কৃতজ্ঞতায় নেয়ামত বাড়ে

মহান আল্লাহর প্রতি মানুষের কৃতজ্ঞতাবোধ হৃদয়কে প্রশান্ত করে। এটি স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে এক নিবিড় আধ্যাত্মিক যোগসূত্র। যখন কোনো হৃদয় তৃপ্তির সুধায় সিক্ত হয়ে মহান রবের প্রতি অবনত হয়, তখন তার জীবনে নেমে আসে অলৌকিক প্রাচুর্য। কৃতজ্ঞতা হলো সেই চাবিকাঠি, যা অফুরন্ত নেয়ামতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয় এবং মানুষের সীমাবদ্ধ জীবনকে অসীম কল্যাণের সঙ্গে সংযুক্ত করে। মহাবিশ্বের এই সুবিশাল আয়োজনে প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি স্পন্দন আর প্রতিটি মুহূর্তই পরম করুণাময়ের এক একটি অমূল্য দান। এই দানকে স্বীকার করে নেওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানব জীবনের প্রকৃত সার্থকতা।

ইসলামি জীবনদর্শনে কৃতজ্ঞতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর গুরুত্ব বোঝাতে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা ইব্রাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন, ‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা করলেন, যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব। আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয় আমার আজাব বড়ই কঠিন।’

এই আয়াতটি মুমিনের জীবনের এক ধ্রুবসত্য। এখানে মহান আল্লাহ পরিষ্কারভাবে দুটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে নেয়ামত বৃদ্ধির নিশ্চয়তা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, অকৃতজ্ঞতার ভয়াবহ পরিণাম। আল্লাহর এই প্রতিশ্রুতি কখনো মিথ্যা হওয়ার নয়। কৃতজ্ঞতা কেবল মুখে আলহামদুলিল্লাহ বলার নাম নয়, বরং এটি অন্তর, মুখ এবং কর্মের এক সমন্বিত রূপ। যখন একজন বান্দা তার অর্জিত প্রতিটি সাফল্য ও সুখকে আল্লাহর অনুগ্রহ বলে মনে করে, তখন তার মধ্যে বিনয় জন্ম নেয়। এই বিনয়ই তাকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে এবং তার জীবনে বরকতের দুয়ার খুলে দেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন ছিল কৃতজ্ঞতার মূর্ত প্রতীক। তিনি সারা রাত দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তেন, ফলে তার পা মোবারক ফুলে যেত। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) যখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কেন এত কষ্ট করছেন, অথচ আপনার আগের ও পরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে? তখন নবীজি (সা.) উত্তর দিয়েছিলেন, আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না? (সহিহ বুখারি)

মহান আল্লাহর দয়া আমাদের ওপর এতই বেশি যে, আমরা চাইলেও তা গণনা করে শেষ করতে পারব না। সুরা নাহলের ১৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি তোমরা আল্লাহর নেয়ামত গণনা করো, তবে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’

কৃতজ্ঞতার তিনটি স্তর রয়েছে, যা প্রতিটি মুমিনের উপলব্ধি করা প্রয়োজন। প্রথমত, অন্তরের কৃতজ্ঞতা। অর্থাৎ মনেপ্রাণে এই বিশ্বাস রাখা যে, আমার কাছে যা কিছু আছে তা কেবল আল্লাহর দান। নিজের মেধা বা পরিশ্রমকে সবকিছুর মূল মনে না করে আল্লাহর করুণাকে স্বীকার করা। দ্বিতীয়ত, জিহ্বার কৃতজ্ঞতা। সবসময় আল্লাহর প্রশংসা করা এবং মানুষের কাছে তার দয়ার কথা আলোচনা করা। তৃতীয়ত, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কৃতজ্ঞতা। অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতগুলোকে তার অবাধ্যতায় ব্যয় না করে তার সন্তুষ্টির কাজে লাগানো। যেমন চোখের কৃতজ্ঞতা হলো, এটি দিয়ে হারাম কিছু না দেখা, হাতের কৃতজ্ঞতা হলো এটি দিয়ে কারও অনিষ্ট না করা। যখন একজন মানুষ এই তিন স্তরে কৃতজ্ঞতা আদায় করে, তখন তার জীবন এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়।

দুনিয়ার জীবনে আমরা অনেক সময় অল্পতেই হতাশ হয়ে যাই। যা পাইনি তার শোকে যা পেয়েছি তার কথা ভুলে যাই। অথচ কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষের মানসিক প্রশান্তি অর্জনে বড় ভূমিকা রাখে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানও বলছে, যে মানুষ যত বেশি কৃতজ্ঞ থাকে, তার বিষণœতা তত কম হয়। কিন্তু ইসলাম আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে চৌদ্দশ বছর আগেই।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুমিনের বিষয় কতই না চমৎকার! তার সব কাজই কল্যাণময়। মুমিন ছাড়া আর কেউ এ সৌভাগ্য লাভ করতে পারে না। সে সুখ-শান্তি লাভ করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর দুঃখ-বিপদে পতিত হলে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়। এই ভারসাম্যপূর্ণ জীবনই মুমিনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। (সহিহ মুসলিম)

কৃতজ্ঞতা কেবল আল্লাহর প্রতি সীমাবদ্ধ নয়, বরং সৃষ্টির প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়াও ইসলামের শিক্ষা। যে মানুষ মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে পারে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হতে পারে না।

হাদিসে এসেছে, যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ হয় না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হয় না। (তিরমিজি) আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মা-বাবা, শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব এমনকি আমাদের সেবায় নিয়োজিত প্রতিটি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। এই সামাজিক কৃতজ্ঞতা পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে। যখন আপনি কারও ছোট একটি উপকারের জন্য তাকে ধন্যবাদ দেন বা তার জন্য দোয়া করেন, তখন সমাজে ইতিবাচকতার প্রসার ঘটে।

আল্লাহ যখন কৃতজ্ঞ বান্দাকে নেয়ামত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, তখন সেই বৃদ্ধি কেবল সংখ্যাগত নয়, বরং তা বরকতময় হয়। অনেক সময় দেখা যায়, কারও অল্প সম্পদ কিন্তু তাতে অনেক তৃপ্তি ও শান্তি আছে। আবার কারও অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও জীবনে চরম অশান্তি বিরাজমান। কৃতজ্ঞতা মানুষের সম্পদে ও সময়ে বরকত দান করে। অকৃতজ্ঞতা মানুষের জীবন থেকে সুখ কেড়ে নেয়। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে পূর্ববর্তী জাতিদের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যারা আল্লাহর নেয়ামত পেয়েও অকৃতজ্ঞ হয়েছিল এবং পরে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সাবা সম্প্রদায়ের কাহিনি এর বড় প্রমাণ। তারা প্রাচুর্যে ঘেরা ছিল, কিন্তু আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করায় তাদের ওপর নেমে এসেছিল কঠিন প্লাবন।

বর্তমান ভোগবাদী সমাজে আমাদের চাওয়া-পাওয়ার কোনো শেষ নেই। আমরা সবসময় ওপরের দিকে তাকাই এবং নিজের অপূর্ণতা নিয়ে আক্ষেপ করি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জীবনযাপনের একটি চমৎকার মূলনীতি শিখিয়ে দিয়েছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কারও নজর যদি এমন লোকের ওপর পড়ে, যাকে ধনসম্পদ ও দৈহিক গঠনে অধিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তবে সে যেন এমন লোকের দিকে নজর দেয়, যে তার চেয়ে নিম্ন স্তরে রয়েছে। (সহিহ বুখারি) এটিই আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে তুচ্ছ না মনে করার সর্বোত্তম পন্থা। আপনি যখন দেখবেন আপনার চেয়েও খারাপ অবস্থায় অনেকে আছে, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আপনার মুখ দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বেরিয়ে আসবে। এই মানসিকতা আপনাকে লোভ ও হিংসা থেকে মুক্ত রাখবে।

একজন কৃতজ্ঞ বান্দা জানে, তার সামর্থ্য বলতে কিছুই নেই, সবটুকুই আল্লাহর তওফিক। এই চেতনা তাকে অহংকার থেকে দূরে রাখে। অকৃতজ্ঞতার মূল কারণ হলো অহংকার। শয়তান যখন জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল, তখন সে চ্যালেঞ্জ করেছিল, আদম সন্তানদের অধিকাংশকেই সে অকৃতজ্ঞ করে রাখার চেষ্ট চালাবে।

আমাদের চারপাশে তাকালে আমরা দেখতে পাই কতশত নেয়ামত আমাদের ঘিরে রেখেছে। সুস্থ শরীর, মাথার ওপর ছাদ, খাবারের ব্যবস্থা আর প্রিয়জনদের ভালোবাসা। আমরা যদি প্রতিটি নেয়ামতের জন্য আলাদা করে শুকরিয়া আদায় করতে চাই, তবে আমাদের পুরো জীবনও যথেষ্ট হবে না। তবুও যতটুকু সম্ভব আল্লাহর জিকিরে জিহ্বাকে সিক্ত রাখা মুমিনের কর্তব্য। সকাল-সন্ধ্যার জিকিরগুলোতে আল্লাহর প্রশংসার যে বাক্যগুলো রয়েছে, সেগুলো নিয়মিত পাঠ করা উচিত। ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন’, তথা সমস্ত প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য, এই ছোট বাক্যটিও নেকি পাল্লাকে ভারী করে দেয়।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার