দেশের চামড়ার শিল্পের সম্ভাবনাকে গত কয়েক বছরে নষ্ট করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন, শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। চামড়া শিল্পে ১০-১২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে অর্থ বিনিয়োগ করলে প্রচুর রিটার্ন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না বলে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী। গতকাল রবিবার শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, গবেষক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে চামড়া শিল্প খাতের উন্নয়নে সুপারিশ প্রদান ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ণে টাস্কফোর্সের ৯ম সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় ঈদের আগে চামড়া শিল্প নগরীতে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী।
সভায় আরও উপস্থিত উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিবেশ অধিদপ্তর, বেজা, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (রেপিড) এবং চামড়া শিল্পের মালিকদের সংগঠনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রী বলেন, হাজারীবাগে যে ট্যানারি শিল্পকারখানাগুলো ছিল, সেটি কোনো কাক্সিক্ষত পরিবেশ ছিল না, এটি সত্য। তবে এখান থেকে সাভারে সরানোর সময় যে প্ল্যান-পরিকল্পনার দরকার ছিল, সেটি সঠিকভাবে নেওয়া হয়নি। যথাযথ পরিকল্পনা না হওয়ায় চামড়া শোধনাগার হাজারীবাগ থেকে সরানোটা ফাংশনাল হয়নি। হাজারীবাগে যে পরিমাণ কারখানা ছিল, সেগুলোর বেশ কিছু সাভারে যায়নি।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা এখন যথাযথ মূল্যায়নও পাচ্ছি না; এর কারণ হলো কমপ্লায়েন্সের অভাব। আরেকটা বিষয় হলো দেশে যে পরিমাণ চামড়া উৎপাদন হয়, তার মাত্র দশমিক ২৬ পার্সেন্ট মাত্র রপ্তানি হয়। এখানে রপ্তানি আরও অন্তত ২০ গুণ বাড়ানো সম্ভব। বাইরের দেশের একজন বায়ার ইচ্ছে থাকলেও ‘নন কমপ্লায়েন্স’ কোনো পণ্য কিনতে পারেন না। এক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষা করে শোধনাগার করাটা খুবই জরুরি।
শিল্পমন্ত্রী বলেন, আমাদের যে সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টটি (সিইটিপি) রয়েছে, এটিকে পুরোপুরি ফাংশনাল করতে হবে। এক্ষেত্রে যে টেকনিক্যাল বিষয়গুলো রয়েছে, তা খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে। প্রয়োজনে সিইটিপিকে অধিক কার্যকর করতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া হবে। এখানে শতভাগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এ জন্য যা যা করার দরকার বর্তমান সরকার সবকিছু করতে প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চামড়া খাত ১০-১২ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনাময় একটি খাত। এখানে অর্থ বিনিয়োগ করলে প্রচুর রিটার্ন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে কত মানুষের কর্মসংস্থান হবে, সেটি আমাদের বুঝতে হবে। একটি ৩০-৪০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়। অথচ সেই কেন্দ্রে কর্মী খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্যদিকে এই ট্যানারি শিল্পের জন্য ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে সেখানে অন্তত ৫০০ থেকে ১০০০ লোকের কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
সভায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা জানান, ইউরোপীয় বায়াররা অভিযোগ করেন যে, বাংলাদেশে বনভূমি দখল করে চামড়া শোধনাগার করা হয়েছে, এ জন্য তারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া কিনতে চান না। বাংলাদেশ থেকে এই মেসেজটি ক্লিয়ার করা উচিত। এক্ষেত্রে কারখানার পরিবেশ নিয়ে সরকারি ছাড়পত্রের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া রিসাইকেল সেক্টরে ইনটেনসিভের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তারা।
সভায় পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, গার্মেন্টস শিল্পের পর এই চামড়া শিল্প বাংলাদেশের জন্য একটি অধিক সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে। এক্ষেত্রে আমাদের পরিবেশকে ঠিক রেখেই এগিয়ে চলতে হবে। এত সম্ভবনাময় এই খাতকে, হাত ফসকে বের হয়ে যেতে দেওয়া ঠিক হবে না।
শিল্প নগরীর নিরাপত্তা বিষয়ে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সাভারে চামড়া শিল্প নগরীর ২০০ একর জমিতে কোনো বাউন্ডারি নেই। এখানে প্রায়ই চুরি-ছিনতাইয়ের অভিযোগ আসে। শিল্প অঞ্চলের নিরাপত্তা বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে আর্ম ব্যাটালিয়ন আনসার বাহিনীর দুই-একটা ইউনিটকে কাজে লাগাতে হবে। ঈদের আগে আরও কিছু বাড়তি টহলের ব্যবস্থা করতে হবে। ওখানের ব্যবসায়ীরা চান নিরাপত্তা জোরাদার করা হোক। প্রয়োজনে তারা প্রশাসনের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করতেও প্রস্তুত রয়েছেন।