বিদেশ থেকে আমদানির তুলনায় দেশে তৈরি ফ্রিজের দাম কম হওয়ায় ব্যাপকভাবে বেড়েছে ফ্রিজের ব্যবহার। ফলে একসময়ের বিলাস পণ্যটি এখন সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। মূলত সারা বছর টাকা জমিয়ে ঈদে ফ্রিজ কেনার পরিকল্পনা করেন সীমিত আয়ে চলে, এমন অনেক পরিবার। গৃহিণীরা মনে করেন, ফ্রিজ এখন আর শুধু খাবার রাখার যন্ত্র নয়, দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করার একটি মাধ্যম। তবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে এর জন্য বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে তাদের। ফলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্রিজ উৎপাদনের দিকে নজর দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন মডেল।
তবে দেশে ফ্রিজের বাজার নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা বা পরিসংখ্যান না থাকলেও খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ফ্রিজের মোট চাহিদার ৯০ শতাংশ পূরণ হয় দেশে উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে। বছরে এর চাহিদা কমবেশি ৩০ লাখ ইউনিট। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ বিক্রি হয় রোজার ঈদ ও কোরবানির ঈদে। শুধু কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বিক্রি হয় ১২ লাখের বেশি ফ্রিজ। প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে পণ্যটির চাহিদা বাড়ছে।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাজারে মানভেদে ১৫ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা বা তারও বেশি দামের ফ্রিজ রয়েছে। সারা বছর যে পরিমাণ ফ্রিজ বিক্রি হয়, তার ৭০ শতাংশই গ্রামে। তবে গ্রামে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকার ফ্রিজের চাহিদা বেশি। বর্তমানে সব মিলিয়ে ফ্রিজের বাজারের আকার ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা। যা ২০২৯ সাল নাগাদ ৩৬ হাজার কোটি টাকা পৌঁছাতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশি পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম দাম, মূল্য পরিশোধে কিস্তির ব্যবস্থা এবং ফ্রিজে সমস্যা দেখা দিলে ওয়ারেন্টি ও সার্ভিসিং সুবিধা কারণ হিসেবে কাজ করছে। তবে সরকারের সহযোগিতার অভাবে খাতটিতে বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ সমস্যার সমাধানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, কাঁচামাল আমদানিতে সহজে এলসি খোলা, ডলারের প্রাপ্যতা স্থিতিশীল থাকা, সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দেওয়াসহ সময়োপযোগী নীতি-সহায়তা এ খাতকে টেকসই করে তুলবে।
দেশে বর্তমানে ১৩টি প্রতিষ্ঠান ফ্রিজ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করছে ওয়ালটন। এ ছাড়া ভিশন, ইলেক্ট্রা, র্যাংগস, মিনিস্টার, ট্রান্সকম, ভিসতা ইলেকট্রনিকস, ওরিয়ন ও যমুনা গ্রুপ ফ্রিজ উৎপাদন করছে। পাশাপাশি বিদেশি ব্র্যান্ড স্যামসাং, সিঙ্গার, ওয়ার্লপুল, সনি-স্মার্ট ও কনকার কারখানাও গড়ে উঠেছে। আগে এসব প্রতিষ্ঠানের ফ্রিজ ছিল আমদানিনির্ভর।
এসব প্রতিষ্ঠান মোট চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই উৎপাদন করছে; বাকি ১০ শতাংশ আমদানি হয়ে থাকে। উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ করিয়েছে, সেখান থেকে সরে এসেছে। বারবার নীতি পরিবর্তন করছে। এতে বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রতি বছরই রাজস্ব সংক্রান্ত নতুন নতুন শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে বাড়তি সময় ও নতুন অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। এর প্রতিকারে সুনির্দিষ্ট ও টেকসই নীতিমালা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তারা; যাতে এ শিল্পে বিনিয়োগ গ্রাহকের চাহিদা মিটিয়ে কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদি অবদান রাখতে পারে।
ইতিমধ্যে স্থানী চাহিদা ও শিল্প সুরক্ষায় আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২৭) বাজেটে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের উৎপাদন, কাঁচামাল আমদানি ও খুচরা যন্ত্রাংশের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক হ্রাস বা যৌক্তিকীকরণের প্রস্তাব দিয়েছে খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ট্রেড বডি। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশের রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজ ও এয়ারকন্ডিশনার শিল্পে ব্যবহৃত প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বাজেটে এসব উপকরণের ওপর শুল্ক-কর প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতকে আমদানি বিকল্প, কর্মসংস্থানমুখী ও রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত করতে আয়কর ১০ শতাংশে নামানো, আগাম আয়কর এক শতাংশ করা, কাঁচামালের শুল্ক কমানো, সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার, ন্যূনতম মূল্য ব্যবস্থা বাতিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী কাঁচামালের শুল্কায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কাঁচামাল ও প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ও কর কমানো জরুরি।
এ বিষয়ে আরএফএল ইলেকট্রনিক্সের নির্বাহী পরিচালক মো. নুর আলম বলেন, দেশে ফ্রিজ ও এসির ভবিষ্যৎ ভালো। কিন্তু শুল্ক-করের চাপে খাতটি বাধাগ্রস্ত। এ খাতের আরও প্রসারে কাঁচামাল ও প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ও কর কমানো জরুরি। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং দেশীয় শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। এ ছাড়া সহজ অর্থায়ন ও ব্যাংক ঋণে সহনীয় সুদ এখন সময়ের দাবি। কারণ ডলারের দাম বৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান চাপে রয়েছে।