এআইয়ের ব্যবহার শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুতগতিতে এবং বুদ্ধিমান থেকে নির্বোধও এর প্রেমে মাতোয়ারা। এআই যে প্রায় সব শ্রেণি-পেশার এবং আবালবৃদ্ধবনিতার সমাদর লাভ করছে তার মূল কারণ এর সহজলভ্যতা, প্রয়োজন মেটানোর দক্ষতা এবং তাৎক্ষণিক সাফল্য। এআইয়ের কাজও বহুবিধ : ছোটখাটো অনুবাদ থেকে শুরু করে সব রকম বিষয়েই পরামর্শ, এমনকি গবেষণাও সহস্র এক রজনীর জিনের মতো মুহূর্তেই হাজির করতে পারে। চিকিৎসা বিষয়ক পরামর্শ থেকে শুরু করে জ্ঞান বিজ্ঞানের বহু জটিল বিষয়ে রয়েছে তার অবাধ যাতায়াত। না, শুধু যাতায়াতই নয়, জ্ঞান সে উৎপাদনও করতে পারে। এই ছোট পরিসরে এআইয়ের বিশাল পরিধি সম্পর্কে আলোচনা সম্ভব নয়। আমরা সাহিত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব।
তার আগে সব কাজের কাজী এই এআই নিয়ে যে তর্ক চলমান সেই দিকটাও খানিকটা ছুঁয়ে যাব। এআইয়ের প্রায় সূচনা থেকেই তর্ক উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? এ কি সত্যি সত্যিই আমাদের উদ্ধারকর্তার ভূমিকায় থাকবে নাকি আমাদের গভীর-গভীরতর কোনো সংকটের দিকে নিয়ে যাবে। যুক্তি দুপক্ষেই প্রবল। এআই দিয়ে লাভ যে হয় না তা অস্বীকার করা যাবে না। আমি নিজে এআইয়ের সাধারণ ব্যবহারের পক্ষে। সাধারণ বলতে এমন কিছু ব্যবহার, যা মানুষকে সত্যি সত্যি দ্রুত উদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা সাফল্যের সঙ্গেই পালন করে থাকে।
কিন্তু উদ্বিগ্ন বোধ করি যখন এআই ব্যবহার করা হয় সৃজনশীল বা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে; গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা এবং অনুবাদের মতো সৃষ্টিশীল শাখায়। শুনতে পাচ্ছি Claud, Chatgpt, Gemini: এদের যে কাউকেই কিছু Key-word কিংবা বিষয় বলে দিলেই মুহূর্তের মধ্যে আপনার কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি হাজির করছে। কীভাবে সম্ভব হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পক্ষে এসব কাজ করা? সম্ভব হচ্ছে কারণ আমাদের অর্জিত ও সঞ্চিত জ্ঞানই এআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সেসবেরই সমন্বিত ও মিশ্র এক রূপ বিষয়ভিত্তিকভাব আমাদের কাছেই প্রয়োজনে হাজির করছে। জ্ঞান আগে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হতো মুখস্থ করা, চর্চা আর ভাবনার মাধ্যমে। আমরা প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য আবিষ্কারের ফলে এখন মুখস্থ করা, চর্চা ও ভাবনার ভার এআইয়ের ওপর ছেড়ে দিয়ে পরিশ্রম ও সময় বাঁচাচ্ছি। কেউ কেউ এর পক্ষে সাফাইও গাইছেন। সত্যি সত্যি যদি এভাবে জ্ঞান অর্জনের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাই, তাহলে পাল্টা আরেকটা যুক্তিও হাজির করা সম্ভব : যা আপনার অর্জিত নয় তা কী করে আপনার জ্ঞান হয়? সবাই যদি এভাবেই জ্ঞান অর্জন করে জ্ঞানী হয়ে ওঠেন তাহলে জ্ঞানী হওয়ার মধ্যে বিশেষত্ব কিছু নেই। যে জ্ঞান অভিজ্ঞতা, পাঠের পরিশ্রম আর চিন্তাভাবনা থেকে অর্জিত হয় না, তাকে জ্ঞান বলা যায় কি? গৌতম বুদ্ধ যে প্রক্রিয়ায় জীবন ও জগতের অর্থ উপলব্ধি করেছিলেন তা কি এআইয়ের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব ছিল? প্রশ্ন এটাও এআইয়ের ব্যবহার মানুষকে পরিশ্রমবিমুখ অলস মানুষে পরিণত করছে।
কেউ কেউ আজকাল নিজের অজ্ঞতা আড়াল ও দ্রুত সময়ে অনুবাদের জন্য এআই ব্যবহার করছেন। এআই সাধারণ টেক্সট অনুবাদের ক্ষেত্রে ভুল খুব একটা করে বলে মনে হয় না। কিন্তু সাহিত্যিক রচনা অনুবাদ শতভাগ সাফল্যের সঙ্গে যদি নাও বলি, কতভাগ সাফল্যের সঙ্গে সে করতে পারে? কেউ কেউ বলছেন এআই ৭০-৮০ ভাগই নাকি সাফল্যের সঙ্গে অনুবাদ করতে পারে। বাকিটা নাকি সম্পাদনা করে নিলেই শতভাগ সফল এক অনুবাদ হয়ে যায়। খুব জরুরি দুটো প্রশ্ন সামনে চলে আসবে এই সূত্রে : প্রথমত, এআই যদি ৭০-৮০ ভাগই করে দেয় তাহলে সেই অনুবাদে কি নিজের নাম দেওয়া উচিত হবে?
পশ্চিমী প্রকাশনা সংস্থাগুলোয় নতুন লেখকের যে কোনো পাণ্ডুলিপি যখন সম্পাদনা পরিষদের মাধ্যমে চূড়ান্ত হয় তখন সেই পাণ্ডুলিপিতে সম্পাদকদের সংযোজন, পরিমার্জন, সংশোধন ও পরামর্শ যুক্ত হয়, কিন্তু সেই পাণ্ডুলিপি প্রকাশের সময় শুধু লেখকের নামই থাকে, সম্পাদকদের নাম তাতে থাকে না। এআই কর্তৃক অনূদিত অনুবাদটিতে এআইয়ের নাম ব্যবহার করব? না করলে কেন করব না? ধরে নিচ্ছি ওই সব প্রকাশনা সংস্থা ওই সম্পাদকদের তাদের কাজের জন্য সম্মানী দেয়, তাই সেখানে নাম দেওয়ার প্রশ্ন আসে না। কিন্তু আমাদের যেসব অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, এমনকি কথাসাহিত্যিকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিয়ে কোনো লেখা বা গ্রন্থ প্রকাশ করছেন তারা কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বীকৃতি দিতে রাজি হবেন? অন্যের সহযোগিতাকে অস্বীকার করা হচ্ছে এক ধরনের অনৈতিকতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নিজে যা নয় তা প্রতিপন্ন করার মধ্যেও রয়েছে এক ধরনের প্রতারণার মানসিকতা। বিনা পয়সার এআই আমাদের নিজেদের এমন এক ভুয়া পরিচয় নির্মাণে সহযোগিতা করছে। এমন এক নৈতিক সংকট তৈরি করেছে, যা সত্যিকারের ভাবুকতা, সৃজনশীলতা এবং পাঠের স্পৃহাকে নষ্ট করছে। লেখার জগতে এ হচ্ছে এমন এক জালিয়াতি, যার মাধ্যমে পাঠককে প্রতারিত করা হচ্ছে বলে আমি মনে করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এআইয়ের সহযোগিতা কিংবা অন্যের গবেষণাকর্ম চুরি করে তৈরি লেখাকে ‘মৌলিক গবেষণা’ বলে দাবি করার ঘটনা আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের অনৈতিক কর্ম অননুমোদিত হলেও, সাহিত্যক্ষেত্রে এ রকম কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই বলে সাহিত্যের নামে এবং অনুবাদের নামে অসংখ্য গ্রন্থ তৈরি হচ্ছে, যা নতুন কোনো সৃষ্টির পরিবর্তে এআইয়ের ভাণ্ডারে সঞ্চিত জ্ঞানের অনুলিপি তৈরি করে পাঠকের রুচিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
আমাদের মনে রাখা দরকার—এআই যত দক্ষই হোক না কেন, তার হাত দিয়ে কখনো জয়েসের ইউলিসিস কিংবা ফিনেগানস ওয়েক তৈরি করা সম্ভব হবে না। কারণ এই গ্রন্থ দুটি এমন এক ভাষায় রচিত, যা এআইয়ের যুক্তি শৃঙ্খলাপূর্ণ ভাষা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। সম্ভব নয় জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’-এর মতো কবিতা লেখা, যা ভাবনার যুক্তি শৃঙ্খলাকে অস্বীকার করে এমন এক উপলব্ধির দিকে যাত্রা করেছে যেখানে আত্মহত্যার বাস্তব কারণগুলো অনুপস্থিত। জ্ঞান কেবল যুক্তিনির্ভরই না, তা যুক্তি পেরিয়ে এমন স্তরে যেতে পারে, যা যুক্তি দিয়ে বোঝা যাবে না। কিন্তু মানুষের হৃদয়ের এক যুক্তি আছে। এআই সেই যুক্তিকে কখনোই আত্মস্থ করতে পারবে না, যেহেতু সে মানুষের মতো আবেগ আর পরিবর্তনশীল মনের প্রতিফলন নয়। যদি সে কখনো সে রকম হয়ে ওঠে তাহলে সে মানবীয় সত্তা হয়ে উঠবে। কিন্তু তা কখনোই হওয়ার নয়।
মানুষ নিজে জ্ঞানচর্চার ভার যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দিয়ে একদিকে আলস্যকে বরণ করেছে, কিন্তু নিজেকে জ্ঞানী ভাবার লোভটি ত্যাগ করতে চায় না। নিজে অজ্ঞ হলেও বিশেষজ্ঞ বা জ্ঞানী হওয়ার ভান তাকে করতেই হবে—এআই আমাদের এই ব্যাধি উপহার দিয়েছে। যন্ত্রের মাধ্যমে দুর্বল, ত্রুটিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর অনুবাদ করে নিজেকে বহু ভাষায় দক্ষ বলে প্রমাণ করার যে মিথ্যা ভাবমূর্তি আমরা তৈরি করতে চাইছি তা যে অনৈতিক এক কর্ম সেই বোধকেও বিলুপ্ত করতে চাইছে। এআইয়ের যুগে কেউ আর নির্বোধ থাকতে চাইছে না, সবাই জ্ঞানী হয়ে উঠছে। মানুষের এই প্রবণতা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে মেক্সিকোর বিখ্যাত এক অভিনেতার একটি উক্তির কথা, যা মেক্সিকোর কথাসাহিত্যিক কার্লোস ফুয়েন্তেস উদ্ধৃত করেছিলেন তার এক গ্রন্থের ভূমিকায় : ‘আমাদের সময়ের এক মহান চিন্তাবিদদের একজন, মেক্সিকান কমেডিয়ান মারিও মোরেনো, যিনি কান্তিনফ্লাস নামেই বেশি পরিচিত, তিনি একবার কারও সঙ্গে তর্ক করতে গিয়ে লোকটিকে খামোশ করে দিয়ে জানালেন : বেশ, যথেষ্ট হয়েছে, এখানে সমস্যা হলো নিশ্চিতভাবেই তোমার অজ্ঞতার অভাব।
কান্তিনফ্লাস ছিলেন কূটাভাসের ওস্তাদ, তার কৌতুককর বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরে থাকে গভীর সত্য। আমাদের পৃথিবী স্মৃতির মাধ্যমে প্রকাশিত অলিখিত সংস্কৃতি, মৌখিক পরম্পরা, ঐতিহ্যের চর্চাকে লুকিয়ে রাখে। এই বিষয়টা বোঝার জন্য—যেমনটা কান্তিনফ্লাস সঠিকভাবে বলেছেন—অজ্ঞতার অভাব রয়ে গেছে।
আমরা আমাদের স্মৃতিতে আর কিছু রাখতে চাই না, থাকতে চাই না ‘অজ্ঞ’ও, চাই এআইয়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে ঝাল খেতে; নিজের সঙ্গে এবং পাঠকদের সঙ্গেও প্রতারণাকেই জ্ঞানচর্চা বলে অভিহিত করছি। এআই আসলে আমাদের জ্ঞানী হওয়ায় উদ্বুদ্ধ করছে না, বরং জ্ঞানবিমুখ করার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এআই নামক জিন আমাদের সবকিছু সরবরাহ করার মাধ্যমে মূলত সব উদ্যাম ও স্পৃহাকে লুট করে আমাদের পর্যবসিত করছে অকর্মণ্য, অলস, প্রতারক ও জ্ঞানবিমুখ এক প্রজন্মে। মানুষ ঠেকে, পরিশ্রম করে, ভুল করে শেখে। সেই শিক্ষাটাই মানুষ মনে রাখে। কিন্তু এআই আমাদের কোনো কিছুই মনে রাখার সুযোগ দিতে চায় না। কোনো জাতিকে ধ্বংস করার প্রধান হাতিয়ার হলো তার স্মৃতিকে মুছে দেওয়া বা তার স্মৃতিশক্তিকে বিলুপ্ত করা। এআই আমাদের হাতে ধ্বংসের সেই হাতিয়ার তুলে দিয়েছে, যা আমাদের আত্মহত্যাকে নিশ্চিত করবে।