চীন সফরে ট্রাম্পের পাওয়া সীমিত

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে দুই দিনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি চীনের সঙ্গে 'দারুণ বাণিজ্য চুক্তি' করেছেন, যা উভয় দেশের জন্যই উপকারী হবে। তবে এখন পর্যন্ত দুই পরাশক্তির মধ্যে ঠিক কী কী বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। 

চীনে ট্রাম্পের সফরসঙ্গী ছিলেন কৃষি, বিমান, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ মার্কিন ব্যবসায়ী।

সফরজুড়ে উষ্ণ কূটনৈতিক পরিবেশ ও আনুষ্ঠানিকতার ছাপ ছিল স্পষ্ট। ট্রাম্পকে সম্মান জানাতে গার্ড অব অনার, রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতাদের আবাসিক কমপ্লেক্সে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

বৈঠক শেষে ট্রাম্প বলেন, আলোচনা ছিল খুবই সফল। অন্যদিকে শি জিনপিং এই সফরকে 'ঐতিহাসিক ও মাইলফলক' হিসেবে উল্লেখ করেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই জানিয়েছেন, আগামী শরতে শি জিনপিং হোয়াইট হাউস সফর করবেন।  

তবে বড় ধরনের বাণিজ্য চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি। যদিও এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প দাবি করেন, চীন ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে সম্মত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও ৭৫০টি বিমান কেনার সম্ভাবনাও রয়েছে। মার্কিন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং এই চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ট্রাম্প আরও বলেন, চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে 'বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের' সয়াবিন কিনবে, যা মার্কিন কৃষকদের জন্য বড় সুখবর হবে।

তবে এসব চুক্তির বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি চীন। বোয়িং চুক্তি চূড়ান্ত হলে প্রায় এক দশকের মধ্যে এটি হবে চীনের সঙ্গে কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় সমঝোতা। বেইজিং-ওয়াশিংটন বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই কোণঠাসা ছিল বোয়িং। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জাইকুন ট্রাম্পের দাবি নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও মন্তব্য করেন, 'চীন-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক লাভ ও সহযোগিতা।'

তিনি বলেন, দুই দেশের উচিত নেতাদের মধ্যে হওয়া গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা আনা। গত অক্টোবরে দুই দেশ একটি শুল্ক সমঝোতায় পৌঁছেছিল। এর আওতায় ওয়াশিংটন চীনা পণ্যের ওপর নতুন উচ্চ শুল্ক আরোপ স্থগিত করে এবং বেইজিংও শিল্পখাতে গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিত করার সিদ্ধান্ত শিথিল করে।

তবে এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়েও এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, বৈঠকে শুল্ক নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে হোয়াইট হাউস বলেছে, দুই নেতা 'বোর্ড অব ট্রেড' নামে একটি নতুন কাঠামো গঠনে একমত হয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে বারবার শুল্ক আলোচনা পুনরায় শুরু করতে না হয়।

এ সফরের অন্যতম আলোচিত দিক ছিল ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি। ইলন মাস্ক এবং জেনসেন হুয়াং এর মতো প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরা ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন। বিশেষ করে এনভিডিয়ার প্রধানের সফরে যোগ দেওয়া এআই ও চিপ প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনার গুরুত্ব বাড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।  

যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে চীনে উন্নত এআই চিপ বিক্রি বর্তমানে সীমিত। তবে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই উন্নত প্রযুক্তিতে আরও বেশি প্রবেশাধিকার দাবি করে আসছে এবং পশ্চিমাদের প্রযুক্তিনির্ভর সীমাবদ্ধতার সমালোচনা করছে। এআই নিয়েও দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, 'আমরা কিছু সুরক্ষাব্যবস্থা বা গার্ডরেইল নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছি।'  

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরাও চীনে আরও বেশি সয়াবিন, গরুর মাংস ও পোলট্রি রপ্তানির আশা করছেন। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানিয়েছেন, কৃষিপণ্য কেনা নিয়ে চীনের সঙ্গে সমঝোতা আরও শক্ত হয়েছে। যদিও চীন এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নতুন চুক্তির কথা স্বীকার করেনি। বেইজিং সফরে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য চীনা বাজারে প্রবেশ সহজ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার খবরে বলা হয়, শি জিনপিং মার্কিন ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, চীনের দরজা আরও উন্মুক্ত হবে এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে আরও বড় সুযোগ পাবে। তিনি বাণিজ্য, কৃষি, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও আইনশৃঙ্খলা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক 'পারস্পরিক লাভজনক' এবং 'উভয় পক্ষের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনে।'