ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সদাচরণ করা শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণের মূল ভিত্তি। বহুত্ববাদী বিশ্বে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পরমতসহিষ্ণুতা সামাজিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। মানব ইতিহাসের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন দার্শনিক, সামাজিক এবং বিশেষ করে ধর্মীয় মতাদর্শে অমুসলিম বা ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষদের সঙ্গে সদাচরণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একটি বৈচিত্র্যময় সমাজে বসবাস করতে গেলে ভিন্নমতের মানুষের মৌলিক অধিকার, জীবনের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার আইনি ও নৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই মূল্যবোধের বাস্তব প্রয়োগ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন যুগে দেখা গেছে। মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ইনসাফই সভ্যতার দীর্ঘ পথযাত্রাকে সচল রেখেছে।
ইসলামি জীবনদর্শনে অমুসলিম নাগরিকদের সঙ্গে ইনসাফপূর্ণ আচরণ করার বিষয়টি ঐশী নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনের সুরা মুমতাহিনার ৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ উল্লেখ করেছেন, ‘দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করছেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায় পরায়ণদের ভালোবাসেন।’
এই ঐশী বাণীর মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয় যে, অমুসলিমদের সঙ্গে সামাজিক লেনদেন, সখ্যতা ও মানবিক আচরণের ক্ষেত্রে ইসলাম একটি উদার ও ইনসাফভিত্তিক সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে। মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেই জন্মগতভাবে সম্মান পাওয়ার যোগ্য। সুরা ইসরার ৭০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি, তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে বাহন দিয়েছি এবং দিয়েছি উত্তম রিজিক। আমি তাদেরকে আমার অধিকাংশ সৃষ্টির ওপর মর্যাদায় শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) তার জীবনে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। সহিহ বুখারির ১৩১২ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবদুর রহমান ইবনে আবু লায়লা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহল ইবনে হুনাইফ ও কায়েস ইবনে সাদ (রা.) কাদিসিয়ায় উপবিষ্ট ছিলেন, তখন লোকেরা তাদের সামনে দিয়ে একটি লাশ নিয়ে যাচ্ছিল। (তা দেখে) তারা দাঁড়িয়ে গেলেন। তখন তাদের বলা হলো, এটা তো অমুসলিমের লাশ। তখন তারা বললেন, (একদা) নবীজি (সা.)-এর সামনে দিয়ে একটি লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখন তিনি দাঁড়িয়ে গেলে তাকে বলা হলো, এটা তো এক ইহুদির লাশ। তিনি বললেন, সে কি মানুষ নয়? (সহিহ বুখারি) এই ঘটনা প্রমাণ করে, মানুষের জীবনের মূল্য এবং তার মানবিক মর্যাদা অনেক।
সামাজিক সহাবস্থানের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, অন্য ধর্মের মানুষের বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করা এবং কোনো ধরনের উসকানি বা কটূক্তি থেকে বিরত থাকা। ইসলামে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি অত্যন্ত সুদৃঢ়। সুরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হেদায়েত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে। অতএব যে ব্যক্তি তাগুতকে (মিথ্যা মাবুদ) অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনে, অবশ্যই সে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে, যা ছিন্ন হওয়ার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’
অর্থাৎ কাউকে জোরপূর্বক কোনো আদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এর পাশাপাশি, অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপাস্য বা প্রতিমাদের গালি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে সমাজে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়। সুরা আনআমের ১০৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা তাদের গালমন্দ করো না, আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তারা ডাকে, ফলে তারা গালমন্দ করবে আল্লাহকে, শত্রুতা পোষণ করে অজ্ঞতাবশত। এভাবেই আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য তাদের কর্ম শোভিত করে দিয়েছি। তারপর তাদের রবের কাছে তাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তিনি জানিয়ে দেবেন তাদের, যা তারা করত।’
এই নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো, সমাজে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষের পথ চিরতরে বন্ধ করা এবং একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা।
লেখক : শিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার, আসাম, ভারত
