'রানা ম্যাচ উইনার, ওকে গতির লাইসেন্স দিতে হবে',- ডোনাল্ড

মিরপুর টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৪০ রান খরচায় ৫ উইকেট নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে হইচই ফেলে দিয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ পেসার নাহিদ রানা। আর এই গতিদানবের পারফরম্যান্সে দূর পরবাসে বসে দারুণ উন্মুখ হয়ে আছেন টাইগারদের সাবেক বোলিং কোচ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি পেসার অ্যালান ডোনাল্ড। ক্রিকেটভিত্তিক ওয়েবসাইট 'ক্রিকব্লগ'-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড জানিয়েছেন, নাহিদ রানার এই সাফল্যে তিনি বিন্দুমাত্র অবাক হননি। একই সাথে এই গতি তারকাকে কীভাবে লালন-পালন করতে হবে, বিসিবির প্রতি সেই পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।

নাহিদ রানার সাথে নিজের প্রথম দেখার স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে ডোনাল্ড বলেন, 'চট্টগ্রামে আমাদের একটা তিন দিনের কন্ডিশনিং ক্যাম্প ছিল। সেখানেই প্রথম আমাদের নেটে বল করতে আসে রানা। এই তরুণকে দেখেই আমি প্রথম দেখায় রোমাঞ্চ অনুভব করেছিলাম। ওর সহজাত গতি, অনায়াস বোলিং অ্যাকশন এবং উচ্চতার কারণে পিচ থেকে বাড়তি বাউন্স আদায়ের ক্ষমতা সত্যিই দুর্দান্ত। যখন কোনো বোলার উইকেটের সুবিধা ছাড়াই স্রেফ পিচ থেকে এমন গতি তৈরি করতে পারে, তখন সেটি দেখার জন্য দারুণ এক দৃশ্য হয়। এই ধরনের গতি কাউকে শিখিয়ে দেওয়া যায় না, এটা ঈশ্বরদত্ত।'

ডোনাল্ড আরও যোগ করেন, 'আমি ওর লাইন-লেংথ এবং চমৎকার ন্যাচারাল রিদম দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমি ওকে আরও দেখার জন্য ঢাকাতেও নেটে ডেকেছিলাম। তৎকালীন প্রধান কোচ রাসেল ডোমিঙ্গো তো তখনই ওকে জাতীয় দলে নেওয়ার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের তখন তাসকিন, এবাদত ও শরীফুলদের মতো সেটেল্ড এবং ফর্মে থাকা আক্রমণভাগ থাকায় সুযোগ হয়নি। তবে আজ ওকে এত ভালো করতে দেখে ভীষণ আনন্দ হচ্ছে।'

পাকিস্তান সিরিজের প্রথম ইনিংসে রানা ১০০-র ওপর রান খরচ করেছিলেন। তবে বিষয়টিকে একদম স্বাভাবিকভাবে দেখছেন ডোনাল্ড। ব্র্রেট লি কিংবা নিজের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের উদাহরণ টেনে এই প্রোটিয়া গ্রেট বলেন, "রানার আসল শক্তি হলো ওর তীব্র গতি। বাংলাদেশ ক্রিকেট এখন ওকে কীভাবে সামলায়, সেটাই দেখার বিষয়। ও এমন বোলার নয় যাকে আপনি গিয়ে বলবেন লাইন-লেংথ ঠিক করতে। প্রথম ইনিংসে ও ১০০ রান দিয়েছে, তাতে কি? আপনাকে মেনে নিতে হবে যে ও মাঝে মাঝে খরুচে হবে, কিন্তু ও রান দেওয়ার চেয়ে ম্যাচ জেতাবে বেশি। ওকে একদম পরিষ্কার বার্তা দেওয়া উচিত—তুমি আমাদের ফ্রন্টম্যান, মাঠে যাও এবং ম্যাচ ছিনিয়ে আনো।"

ডোনাল্ড মনে করেন, রানার এই 'আনপ্রেডিক্টেবিলিটি' বা অনিয়ন্ত্রিত বোলিংই ব্যাটারদের জন্য ভয়ের কারণ। তিনি বলেন, 'লাইন-লেংথের নিয়ন্ত্রণ সময়ের সাথে চলে আসে, যা ব্রেট লি বা আমার ক্ষেত্রেও হয়েছিল। রানা যদি ভুলও করে, সেই ভুলটা যেন ও ১৪৮ বা ১৫০ কিলোমিটার গতিতে করে। ব্যাটাররা এমন আলগা কিন্তু তীব্র গতির বোলারদের মোটেও পছন্দ করে না। ও একজন খাঁটি ম্যাচ উইনার।'

চোটের হাত থেকে বাঁচাতে অনেকেই রানাকে সাবধানে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে ডোনাল্ডের পরামর্শ ভিন্ন। তিনি বলেন, *"মেডিকেল স্টাফরা নিশ্চয়ই জানেন ওর ইনজুরি কীভাবে ম্যানেজ করতে হবে। তবে আউট অ্যান্ড আউট ফিটনেস এবং বোলিং ফিটনেসের মধ্যে পার্থক্য আছে। রানা সব ফরম্যাটেই খেলছে, যা ইতিবাচক। তবে আমি শেষ যে জিনিসটা দেখতে চাই না তা হলো—বাংলাদেশ ক্রিকেট ওকে 'তুলা দিয়ে মুড়িয়ে' ড্রেসিংরুমে বসিয়ে রাখছে। ও একজন ম্যাচ উইনার, ওর নিয়মিত খেলা দরকার। আমি বলছি না ওকে বিশ্রাম ছাড়া খেলানো হোক, তবে এখানে যৌক্তিক চিন্তাভাবনা করতে হবে।'

সবশেষে বাংলাদেশের পেস আক্রমণের প্রশংসা করে ডোনাল্ড বলেন, 'তাসকিন বা শরীফুল হয়তো প্রতিদিন ৫ উইকেট পাবে না। কিন্তু এই 'শিকারী দল' হিসেবে যখন খেলবে, তখন রানার মতো কেউ একজন এসে ম্যাচ জিতিয়ে দেবে। রানা বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক অমূল্য রত্ন।"