ওমানে চার ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু

মঙ্গলবার রাতে মরদেহ আসছে দেশে

দুই ভাই দেশে আসবে। তার আগে চার ভাই মিলে খাওয়াদাওয়া, দেশে আসার টিকিট সংগ্রহ এবং শপিং করছিল উৎসাহ নিয়ে। এদিকে রাত দশটা থেকে বিভিন্ন সময় ভিডিও কলে যুক্ত ছিল দেশে থাকা অপর এক ভাই মোহাম্মদ এনাম। এছাড়াও দেশে থাকা মা, ভাবি ও ভাইপো ভাতিজিদের সাথেও কথা হচ্ছিল কিছুক্ষন পর পর। চার ভাই ভিডিও কলে দেখাচ্ছিল টিকিট ও বিভিন্ন শপিং। 

এসবের এক পর্যায়ে হঠাৎ রাত বারোটার দিকে গাড়িতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সবার ছোট শহিদ। দেশে থাকা ভাই মোহাম্মদ এনামকেও জানানো হয় অসুস্থতার কথা। এনাম বিষয়টিকে অন্যবারের মত স্বাভাবিকভাবেই নিয়ে ভাইদের পরামর্শ দেয় ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে। ওমানে থাকা ভাইয়েরাও দেশে থাকা এনামকে বলে, অসুস্থ মাকে ঘুম পাড়িয়ে তাকেও শুয়ে যেতে। এরপর এনাম ও পরিবারের সাথে বিদায় নিলে দেশে থাকা পুরো পরিবার ঘুমিয়ে পড়েন। তখন বাংলাদেশ সময় প্রায় রাত ১২ টা বলে জানান দেশে থাকা এনাম।
ঘটনার পরবর্তী দেশ বিদেশে চার ভাইয়ের অস্বাভাবিক এই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৃত্যুর খবরের পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ে ধারণা ভিত্তিক বিভ্রান্তিকর অপতথ্য। 

দেশ রূপান্তরের রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি অনুসন্ধানে নামলে জানা যায়, ওমানে চার ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট জ্ঞান হারিয়ে ফেলা শহিদের সেবা সুশ্রুষা করতে না করতেই বমি হয় বড় ভাই রাশেদের। চিকিৎসা নিতে তারা চারজন মিলে ওমানের মালদ্দা আবু রাইয়ান হাসপাতালে নিজেদের গাড়িতেই পৌঁছান। হাসপাতালের পার্কিং এলাকায় গাড়িও পার্কিং করেন। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছালেও চার জনের বাকি দুইজনও অসুস্থ হয়ে পড়েন। গাড়ি থেকে নামতে না পেরে তারা ওমানে থাকা নিকট আত্মীয় ও বন্ধুদের সহায়তা চেয়ে কল ও ভয়েস পাঠান। কিন্তু কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসার আগেই গাড়িতেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে চার জন। 

এরপর গাড়িটি দীর্ঘ সময় পার্কিংয়ের একই স্থানে অবস্থান করায় আশেপাশের কয়েকজনের নজরে আসলে তারা গাড়ির বাইরে থেকে ডাকাডাকি করে সাড়া না পেলে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে তাদের জিনিসপত্র ও গাড়ি হেফাজতে নেয় এবং তাদের প্রথমে রোস্তাক নামের একটি ছোট সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থা জটিল বিবেচনায় সাথে সাথে মাস্কাট শীব মিলিটারি হসপিটালে নিয়ে যান। সেখানেও ডাক্তার তাদের মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতাল এবং পুলিশের তথ্যমতে গাড়ি ও এসির বিষাক্ত গ্যাসেই মৃত্যু হয় ৪ ভাইয়ের।
দেশ বিদেশের বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্র ও দেশে বেঁচে থাকা একমাত্র ভাই এনামের বর্ণনায় একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে।

ওমান প্রবাসী মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম জানান, ঘটনার পরপরই তিনিসহ প্রবাসী আত্মীয় ও বন্ধুরা ছুটে যান হাসপাতালে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনা খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তারা হাসপাতালে ছুটে আসেন এবং সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণে আছেন। রবিবার সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারা এখনো এ বিষয়ে তথ্য নেয়া, চার ভাইয়ের বাসা থেকে তাদের কাগজপত্র ও জিনিসপত্র সংগ্রহ এবং সার্বিকভাবে নিহতদের মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিহতদের মামা পরিচয়ে জসিম উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে রাঙ্গুনিয়ার স্থানীয় কয়েকটি পেইজে পোস্টকৃত ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, পাকিস্তানের এক নাগরিক তাদের খাবার দিয়েছিল এবং তার উদ্দেশ্য ছিল চার ভাই মারা গেলে তাদের দেশে আসার জন্য জমানো অর্থ সম্পদ বা স্বর্ণ ও দামি জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে যাওয়া। আর এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়। তবে নিহতদের মরদেহ নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে যারা ওমানে সরাসরি দায়িত্ব পালন করছেন তাদের দাবি ভিডিও বার্তায় এই দাবি করা ব্যক্তি ওমানে নয়, থাকেন সৌদি আরবে। এমনকি তিনি নিহতদের হাসপাতালেও আসেননি। তার দেয়া এই তথ্য সত্য নয়। এমনকি এই তথ্য ওমান থেকে মরদেহ দেশে আনয়নে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করতে পারে বলেও তারা জানান।
ওমানে সার্বিক বিষয় যারা দেখভাল করছেন তারা হলেন, মোহাম্মদ এমদাদ, মোহাম্মদ এনাম, নুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ ফারুক, মোহাম্মদ আজগর ও মোহাম্মদ রুবেলসহ আরো অনেকে। এছাড়াও পরিবারের পক্ষ থেকে যাদের প্রতিনিধি হিসেবে ওমানে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা নিহতদের বাসায় গিয়ে জিনিসপত্র, কাগজপত্র ও সার্বিক সবকিছু দেখভাল করছেন বলে জানান দেশে থাকা ভাই এনাম। কোন প্রকার গুজব না ছড়ানোর অনুরোধ জানান দেশে জীবিত থাকা একমাত্র ভাই মোহাম্মদ এনাম।

ওমানের সূত্র আরো জানান, ওমানের হাসপাতালের রিপোর্ট ও পুলিশের তদন্তে এখনো পর্যন্ত এসি থেকে নির্গত ও গাড়ি থেকে সৃষ্ট বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে ওমানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে ওমানের পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিহত চার ভাইয়ের অতীতের সার্বিক বিষয় তদন্ত করে পরবর্তী পর্যায়ে আরো একটি রিপোর্ট দেবেন বলে জানা গেছে। 

সার্বিক সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বুধবার চার ভাইয়ের মরদেহ ঢাকা বিমানবন্দর হয়ে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে ওমানে পরিবারের পক্ষ থাকা দায়িত্বশীলরা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টায় মরদেহ সরাসরি চট্টগ্রামে আনা যায় কিনা তার জন্য দেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহযোগিতা কামনা করেন। এছাড়াও ওমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার আবেদন করেছেন বলে তারা জানান।

এদিকে দেশে বেঁচে থাকা একমাত্র ভাই মোহাম্মদ এনাম জানান, তার সাথে রাত ১২ টা পর্যন্ত চার ভাই বিভিন্ন সময় মোবাইল ফোনে যোগাযোগও রাখে। তাদের অসুস্থতা এবং হাসপাতালে যাওয়ার কথাও জানানো হয়। তবে রাত ১২ টার পর কি হয়েছে তাদের আর জানা নেই। মাকে এখনো ভাইদের মৃত্যুর বিষয় জানানো হয়নি। মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে ওমানে সার্বিক বিষয়ে যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা যোগাযোগ যাখছেন। ভিডিও কলে তাদের বাসা ও জিনিসপত্রও দেখাচ্ছেন। 

স্থানীয় এমপি ও বিএনপি নেতা হুমাম কাদের চৌধুরী, জামায়াত নেতা ডা. রেজাউল করিম ও উত্তর জেলা যুবদল নেতা মুরাদ চৌধুরী ও ইউসুফ চৌধুরীসহ নানা সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ পরিবারকে সমবেদনা জানিয়েছেন এবং সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এছাড়াও কোন বিভ্রান্তিকর তথ্য না ছড়ানোরও অনুরোধ জানান দেশে থাকা ভাই মোহাম্মদ এনাম।

উল্লেখ্য গত বুধবার ওমানে চার ভাই মো. রাশেদ, মো. শাহেদ, মো. সিরাজ ও মো. শহিদকে নিথর দেহে উদ্ধার করে ওমানের পুলিশ। হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাদের মৃত ঘোষণা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।