পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট। সব পর্বতারোহীই স্বপ্ন দেখেন এভারেস্ট শীর্ষবিন্দুতে পা রাখার। কেউ সফল হন, আবার কেউ ব্যর্থতা সঙ্গী করে ফিরে আসেন পরের বার অভিযানের স্বপ্ন নিয়ে; আবার অনেকেই দুর্গম পথ ও চরম বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকার প্রাণশক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলন। তবুও পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতের শীর্ষে আরোহণের যাত্রা থেমে থাকে না। প্রতি বছরই বিশ্বের নানা প্রান্তের হাজার হাজার পর্বতারোহী এসব ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ মেনে নিয়েই এভারেস্টের পথে পা বাড়ান আর এই অভিযানে পর্বতারোহীদের সঙ্গী হন অভিজ্ঞ কোনো গাইড; যারা শেরপা নামেই বেশি পরিচিত। এবার পর্বতারোহণের ইতিহাসে এক অনন্য ও ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন সুপরিচিত নেপালি শেরপা কামি রিতা। নিজের আগের সব রেকর্ড ভেঙে বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম পর্বতারোহী হিসেবে ৩২ বারের মতো বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন কিংবদন্তি কামি রিতা। গতকাল রবিবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার (২৯ হাজার ৩২ ফুট) উচ্চতার এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখেন ৫৬ বছর বয়সী এই দুঃসাহসী অভিযাত্রী। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, আর কোনো পর্বতারোহী তার ধারেকাছেও নেই; গত বছরই ওই চূড়ায় ৩১তম বার উঠেছিলেন তিনি।
শুধু কামি রিতা নন, একই দিনে নেপালের আরেক পর্বতারোহী লখপা শেরপাও নতুন ইতিহাস গড়েছেন। ৫২ বছর বয়সী লখপা শেরপা প্রথম নারী পর্বতারোহী হিসেবে ১১তম বারের মতো এভারেস্ট জয় করার গৌরব অর্জন করেছেন। নেপালের পর্যটন বিভাগ ও বেস ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, কামি রিতা শেরপা সর্বশেষ ‘ফরটিন পিকস এক্সপেডিশন’ নামের একটি আন্তর্জাতিক পর্বতারোহী প্রতিষ্ঠানের পর্যটকদলের প্রধান গাইড হিসেবে এই অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ১৯৯৪ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি প্রথমবার এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন। ২০১৪, ২০১৫ ও ২০২০ সাল বাদে প্রতিবছরই তিনি অন্তত একবার এভারেস্ট শীর্ষে আরোহণ করেছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ওই তিন বছর আলাদা আলাদা কারণে এভারেস্টে আরোহণ বন্ধ ছিল। কোনো কোনো বছরে দুইবারও এভারেস্ট চূড়ায় ওঠার রেকর্ড আছে কামি রিতার। পাহাড়ি পর্যটনের প্রসারে কামি রিতার অবদান এবং এই ঐতিহাসিক অর্জনের পর নেপালের পর্যটন বিভাগ ও বিশ্ব পর্বতারোহী সম্প্রদায় তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে।
কামি রিতা জন্মেছেন নেপালের সোলুখুমবু জেলার থামে গ্রামে; ১৯৭০ সালের ১৭ জানুয়ারি। একই গ্রামে জন্মেছিলেন তেনজিং নোরগে। নোরগে এবং নিউজিল্যান্ডের এডমুন্ড হিলারি ১৯৬৩ সালে প্রথমবার এভারেস্ট চূড়ায় ওঠার গৌরব অর্জন করেন। নোরগে ও হিলারির পর এখন পর্যন্ত ৮ হাজারের বেশি মানুষ এভারেস্টের চূড়ায় গেছেন; তাদের মধ্যে অনেকে একাধিকবারও পর্বতশৃঙ্গটির শীর্ষে উঠেছেন। শেরপাদের বাইরে বিশ্বের এই সর্বোচ্চ শৃঙ্গের চূড়ায় ওঠার রেকর্ডটি রয়েছে ব্রিটিশ গাইড কেনটন কুলের। তিনি ১৯ বার এভারেস্টের মাথায় চড়েছেন। তার পেছনে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই পর্বতারোহী ডেভ হান ও গ্যারেট ম্যাডিসন। তারা প্রত্যেকেই ১৫ বার করে এভারেস্টের চূড়ায় উঠেছেন। কুল আর ম্যাডিসন এবারও এভারেস্ট চূড়ায় উঠে নিজেদের রেকর্ড আরও বাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টায় রয়েছেন।
সাধারণ মানুষের চোখে ৩২ বার এভারেস্ট জয় করা এক অতিমানবীয় কীর্তি হলেও, কামি রিতার কাছে এটি তার যাপিত জীবনেরই অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্বতারোহীদের এভারেস্টের চূড়ায় নিয়ে যাওয়াই তার পেশা। বিদেশি পর্বতারোহীদের এভারেস্ট ও অন্যান্য পর্বতচূড়ায় নিয়ে যাওয়া- সোলুখুমবু জেলার বাসিন্দা অনেক শেরপা পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এ সোলুখুমবু জেলাতেই এভারেস্টের অবস্থান। এ বছর মার্চ-মে পর্বতারোহণ মৌসুমে এভারেস্ট চূড়ায় উঠতে ৪৯২টি অনুমোদনপত্র বা পারমিট দিয়েছে নেপালি কর্র্তৃপক্ষ। পর্বতশৃঙ্গটিতে ওঠার চেষ্টায় চলতি মাসে ৩ জনের মৃত্যুও হয়েছে।