জাঁকজমকেই শুরু হয়েছিল এবারের পুলিশ সপ্তাহ। অন্যান্য বছরের মতো প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে নানা দাবিও উত্থাপন করা হয়েছিল। দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তবে কবে নাগাদ আশ্বাস পূরণ করা হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। সব সরকার আশ^াসই কেবল দেয়, পূরণ খুব একটা করে না। ফলে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা হতাশ। আক্ষেপ রয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যেও। পুলিশ আশা করছে, সরকার তাদের দাবিনামা দ্রুত পূরণ করবে।
জাঁকজমকপূর্ণ প্যারেড, বর্ণিল আলোকসজ্জা আর কর্মকর্তাদের কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে শেষ হলো এবারের পুলিশ সপ্তাহ। প্রতি বছরের মতো এবারও বার্ষিক এই মিলনমেলায় পুলিশের মাঠপর্যায়ের সদস্যদের আশার ঝুলি ছিল বেশ ভারী। ঝুঁকিভাতা বাড়ানো, আবাসন সংকটের নিরসন, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং পদোন্নতিবিষয়ক জটিলতা কাটানোর ব্যাপারে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সুনির্দিষ্ট ঘোষণার অপেক্ষায় ছিলেন তারা। সপ্তাহ শেষে দেখা গেছে, অর্জনের চেয়ে আশ্বাসের পাল্লাই ভারী। ফলে উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই পুলিশ সদস্যরা হতাশ, তাদের মধ্যে ক্ষোভও রয়েছে।
একজন সাব-ইনস্পেক্টর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘ছুটি নেই, পরিবারকে সময় দিতে পারি না। আশা করেছিলাম, অন্তত রেশন সুবিধাটা পেনশনের পর আজীবন পাওয়ার ঘোষণা আসবে। কিন্তু এবারও শুধু ‘বিবেচনা করা হবে’ বলে শেষ করে দেওয়া হলো।’’
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য : ‘সরকার পুলিশের কল্যাণে আন্তরিক। আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অনেক কাজ হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে সব দাবি একসঙ্গে পূরণ করা সম্ভব হয় না। সদস্যদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই, অধিকাংশ দাবিই ইতিবাচক বিবেচনার পর্যায়ে রয়েছে।’
‘ইতিবাচক বিবেচনা’ শব্দবন্ধটি মাঠপর্যায়ে এখন প্রবচনে পরিণত হয়েছে, যার অর্থ হলো অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তা।
নিরাপত্তা-বিশ্লেষকদের অভিমত, একজন পুলিশ সদস্য যদি অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল না হন এবং মানসিক চাপে থাকেন, তবে তার কাছ থেকে পেশাদার আচরণ আশা করা কঠিন। মাঠপর্যায়ের এই হতাশা বাহিনীর চেইন অব কমান্ড এবং জননিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন (নতুন থানা বা গাড়ি কেনা) দিয়ে পুলিশের গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়, যতক্ষণ না সদস্যদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এবারের আয়োজনেও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ও সুন্দর বক্তৃতার কমতি ছিল না। কিন্তু সাধারণ পুলিশ সদস্যদের কাছে এসবের চেয়েও বড় প্রয়োজন ভালো থাকা ও কর্মক্ষেত্রে মানবিক পরিবেশ। আশ্বাস যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন তা বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেয়। প্রশাসনের উচিত দ্রুততম সময়ে অন্তত রেশন ও ঝুঁকিভাতার বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটানো।
পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, পেশাদারত্ব, জবাবদিহি এবং জনবান্ধব ইমেজ গড়াই ছিল এবারের পুলিশ সপ্তাহের মূলমন্ত্র। ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এ স্লোগানকে ধারণ করায় এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন ছিল। সংস্কার আর শুদ্ধি অভিযানে পুলিশ বাহিনী তার গৌরব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছে এ সপ্তাহ উদযাপনের মধ্য দিয়ে। রাজারবাগের এ উৎসব শেষ পর্যন্ত জনআস্থার প্রতিফলন ঘটাতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। গত কয়েক বছরে পদক নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ছিল। অভিযোগ, যোগ্যতার চেয়ে তদবিরের প্রাধান্য ছিল। এবারও পদকের তালিকায় এমন অনেকের নাম ছিল, যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে স্থগিত করা হয় পদক প্রদান অনুষ্ঠান।
জানা গেছে, পুলিশ সপ্তাহ ঘিরে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিয়েও সরব ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। ঝুঁকিভাতা বৃদ্ধি, আবাসন সংকটের নিরসন এবং বিদেশে মিশনে যাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হয়। পুলিশের পোশাকে পরিবর্তন এবং আধুনিকায়নের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়। গত ১০ মে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওইদিন তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, শোষকের নয়, পুলিশকে হতে হবে শোষিতের বন্ধু। পুলিশকে হতে হবে জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু।
১১ মে পুলিশ সদর দপ্তরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে ১৮৬১ সালের ব্রিটিশ আমলের পুলিশ আইন সংস্কারের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। মাঠপর্যায়ে পুলিশের চেইন অব কমান্ড এবং কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়। ১২ মে আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে বাহিনীর কারিগরি সক্ষমতা। অপরাধীরা এখন ডিজিটাল মাধ্যমে সক্রিয়। তাই পুলিশকে শুধু লাঠি বা বন্দুক দিয়ে নয়, বরং মেধা ও প্রযুক্তি দিয়ে লড়তে হবে। ১৩ মে পুলিশ সপ্তাহের শেষ দিনে কনস্টেবল থেকে শুরু করে পরিদর্শক পদমর্যাদার সদস্যদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আবাসন সংকট, ঝুঁকিভাতা এবং পরিবারের চিকিৎসা-সুবিধার মতো মৌলিক দাবি শীর্ষ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সরকারের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। কনস্টেবল পর্যায়ে রেশন সুবিধা বাড়ানো এবং কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করার দীর্ঘদিনের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং অপরাধ সংঘটনের আগেই অপরাধীদের প্রতিহত করতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে পুলিশের তিনটি ইউনিট। অজ্ঞাত পরিচয়ের মৃতদেহের শনাক্তকরণে নতুন কৌশলের প্রস্তাব, বিদেশি নাগরিকদের ওপর কঠোর নজরদারিসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়। পুলিশের গত এক বছরের সাফল্য-ব্যর্থতার তথ্যও তুলে ধরা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ সপ্তাহে দাবি উত্থাপন করা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আশ্বাস মিলেছে। যদিও বেশিরভাগ আশ্বাস পূরণ করা হয় না। অন্যান্য বছরের দাবির পাশাপাশি ময়মনসিংহ মহানগর পুলিশ প্রতিষ্ঠা, পুলিশের জন্য আরও নতুন তিনটি ইউনিট গঠন, পুলিশ লাইন তৈরি করা, ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও উচ্চপর্যায়ে পদ সৃষ্টিসহ একাধিক দাবি তোলা হয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।’
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বতন্ত্র বিভাগ গঠন করা হলে আইজিপি মন্ত্রণালয়ে বসেই সিনিয়র সচিবের ভূমিকা পালন করতে পারবেন বলে আমরা সরকারকে বলেছিলাম। আইজিপির পদটি সিনিয়র সচিবের মর্যাদার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবও একই পদমর্যাদার। পুলিশের ছুটি, বদলির কাজগুলো এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই করা হয়। পুলিশের দাবি, এসব কাজ আইজিপির অধীনেই থাকুক। পুলিশকে অধীনস্থ দপ্তর ভাবা ঔপনিবেশিক মানসিকতা। তিন লাখের বেশি সদস্যের এ বাহিনীকে পৃথক বিভাগ বা স্বতন্ত্র অধিদপ্তরও করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের নতুন তিনটি ইউনিট গঠন করতে প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিবেশ পুলিশ ইউনিট গঠনের প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নদী-খাল-বন দখল, বালু-পাথর উত্তোলন, ইটভাটার মাধ্যমে বায়ুদূষণ, পাহাড় কাটাসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করছে পুলিশ। বিশেষ একটি ইউনিট থাকলে সমন্বিত নজরদারি করা সম্ভব হবে।’
তিনি বলেন, ‘বিগত কয়েকটি পুলিশ সপ্তাহে পরিদর্শকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে দাবি উঠেছে ইনস্পেক্টর থেকে আইজিপি পর্যন্ত সবাইকে ঝুঁকিভাতার আওতায় আনতে হবে। এবারও দাবিটি করা হয়েছে। তবে আমরা হতাশ। পুলিশকে নিয়ে কোনো সরকারই চিন্তা করে না। রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে শুধু ব্যবহার করে।’