দেশ রূপান্তর : ২০১৭ সালে একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের পর ২০১৮ সালে সেনাবাহিনী কাজ শুরু করে। আর এতে জলাবদ্ধতা নিরসনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আট বছরের জার্নি কি অবশেষে শেষ হতে যাচ্ছে?
লে. কর্নেল মহসিনুল হক চৌধুরী : আল্লাহ সহায় হলে আগামী জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির মধ্যেই হয়তো আমাদের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাবে। আমরা অনেকদিন ধরেই দ্রুত কাজ শেষ করে চলে আসতে চেয়েছিলাম। প্রকল্পের মাঝপথে তো আর আশা যায় না, তাই ডিজাইন অনুযায়ী পুরো কাজ শেষ করেই আমরা সিডিএকে বুঝিয়ে দেব। সিডিএ তাদের বিধিমালা অনুযায়ী হয়তো সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করবে পুরো প্রকল্পের কাজ।
দেশ রূপান্তর : এখন পর্যন্ত কত শতাংশ কাজ হয়েছে এবং কী কী কাজ বাকি আছে?
লে. কর্নেল মহসিনুল হক চৌধুরী : প্রকল্পের ভৌত কাজ ৯৬ শতাংশ শেষ। এখন শুধু হিজরা খালের রিটেনিং ওয়াল নির্মাণকাজ ২৩ শতাংশ বাকি রয়েছে। এ ছাড়া আজব বাহার খাল, জামালখান খাল, রামপুর খাল ও মির্জাখালের কাজ ২ শতাংশ বাকি রয়েছে। এসব কাজ এবারের বর্ষার আগেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু বৈশাখের হঠাৎ ভারী বর্ষণের কারণে কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় এবারের বর্ষার আগে আর শেষ হচ্ছে না। আমরা খালের ভেতরে কাজ করার জন্য মাটি ফেলে যে রাস্তা তৈরি করেছিলাম এখন সব মাটি উঠিয়ে নিয়ে বাধাহীনভাবে পানি চলাচলের সুযোগ করে দিচ্ছি। তাই বর্ষা শেষে কাজ শুরু হলে দুই মাসের মধ্যে হয়তো পুরো কাজ শেষ হয়ে যাবে।
দেশ রূপান্তর : যেহেতু প্রধান প্রকল্পটি আপনারা (সেনাবাহিনী) বাস্তবায়ন করেছেন তাই প্রকল্প শেষে কি জলাবদ্ধতা নিরসন হবে? আর এ বছর দুর্ভোগ কেমন হবে?
লে. কর্নেল মহসিনুল হক চৌধুরী : জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও আরও তিনটি প্রকল্প রয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের বাইরে থাকা ২১টি খাল নিয়েও প্রকল্প নিতে হবে। সারমর্ম হলো সব প্রকল্পের মধ্যে একটি সমন্বয় থাকতে হবে এবং নালা ও খালগুলো যদি পরিষ্কার রাখতে হবে। একই সঙ্গে ঘর ও রাস্তার পাশের নালাগুলো দিয়ে সেকেন্ডারি খাল হয়ে প্রাইমারি খালে পানি স্বাভাবিকভাবে নেমে আসতে পারলে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ থাকবে না। অপরদিকে ২০২৩ সালে যেখানে নগরীর ১১২টি স্পটে, ২০২৪ সালে ৬২টি, ২০২৫ সালে ৭টি স্পটে জলাবদ্ধতা হয়েছিল। এবার এই সংখ্যা কমে তিন থেকে চারটি স্পট হতে পারে। এসব স্পটের মধ্যে নগরীর ঈদগাহ রূপসা বেকারির পাশে, হাজীপাড়া আশেকানে আউলিয়া কলেজের পাশে এবং আরও একটি স্পটে হয়তো পানি জমতে পারে। এ ছাড়া নগরীর অন্য কোনো এলাকায় পানি জমার পরিস্থিতি নেই।
দেশ রূপান্তর : প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রধান চ্যালেঞ্জ কী কী ছিল?
লে. কর্নেল মহসিনুল হক চৌধুরী : খালের পাড়ে অবৈধভাবে গড়ে তোলা একটি ভবনে এক বিধবা তার দুই কন্যা নিয়ে বসবাস করেন। আর ওই ভবনের তিন থেকে চারটি বাসা ভাড়ার আয় দিয়ে তাদের সংসার চলে। কিন্তু খালের সম্প্রসারণ করতে গিয়ে সেই ভবনটি ভেঙে দিতে গিয়ে আইনসিদ্ধ কাজ করলেও মানবিকভাবে কষ্ট পেয়েছি। অথবা কোনো এক সরকারি চাকরিজীবীর সারা জীবনের অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি একটি ভবন নির্মাণ করেছেন। খালের সম্প্রসারণ করতে গিয়ে সেই ভবনটি ভেঙে পড়েছে। এমনিভাবে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ৫ হাজার ৫০০ ভবন ভাঙা পড়েছে। এগুলো আমাদের মনকে নাড়া দিয়েছে।
শুধু এই চ্যালেঞ্জই নয়, এই খাল দিয়ে খালপাড়ের সব বসতির পানি, গ্যাস, সুয়ারেজ লাইনসহ সব ধরনের লাইন গিয়েছে। সব লাইন স্বাভাবিক রেখে জটিল এই খাল সম্প্রসারণের কাজ করাটা ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ। এক বছরের মধ্যে বর্ষার কারণে ছয় মাস কাজই করা যায়নি, বাকি ছয় মাসে এক বছরের কাজ করতে হয়েছে। অপরদিকে কারও ভবন ভাঙতে গিয়ে তিনি উচ্চ আদালত থেকে রিট নিয়ে এসেছেন এবং আমাদের ব্যক্তিগতভাবেও অনেক কিছু মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এমন অনেক দেখা না দেখা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হচ্ছে।
দেশ রূপান্তর : আমরা দেখেছি প্রকল্প শুরুর দুই বছর আপনারা (সেনাবাহিনী) কাজ এগুতে পারছিলেন না। এর কারণ কী ছিল?
লে. কর্নেল মহসিনুল হক চৌধুরী : প্রকল্পটি সেনাবাহিনীর ছিল না। সেনাবাহিনীর কাজে সব ধরনের ডিজাইন ড্রইং সম্পন্ন করে আমরা কাজ শুরু করি। কিন্তু এই প্রকল্পে বিক্ষিপ্তভাবে ৩৬টি খাল নিয়ে প্রকল্প অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। এখন এই খালগুলোর সঙ্গে নগরীর পানি নিষ্কাশনের কানেকটিভিটি আছে কি না তা যাচাই করা হয়নি। তাই আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দুই বছর প্ল্যানিং করতে হয়েছে। আর সেই প্ল্যানিং অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে নতুন নতুন অনেক ড্রেন (১১৫টি কানেকটিং ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে, যা দুটি খাল বা বড় নালার সংযোগ রক্ষা করেছে) নির্মাণ করেছি, অনেক কালভার্ট নির্মাণ করতে হয়েছে। আর এতেই শুরুর দিকে কাজ এগুনো যায়নি, তবে এখন নগরীর পুরো খালের নেটওয়ার্ক আমাদের নখদর্পণে।
দেশ রূপান্তর : আপনার প্রকল্প হস্তান্তর করার পর সিটি করপোরেশন কি এগুলো মেইনটেইন করতে পারবে?
লে. কর্নেল মহসিনুল হক চৌধুরী : আমরা গত আট বছর যেভাবে নালা ও খাল পরিষ্কার রেখেছি, সিটি করপোরেশনও তা করবে। তবে যেহেতু পুরো প্রকল্পটি আমরা বাস্তবায়ন করেছি, তাই দুই বা তিনটি মৌসুম নালা ও খাল পরিষ্কার এবং স্লুইসগেট অপারেশন কার্যক্রম সিটি করপোরেশন যৌথভাবে আমাদের সঙ্গে করতে পারে। এতে সিটি করপোরেশনের লোকজন খাল ও নালাগুলো পরিষ্কারের পদ্ধতি জেনে যাবে এবং তখন আর সমস্যা হবে না।
লে. কর্নেল মহসিনুল হক চৌধুরী
প্রকল্প পরিচালক, চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী