পাঁচ মাস পেরোলেও উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাত অবসানে কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি। উল্টো পালটাপালটি হামলার মাধ্যমে তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলটিতে উত্তেজনা জিইয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, ইরানের জ¦ালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে নতুন হামলার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। কিন্তু একদিন বাদেই নিজের অবস্থান বদলে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের ওপর পরিকল্পিত বড় ধরনের সামরিক হামলা বাতিল করেছেন তিনি। একটি চুক্তির মূল শর্তাবলি বা রূপরেখা নিয়ে সমঝোতা হয়েছে দাবি করে ট্রাম্প বলেন, ইরানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুরোধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তেহরান কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানে ইতিমধ্যে কৌশলগত পরাজয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ায় মিত্রদের আস্থা হারাচ্ছে ওয়াশিংটন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ঘন ঘন লক্ষ্য পরিবর্তনের কারণে সামরিক ও কূটনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই মিত্রদের আস্থা কমছে।
এই সংঘাতে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে থাকলেও ইরানে সেই শক্তিকে টেকসইভাবে কাজে লাগাতে না পারার ব্যর্থতাকে দুর্বলতা হিসেবেই দেখছে মিত্র দেশগুলো। তারা বলছে, ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর মূল উদ্দেশ্যগুলো এখনো পূরণ হয়নি এবং বিশ্বজুড়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের সংকটে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এই মুহূর্তে তুলনামূলক কট্টরপন্থি এক সরকারের অধীনে ইরানকে অনেকটাই অনড় মনে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার মুখে দেশটির পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া, জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিও মূলত তেহরানের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়কেই দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে।
লন্ডনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের সাবেক পরিচালক রবিন নিবলেট বলেন, যুদ্ধের রূপ ভবিষ্যতে পরিবর্তিত হতে পারে, তবে এ পর্যন্ত যা অর্জিত হয়েছে তা ‘একটি কৌশলগত ক্ষতি এবং অত্যন্ত চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি’। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এবং যারা নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে, তাদের জন্য এটি আবার প্রমাণ করল যে, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায় না। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলি ভায়েজ জানান, উপসাগরীয় মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্ব পুরোপুরি ছিন্ন করার মতো অবস্থায় না থাকলেও, তারা দেখছে এই যুদ্ধ কীভাবে তাদের নিজেদের নিরাপত্তাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ফলে তারা ইতিমধ্যেই বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেছে; তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং ইউরোপ, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
মিত্রদের নিরাপত্তার জামিনদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যে তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে, তার প্রমাণ হিসেবে বেশ কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেন আলি ভায়েজ। এর মধ্যে গত সপ্তাহে সৌদি আরবের সঙ্গে এক ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির ঘোষণার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হঠাৎ করে ট্রাম্পের দাবির পরিবর্তন ঘটার বিষয়টিও রয়েছে। আলি ভায়েজ বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ট্রাম্প নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেন। এটাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসের সংকট। এখন আর তাদের সামরিক পরাক্রম বা কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি কোনোটির ওপরই ভরসা করা যায় না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণভাবে আরও শক্তিশালী করেছিল এবং বিশ্বে ওয়াশিংটনের প্রভাব বাড়িয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাফল্যের খতিয়ান বেশ মিশ্র। ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তান ৩ দেশেই তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখে পিছু হটতে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রকে একই পথে হাঁটতে হতে পারে যেখানে ক্ষয়ক্ষতির বোঝা কমিয়ে পিছু হটার যুক্তিসংগত কোনো বাহানা হয়তো শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকেই খুঁজতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও বর্তমানে কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, এই সংঘাত ইতিমধ্যেই ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিরোধ সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে দুর্বল করেছে, মিত্রদের অসন্তুষ্ট করেছে এবং শত্রুপক্ষকে আনন্দিত করেছে’। আর হরমুজ প্রণালি যদি সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবে চলে যায়, তবে এটি কোনো কৌশলগত পরাজয়ের চেয়ে কম কিছু হবে না।
