ইনস্টাগ্রামের নান্দনিক ফিড থেকে কফি মগের ডিজিটাল প্রিন্ট কিংবা পশ্চিমা পপ-তারকাদের ক্যাপশনে একবিংশ শতাব্দীর বহুল উচ্চারিত নাম—জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমি (১২০৭-১২৭৩)। আশির দশকের শেষভাগ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বাধিক বিক্রীত কবিদের তালিকায় তার অবস্থান প্রায় স্থায়ী। তবে পশ্চিমা পপ-সংস্কৃতি ও বিশ্বায়িত পুঁজি যে রুমিকে আমাদের সামনে হাজির করেছে, তিনি ত্রয়োদশ শতকের খোরাসান বা কোনিয়ার সেই প্রজ্ঞাবান সাধক নন—এই রুমি সর্বজনীন ‘নিউ-এজ’ আধ্যাত্মিক গুরু, আত্ম-উন্নয়নমূলক সাহিত্যের জনপ্রিয় আইকন কিংবা সম্পর্কের সংকটে সান্ত্বনাদায়ক পথপ্রদর্শক। পপ-সংস্কৃতির এই সুপরিকল্পিত বিপণননীতির দাবি, রুমি ধর্মীয় ও ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বজনীন ভালোবাসার এক ভাষা নির্মাণ করেছেন—যা আধুনিক নগরজীবনের একাকিত্ব ও মানসিক ক্লান্তির এক ধরনের প্রতিষেধক। এই বয়ানে তিনি কেবলই অহিংস ও সর্বব্যাপী প্রেমে মগ্ন এক ‘সফট’ সুফি। কিন্তু সাংস্কৃতিক রাজনীতির নিবিড় পাঠ, এই মনোরম উপস্থাপনকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় : পপ-কালচারের এই রুমি কি সত্যিই সেই প্রখ্যাত হানাফি ফকিহ, ইসলামি আইনশাস্ত্রবিদ ও সুফি সাধক? নাকি উত্তর-আধুনিক পুঁজি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রয়োজনে তার মূল ইসলামি বৌদ্ধিক কাঠামো, শরিয়তী অনুশাসন ও ফার্সি কাব্যের তীব্রতা ছেঁটে নির্মিত এক ‘হোয়াইটওয়াশড’ বি-ইসলামিকৃত পণ্য?
সুফি দর্শনের আত্মবিলোপের চরম সাধনা (ফানা), তীব্র দার্শনিক-ঐতিহাসিক টানাপড়েন এবং আধ্যাত্মিক রক্তক্ষরণ কীভাবে বিশ্বায়িত বাজারের এক ‘ফিল-গুড’ পণ্যে রূপান্তরিত হলো, তা বুঝতে এই রাজনীতিহীন রুমির মোড়কটি উন্মোচন করা প্রয়োজন। রুমির বিশ্বব্যাপী পপ-আইকনে পরিণত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক ছিল অনুবাদের রাজনীতি। আর এই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মার্কিন কবি কোলম্যান বার্কস (১৯৩৭-২০২৬)। ১৯৭৬ সালে কবি রবার্ট ব্লাই (১৯২৬-২০২১) বার্কসকে রুমির কবিতার ইংরেজি অনুবাদ উপহার দিয়ে বলেছিলেন, ‘এগুলোকে খাঁচা থেকে মুক্ত করতে হবে।’ এরপর বিশেষ করে আশি ও নব্বইয়ের দশকে বার্কসের হাত ধরে ইংরেজিভাষী বিশ্বে রুমির অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা ও বাজার তৈরি হয়। কিন্তু এই ‘বার্কস-ফেনোমেননের’ সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো—বার্কস নিজে ফার্সি ভাষার একটি শব্দও জানতেন না; এমনকি ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বা সুফি পরিভাষা সম্পর্কেও তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছিল না। তিনি মূলত ভিক্টোরিয়ান যুগের ফার্সিবিদ এডওয়ার্ড হেনরি উইনফিল্ড (১৮৩৫-১৯২২) কিংবা রেনল্ড অ্যালেন নিকোলসনের (১৮৬৮-১৯৪৫) আক্ষরিক ইংরেজি অনুবাদকে নিজের মুক্তগদ্যে সৃজনশীলভাবে পুনর্লিখন করেছিলেন।
অবশ্য এই অনুবাদ-রাজনীতিকে ঘিরে দুটি বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। প্রবক্তাদের দাবি, বার্কসের প্রাঞ্জল মুক্তগদ্য রুমিকে মধ্যযুগীয় ফার্সি ভাষা ও কঠিন ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর সীমা অতিক্রম করে আধুনিক পাঠকের কাছে সহজবোধ্য করে তুলেছে; ফলে তিনি ধর্মীয় সীমানা পেরিয়ে বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রে স্থান করে নিয়েছেন। অন্যদিকে সুফি-গবেষক ওমিদ সফির (জন্ম : ১৯৭০) মতো চিন্তাবিদদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় ঘটেছে এক ধরনের ‘বি-ইসলামিকরণ’।
রুমি তার মহাকাব্যিক গ্রন্থ মসনবীকে ‘হস্ত কোরআন দর জাবানে পহ্লভি’, অর্থাৎ ফার্সি ভাষায় রচিত আল-কোরআন হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। অথচ সফিসহ সমালোচকদের অভিযোগ, বার্কস ও তার অনুসারীরা উইনফিল্ড কিংবা নিকোলসনের আক্ষরিক ইংরেজি অনুবাদ পুনর্লিখনের সময় মূল পাঠের বহু ইসলামি অনুষঙ্গ—কোরআনের আয়াত, হাদিসের উদ্ধৃতি, জিকির, সালাত ও ফিকহ-সংক্রান্ত পরিভাষা বাদ দিয়েছেন। তাদের মতে, ফার্সি মূল পাঠে শরিয়তী অনুশাসন এবং মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি যে গভীর অনুরাগ প্রকাশিত হয়েছে, তা পশ্চিমা পাঠে রূপান্তরিত হয়েছে এক অস্পষ্ট ‘মহাজাগতিক প্রেম’ কিংবা ‘নিউ-এজ’ আধ্যাত্মিকতায়।
সমালোচকদের মতে, এই কাটছাঁটের ফলে রুমির কবিতার ধর্মীয় ও দার্শনিক স্তরগুলো এমনভাবে সরলীকৃত হয়েছে, যা অ-মুসলিম বাজারে সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে এবং আধুনিক নগরপাঠকের জন্য সাংস্কৃতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। কাব্যিক স্বাধীনতার নামে মূল পাঠের এই স্থানচ্যুতি সুফি দর্শনের জটিলতাকে সংকুচিত করে এক রাজনীতিহীন ‘পপ-রুমি’ নির্মাণ করেছে। ফলে সমকালীন জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে প্রচলিত রুমি অনেকাংশে সেই জালালউদ্দিন রুমি নন, যিনি ফরিদউদ্দিন আত্তারের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার বহন করেছিলেন; বরং তিনি বিশ্বায়িত সাংস্কৃতিক বাজারে নির্মিত রুমির এক মসৃণ, ধারহীন সংস্করণ।
২০০১ সালের ৯/১১-পরবর্তী বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের (১৯২৭-২০০৮) ‘সভ্যতার সংঘাত’ ধারণাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিতর্ক রুমিকে পশ্চিমা জনপরিসরে নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অর্থে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে অনেক গবেষক মনে করেন। টুইন টাওয়ারে হামলার পর পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম ও জনপরিসরের একাংশে ‘ইসলাম’ ক্রমেই চরমপন্থা ও নিরাপত্তা-হুমকির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনায় সুফিবাদ নতুন গুরুত্ব লাভ করে—তবে অনেক ক্ষেত্রেই এক নিরাপদ ও সর্বজনগ্রাহ্য রূপে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, চরমপন্থার বিপরীতে সুফিবাদ ও রুমির জনপ্রিয়তাকে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সেতু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর মাধ্যমে পশ্চিমা সমাজে এই ধারণা জোরালো করার চেষ্টা করা হয় যে ইসলাম কেবল চরমপন্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর ভেতরে রয়েছে ভালোবাসা, সহনশীলতা ও আধ্যাত্মিকতার এক দীর্ঘ ঐতিহ্য। এই ব্যাখ্যা অনুসারে, ‘সফট রুমি’ পশ্চিমা সাংস্কৃতিক কূটনীতির একটি তাৎপর্যপূর্ণ নির্মাণ।
কিন্তু এই রাজনীতির অন্তরালে উন্মোচিত হয় এক গভীর সাম্রাজ্যবাদী ও বর্ণবাদী কাঠামোর অভিযোগও। সমালোচকদের মতে, রুমিকে সেখানে উপস্থাপন করা হয়েছে এক ‘নিরাপদ’ ও ‘রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়’ আধ্যাত্মিক আইকন হিসেবে; যেন তার চিন্তা ও সাধনার সঙ্গে ঐতিহাসিক মুসলিম সমাজ, ইসলামি বৌদ্ধিক ঐতিহ্য কিংবা রাজনৈতিক বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। এই সরলীকরণের ফলে সুফিবাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকার দীর্ঘ ইতিহাস আড়ালে পড়ে যায়। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সুফিরা কেবল নির্জন সাধনা ও প্রেমের বাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বিভিন্ন সময় তারা অন্যায্য শাসন ও ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অংশও হয়েছেন। চতুর্দশ শতকের উত্তর আফ্রিকার বিখ্যাত দার্শনিক ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬) তার মুকাদ্দিমায় সুফিদের সামাজিক প্রভাব, গোষ্ঠীগত সংহতি এবং রাজনৈতিক ভূমিকার নানা দিক বিশ্লেষণ করেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে উত্তর আফ্রিকায় ইউরোপীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শেখ মুহাম্মদ ইবনে আলী আস-সানুসির প্রতিষ্ঠিত ‘সানুসি’ সুফি ধারার সংগ্রাম—যার অন্যতম প্রতীক ছিলেন ওমর আল-মুখতার এবং সুদানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ আহমদের ‘মাহদিয়া’ আন্দোলন সুফি ঐতিহ্যের এই প্রতিরোধী মাত্রার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এমনকি বাংলার ইতিহাসেও অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে মজনু শাহের নেতৃত্বে সংঘটিত ‘ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’ দেখায় যে সুফি ভাবধারা শুধু ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধির পথেই সীমাবদ্ধ ছিল না; অনেক ক্ষেত্রে তা শোষণ ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভাষাও নির্মাণ করেছে।
রুমি যে সেলজুক সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক টানাপড়েন এবং মঙ্গোল আক্রমণের ভয়াবহতার মধ্যে দাঁড়িয়ে তার কালজয়ী মসনবী রচনা করেছিলেন, সেই প্রেক্ষাপট তার কাব্য বোঝার জন্য অপরিহার্য। এই ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন পাঠে রুমির সুফি দর্শনের নৈতিক সংগ্রাম, আত্মরূপান্তরের কঠিন সাধনা এবং ক্ষমতার প্রতি তার অন্তর্নিহিত প্রশ্নগুলো অনেকাংশে আড়ালে পড়ে যায়। আর এই বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ দেখা যায় ডিজিটাল যুগের রুমি-চর্চায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ও পপ-কালচারের প্রবাহে ত্রয়োদশ শতকের এই সুফি কবি আজ একবিংশ শতাব্দীর এক ভাইরাল সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। ফেসবুকের টাইমলাইন থেকে ইনস্টাগ্রামের চকচকে ফিড—সর্বত্রই তার উপস্থিতি প্রধানত দুই লাইনের অনুপ্রেরণামূলক উক্তি কিংবা ‘মোটিভেশনাল কোট’-এ সীমাবদ্ধ। ভোক্তা-সংস্কৃতির এই প্রক্রিয়ায় রুমি রূপান্তরিত হয়েছেন সহজে গ্রহণযোগ্য এক জনপ্রিয় প্রতীকে। অনুসারীদের মতে, এই সংক্ষিপ্ত ও সহজপাচ্য বাণীগুলো আধুনিক মানুষের যান্ত্রিক জীবনে তাৎক্ষণিক স্বস্তি ও মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। তবে সমালোচকদের মতে, এই ‘কোটিং কালচার’-এর ফলে রুমির চিন্তার জটিলতা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং সুফি দর্শনের গভীর রূপান্তরমূলক মাত্রা ক্রমেই আড়ালে চলে যাচ্ছে।
সুফি দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে ‘ফানা’—অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিকতার বিলোপের মধ্য দিয়ে পরম সত্তার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার এক কঠিন আধ্যাত্মিক সাধনা। ফার্সি মূল পাঠে এই পথ নির্মিত হয় রিয়াজাত (কঠোর আত্মসংযম) ও মুজাহাদার (আত্মার বিরুদ্ধে সংগ্রাম) দীর্ঘ অনুশীলনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আধুনিক জনপ্রিয় পাঠে এই অন্তর্গত সংগ্রাম অনেকাংশে মুছে গিয়ে রুমির আত্মবিলোপের সাধনা প্রায়ই রূপ নেয় আত্ম-উন্নয়ন ও ব্যক্তিগত প্রশান্তির ভাষ্যে। এই রূপান্তরের আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো রুমির নামে প্রচলিত অসংখ্য উদ্ধৃতি। ইন্টারনেটভিত্তিক উদ্ধৃতি-সংস্কৃতি, কোলম্যান বার্কসের মতো অনুবাদকদের মুক্ত পুনর্ণির্মাণ এবং মূল ফার্সি পাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন প্রচারের ফলে বহু বাণী যাচাই ছাড়াই তার নামে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে ঐতিহাসিক রুমির কাব্যের ভাষা, দার্শনিক জটিলতা ও সুফি পরিভাষার পরিবর্তে গড়ে উঠেছে এমন এক জনপ্রিয় রুমি-চিত্র, যেখানে গভীর আত্মরূপান্তরের আহ্বানের চেয়ে তাৎক্ষণিক অনুপ্রেরণার আবেদনই প্রধান হয়ে উঠেছে।
তবে রুমির জনপ্রিয়তার মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে। একদিকে বিশ্বজুড়ে পপ-সংস্কৃতির পরিসরে তিনি এক বিপুল জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক প্রতীক; অন্যদিকে রুমি-গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র তার কবিতাকে পাঠ করে মধ্যযুগীয় ইসলামি সমাজ, সুফি সাধনা ও ফার্সি সাহিত্যিক ঐতিহ্যের জটিল প্রেক্ষাপটে। এই দুই পাঠের মধ্যকার দূরত্বই সমকালীন রুমি-চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জনপ্রিয়তাবাদের সমর্থকদের মতে, কোনো সাহিত্যকর্মের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তার নান্দনিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যকে খর্ব করে না। রুমি যদি বিশ্বজুড়ে কোটি পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করতে পারেন, তবে তা তার চিন্তার সর্বজনীন আবেদন ও কাব্যিক শক্তিরই প্রমাণ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘গম্ভীর’ পাঠকদের সংশয়কে তারা কখনো কখনো অ্যাকাডেমিক পরিসরের এক ধরনের অভিজাততাবাদী প্রবণতা হিসেবে দেখেন। তবে সমালোচকদের উদ্বেগ অন্য জায়গায়। তাদের মতে, সমস্যা রুমির জনপ্রিয়তায় নয়; বরং তার জনপ্রিয় উপস্থাপনের নির্বাচনী চরিত্রে। যখন কোনো সাহিত্যিক ঐতিহ্য থেকে কেবল কিছু সহজবোধ্য ও আরামদায়ক ভাবনা তুলে নেওয়া হয়, তখন তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, দার্শনিক গভীরতা ও ঐতিহাসিক জটিলতা আড়ালে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে মূল প্রশ্নটি জনপ্রিয়তা বনাম অজনপ্রিয়তা নয়; বরং বিশ্বব্যাপী গ্রহণ করা রুমির কোন রূপটি দৃশ্যমান হচ্ছে এবং কোন রূপটি হারিয়ে যাচ্ছে।
এর ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয়েছে খোদ জালালউদ্দিন রুমির কাব্যদর্শনের। তার কবিতার কেন্দ্রে ছিল পরম সত্তা থেকে বিচ্ছেদের বিরহ (ফিরাক), অন্তহীন আকুলতা এবং সেই বিচ্ছেদের অন্ধকার অতিক্রমের কঠিন সাধনা। রুমির কাছে প্রেম কোনো আরামদায়ক অনুভূতি ছিল না, ছিল আত্মসত্তাকে অতিক্রম করে সত্যের দিকে যাত্রার এক গভীর আধ্যাত্মিক পথ। শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফাতের সমন্বয়ে নির্মিত তার কাব্যজগতে প্রেম ছিল আত্মপরিবর্তন ও পরমের অনুসন্ধানের এক কঠিন অনুশীলন। অথচ জনপ্রিয় সংস্কৃতির পাঠে এই তীব্র প্রেম অনেক সময় রূপ নিয়েছে সান্ত্বনাদায়ক আবেগ ও ব্যক্তিগত অনুপ্রেরণার ভাষ্যে। ফলে রুমির কবিতার অন্তর্নিহিত অস্বস্তি, আত্মসংঘাত এবং অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশের আহ্বান অনেকাংশে আড়ালে পড়ে গেছে। সমকালীন জনপ্রিয় রুমি তাই ঐতিহাসিক জালালউদ্দিন রুমির সম্পূর্ণ রূপ নয়; বরং তার সুবিশাল কাব্যিক ও আধ্যাত্মিক জগতের একটি নির্বাচিত প্রতিফলন—এক ‘প্যাকেজড রুমি’। রুমিকে অনুধাবন করতে হলে স্বস্তিদায়ক ও সরলীকৃত উপস্থাপনার সীমা অতিক্রম করে তাকে ফিরিয়ে দেখতে হবে তার সময়, সমাজ ও বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলের ভেতরে। তার কাব্যকে পড়তে হবে ফার্সি সাহিত্যিক ঐতিহ্য, কোরআন-হাদিসের সঙ্গে তার গভীর সংলাপ এবং ইসলামি মরমি সাধনার দীর্ঘ উত্তরাধিকারের আলোকে।
মনে রাখতে হবে, রুমি কোনো বাণিজ্যিক ‘সেলফ-হেল্প’ ম্যানুয়ালের রচয়িতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন আত্মরূপান্তরের কঠিন পথে অগ্রসর এক মরমি কবি। প্রথাগত ইসলামি জ্ঞানচর্চায় গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত আলেম জালালউদ্দিনের অন্তর্গত সুফি-সত্তাকে নতুন মাত্রায় উন্মোচিত করেছিলেন তার মুর্শিদ—শামস তাবরিজি। শামসের গভীর সাহচর্যে রুমির শাস্ত্রনিষ্ঠ জ্ঞান এক অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ও প্রেমমগ্ন সাধনার রূপ লাভ করে। এই রূপান্তরের কেন্দ্রে ছিল গুরুর প্রতি আত্মসমর্পণ, আত্মসংযম এবং অন্তর্গত সাধনার মাধ্যমে মানবিক পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হওয়া—যাকে সুফি পরিভাষায় বলা হয় ‘ইনসান-এ-কামেল’। সুফিতত্ত্বে এই আত্মশুদ্ধির পথের মূল চালিকাশক্তি হলো ‘ইশক’ বা প্রেম। তবে এই প্রেম কেবল মানবিক আবেগের পরিচিত পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়, স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার গভীর সম্পর্কেরও এক মরমি আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষার পথ সহজ নয়—এর মধ্য দিয়ে সাধককে অতিক্রম করতে হয় বিচ্ছেদ, আকুলতা, আত্মসংঘাত এবং অন্তর্গত রূপান্তরের এক দীর্ঘ যাত্রা।
সুফি অভিজ্ঞতার এই গূঢ় প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে দশম শতকের প্রখ্যাত সুফি সাধক ইবনে আতা আল-আদমীর একটি বক্তব্য বিশেষভাবে স্মরণীয়। কতিপয় ধর্মতত্ত্ববিদ একবার তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘সাধারণ ভাষা পরিত্যাগ করে আপনারা এমন বিশেষ পরিভাষা নির্মাণ করেছেন কেন? এর পেছনে কি কোনো ছলনা রয়েছে, নাকি আপনাদের মতবাদের কোনো দুর্বলতা আপনারা আড়াল করছেন?’ জবাবে ইবনে আতা বলেছিলেন, ‘আমাদের সাধনার বিষয় আমাদের কাছে অমূল্য। তাই এই বিশেষ ভাষা নির্মিত হয়েছে, যাতে এর অন্তর্নিহিত অর্থ কেবল তারাই উপলব্ধি করতে পারে, যারা এই পথের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে।’
রুমির কাব্যজগৎও তেমনই এক গভীর সাধনার ভাষা—যেখানে প্রেম, আত্মবিলোপ, আধ্যাত্মিক সংগ্রাম এবং পরমের অনুসন্ধান অবিচ্ছেদ্য। সেই জটিলতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে, তার শামস তাবরিজির সঙ্গে মরমি সম্পর্ক, ইসলামি বৌদ্ধিক ঐতিহ্য এবং সুফি সাধনার দীর্ঘ উত্তরাধিকারের আলোকে রুমিকে পুনরায় পাঠ করলেই একবিংশ শতাব্দীতে তার প্রতি প্রকৃত ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
প্রচ্ছদ রচনা
পপ আইকন রুমি : বিশ্বায়িত বাজারে সুফি দর্শনের পণ্যায়ন
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ‘পপ-রুমি’ এবং ইতিহাসের জালালউদ্দিন রুমির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অনুবাদের রাজনীতি, বিশ্বায়িত বাজার ও পশ্চিমা সাংস্কৃতিক নির্মাণের ফলে রুমির ইসলামি বৌদ্ধিক ঐতিহ্য, সুফি সাধনা এবং দার্শনিক গভীরতার বড় অংশ আড়ালে চলে গেছে। ফলে তিনি আজ অনেকাংশে আত্ম-উন্নয়নমূলক উদ্ধৃতি ও ‘নিউ-এজ’ আধ্যাত্মিকতার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। লেখাটি এই সরলীকৃত উপস্থাপনার সমালোচনা করে রুমিকে তার সময়, সমাজ, ফার্সি সাহিত্য, ইসলামি জ্ঞানচর্চা এবং সুফি দর্শনের প্রকৃত প্রেক্ষাপটে পুনরায় পাঠ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে
রাব্বী আহমেদ
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১৯ পিএম
আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩১ পিএম
গ্রাফিক্স : দেশ রূপান্তর
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
×
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০
