।

তালিকাটি নিরা ডেটার ‘ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৬’ (গণতন্ত্র ধারণা সূচক, ২০২৬) এর সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ৯৮টি দেশের ৯৪ হাজার ১৪৬ জন নাগরিক তাদের দেশের গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা কেমন, সে বিষয়ে সরাসরি মতামত দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে ওয়াশিংটন এখন বিশ্বের সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন হওয়া পাঁচ দেশের তালিকায় জায়গা পেয়েছে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে তারা এখন রাশিয়া ও চীনেরও নিচে নেমে গেছে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের নেট রেটিং বা স্কোর ২০২৪ সালের প্লাস ২২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে মাইনাস ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ৩৮ পয়েন্টের বড় পতন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির প্রতি বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা ক্ষোভের কারণেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের এ পতন হয়েছে। ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন, আগ্রাসী শুল্কনীতি, গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি, ইউক্রেনে সহায়তা হ্রাস, উপসাগরীয় অঞ্চলে ইসরায়েল কেন্দ্রিক অবস্থান এই পতনের অন্যতম কারণ। জরিপ অনুযায়ী, রাশিয়া ও ইসরায়েলের পর যুক্তরাষ্ট্রকে এখন বিশ্বের জন্য একটি বড় বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ গণতন্ত্র মূল্যায়ন সূচকটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বার্ষিক গণতান্ত্রিক জরিপ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি অন্যান্য সূচকের মতো না হয়ে, এটি সরাসরি নাগরিকদের কাছ থেকে মতামত নেয়। এতে নির্বাচন, বাক্স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, নাগরিক শিক্ষা, ক্ষমতার পৃথককরণ, আইনের শাসন, সরকারি স্বচ্ছতা ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার হস্তান্তর সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা জানতে চাওয়া হয়।

সবচেয়ে অপ্রিয় দেশ ইসরায়েল

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত হত্যা, ফিলিস্তিনিদের গণবাস্তুচ্যুতি, অনাহার নীতি ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল যে দিন দিন একঘরে হয়ে পড়ছে, এই জরিপের ফলাফল তারই আরেক বড় প্রমাণ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক আদালতগুলো দখলদার এ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন গুরুতর লঙ্ঘনের বিষয়ে সতর্ক করার পর থেকেই বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ধসে পড়েছে।

গাজায় নৃশংস হামলা চালানোর পর থেকে বিশ্বজুড়ে জনমত তীব্রভাবে বিপক্ষে চলে যাওয়ার কারণেই মূলত দখলদার ইসরায়েলের এমন নেতিবাচক অবস্থান। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল ৭৪ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, গাজার অধিকাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করেছে এবং প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করেছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও গণহত্যাবিষয়ক গবেষকরা গাজার এই পরিস্থিতিকে একটি পরিকল্পিত জাতিগত হত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জরিপের ফলাফল স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে ইসরায়েলকে ক্রমাগত সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়ায় ওয়াশিংটনকে বড় ধরনের খেসারত দিতে হচ্ছে। একের পর এক যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনগুলো জাতিসংঘে ইসরায়েলকে জবাবদিহি করা থেকে রক্ষা করেছে এবং অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। তবে এ জরিপ দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক জনমত এখন ওয়াশিংটনের শক্তিকে বিচারহীনতা, দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ ও মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করার যুদ্ধের এক প্রতীক হিসেবেই বেশি দেখছে।