ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন এবং অশান্ত এক সময়ে জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব পেয়েছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলি। সালটা ছিল ২০০০, ম্যাচ ফিক্সিংয়ের কালো অধ্যায়ে তখন জর্জরিত ভারতীয় ক্রিকেট। সেই টালমাটাল পরিস্থিতি থেকে দলকে টেনে তোলা এবং একঝাঁক তরুণ তারকাকে বিশ্বমঞ্চে লড়াইয়ের উপযোগী করে গড়ে তোলার অবিশ্বাস্য দায়িত্বটি কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি।
সম্প্রতি রাজ শামানির একটি পডকাস্টে হাজির হয়ে সৌরভ গাঙ্গুলি সেই পুরোনো দিনগুলো স্মরণ করেছেন। অধিনায়ক হিসেবে তার শুরুর দিনগুলো এবং তৎকালীন ড্রেসিংরুমে ঢুকে পড়া 'ম্যাচ ফিক্সিং' বিতর্ক নিয়ে প্রথমবারের মতো মুখ খুলেছেন ‘মহারাজ’।
সৌরভ জানান, ২০০০ সালে অধিনায়ক হওয়ার আগে পর্যন্ত ভারতীয় খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফিক্সিং বা বাজিকরদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়ার ব্যাপারে তার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। কৌতুহল এবং উদ্বেগ থেকে তিনি দলের সিনিয়র ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবিড় এবং অনিল কুম্বলেকে সরাসরি এই বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন।
পডকাস্টে সৌরভ গাঙ্গুলি বলেন, "আমি অধিনায়ক হওয়ার ঠিক আগে ভারতীয় দল যে বাজি ধরা বা ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমি শচীন আর রাহুলকে বারবার জিজ্ঞেস করতাম—'আসলেই কি এমন কিছু ঘটে? তোমাদের কি কখনো কেউ এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছে?' কারণ আমাকে তো কখনো কেউ এমন প্রস্তাব দেয়নি।"
সৌরভ আরও যোগ করেন, "আমি শচীনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'তুঝে কিসি নে পুছা?' (তোমাকে কি কেউ কখনো জিজ্ঞেস করেছে?)। ও বলেছিল, না। আমরা তখন টেস্ট এবং ওয়ানডে—দুই ফরম্যাটেই নিয়মিত খেলতাম। আমি অনিলকেও (কুম্বলে) জিজ্ঞেস করেছিলাম, ও-ও বলেছিল, 'না, আমাকে কেউ কখনো কিছু বলেনি।' তাই ফিক্সিং জিনিসটা আসলে কী, তা নিয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম না। আমার সামনে তখন কেবল অধিনায়কত্বের দায়িত্বটাই ছিল, তাই এই সমস্ত নেতিবাচক বিষয় আমি মাথায় রাখিনি।"
মাত্র ২৭ বছর বয়সে ভারতীয় দলের নেতৃত্বের ব্যাটন হাতে পান সৌরভ। অধিনায়ক হিসেবে তাকে এমন সব কিংবদন্তিদের দিকনির্দেশনা দিতে হতো, যাদের অধীনে তিনি নিজে ক্যারিয়ারের একটা বড় সময় খেলেছেন। স্বভাবতই প্রথম ড্রেসিংরুম টকের আগে বেশ নার্ভাস ছিলেন তিনি।
সেই রোমাঞ্চকর স্মৃতির কথা রোমন্থন করে সৌরভ বলেন, "আমার এখনও মনে আছে, অধিনায়ক হিসেবে আমাদের প্রথম ম্যাচটা ছিল কোচিতে। ম্যাচের আগের দিন আমাকে টিম মিটিংয়ে বক্তব্য দিতে হতো। আমি (স্ত্রী) ডোনাকে বলেছিলাম—আজহার, শচীনের মতো ক্রিকেটাররা আমার অধিনায়ক ছিলেন। এখন আমি কীভাবে তাদের বলব কী করতে হবে আর কী করা যাবে না? আমি ডোনাকে বলেছিলাম, মিটিংটা আমি খুব ছোট রাখব। কারণ মিটিং যত লম্বা হবে, আমাকে তত বেশি কথা বলতে হবে।"
সৌরভ জানান, প্রথম মিটিংটি তিনি মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে শেষ করে মূল কথাগুলো সেরে নিয়েছিলেন। কাকতালীয়ভাবে, পরদিনই ভারত জয় পায় এবং তার পরের ম্যাচে জামশেদপুরে সৌরভ নিজে একটি দুর্দান্ত সেঞ্চুরি হাঁকান। আর সেখান থেকেই ভারতীয় ক্রিকেটে শুরু হয় এক নতুন ‘দাদা’ যুগের, যা পরবর্তীতে বদলে দিয়েছিল পুরো ভারতীয় ক্রিকেটের মানসিকতা।