বড় দলগুলোর সঙ্গে টেস্টের দাবি

সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের মাঠের ভেতরে তখন উৎসবের আমেজ। ট্রফি হাতে উল্লাসের পর দুটো পুরস্কারের মোটরবাইকের একটিতে চেপে মাঠের ভেতরে চক্কর দিচ্ছিলেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। সমর্থক, মাঠকর্মী থেকে শুরু করে সবারই আগ্রহ অধিনায়কের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি একটি ফ্রেমে বন্দি করে রাখার। ভিড় সামলাতে সামলাতে হাসিমুখে শান্তকে বলতে হলো, ‘সংবাদ সম্মেলনেও তো যেতে হবে!’

অধিনায়ক হিসেবে ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া শান্তর জন্য নিয়মিত এক আনুষ্ঠানিকতা। তবে অনেক কঠিন ও বৈরী সময়ে যেখানে তাকে একা ঢাল হয়ে প্রশ্নের তীর সামলাতে হয়েছে, বুধবার দিনটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রফিটা সামনে নিয়ে যখন শান্ত বসলেন, তখন তার চোখে-মুখে শুধুই স্বস্তি আর গর্ব। প্রায় ২০ মিনিটের সেই উপভোগ্য ও প্রাণবন্ত সংবাদ সম্মেলনে শান্ত কথা বললেন দলের রূপান্তর, কঠিন মুহূর্তের মানসিকতা এবং ভবিষ্যতের লক্ষ্য নিয়ে।

পঞ্চম দিনে জয়ের জন্য বাংলাদেশের দরকার ছিল ৩ উইকেট, পাকিস্তানের ১২১ রান। প্রথম ঘণ্টায় মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান যেভাবে ব্যাট করছিলেন, তাতে একটা সময় গ্যালারি ও ড্রেসিংরুমে শঙ্কা জেঁকে বসেছিল। সেই রোমাঞ্চকর ও স্নায়ুক্ষয়ী মুহূর্তের অনুভূতি জানিয়ে শান্ত বলেন, ‘শেষ এক ঘণ্টার আবেগটা ব্যাখ্যা করা মুশকিল। কারণ, সত্যিই ওরা ভালো ব্যাটিং করছিল, সত্যি বলতে আমরা একটু চাপে পড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু একটা জিনিস আমি বলব যে, আগের টেস্ট ম্যাচগুলোর থেকে আস্তে আস্তে এখন ওই আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা, প্যানিক (আতঙ্কিত) না করা, এই জিনিসটা একটু ভালো হয়েছে। এখানে বড় দলগুলোর সঙ্গে খেলতে গেলে আমাদের আরেকটু উন্নতি করতে হবে, তবে অধিনায়ক হিসেবে আমি খুশি।’

টানা ১০ দিন দুই টেস্টে যেভাবে পাঁচ দিন ধরে দল লড়েছে, তা নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে শান্ত বলেন, ‘দল হিসেবে খেলতে পেরেছি, এটা একটা বড় উন্নতির জায়গা। প্রতিটা খেলোয়াড় যেভাবে পরিশ্রম করেছে ব্যাটসম্যান-বোলার যারা ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়নি, কোচিং স্টাফে যারা সাহায্য করার জন্য থাকেন সবার অবদান ছিল। অধিনায়ক হিসেবে আমি খুব গর্বিত প্রতিটা খেলোয়াড়ের ওয়ার্ক এথিক দেখে।’

পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা দুই সিরিজে ৪-০ ব্যবধানে জয় (২০২৪ সালে পাকিস্তানে ২-০ এবং এবার দেশের মাটিতে ২-০)। এর আগে বাংলাদেশ কেবল জিম্বাবুয়েকেই টানা চার টেস্টে হারিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠল এটাই কি টেস্টে বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা অর্জন? শান্তর বাস্তবসম্মত উত্তর, ‘এখন পর্যন্ত (এটাই সেরা অর্জন)। কিন্তু সামনে আরও অনেক টেস্ট ম্যাচ বাংলাদেশ খেলবে, ওখানে আরও ভালো ভালো অর্জন হবে এটাই আশা থাকবে। এই চারটা ম্যাচ অনেক স্পেশাল, আমরা অনেক ভালো ক্রিকেট খেলেছি। তবে আমাদের টেস্ট দলটা আস্তে আস্তে তৈরি করতে হবে। আরও অনেক জায়গা আছে উন্নতির। ওই জায়গাগুলো ঠিকঠাক করে যখন আমরা দেশে এবং দেশের বাইরে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলব, তখন আমি বলব যে না, আমাদের দলটা আগের থেকে ভালো অবস্থানে যাচ্ছে।’

টসে হেরেও সবুজ উইকেটে বাংলাদেশ যেভাবে ম্যাচ জিতেছে, তা দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। শান্তর মতে, ‘দুই ম্যাচেই টসে হারার পর ভালো রান দিয়েছে বোর্ডে ব্যাটাররা, যেখানে ব্যাটিংয়ে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথম ম্যাচের ডিক্লারেশন (ইনিংস ঘোষণা) নতুন একটা জিনিস ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটে। এগুলো সামনের দিনে বিশ্বাসটা দেবে যে, যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো সময়ে দলকে আমরা ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে পারি।’

একটা সময় বাংলাদেশ ঘরের মাঠে কেবল স্পিন-নির্ভর উইকেটে খেলত। এবার সিলেটে সম্পূর্ণ পেস-সহায়ক উইকেটে খেলে সাফল্য আসায় উচ্ছ্বসিত শান্ত। তবে স্পিনারদের কৃতিত্বও ছোট করতে চান না তিনি, ‘উইকেট বদলের কারণে পেসারদের নিতে পারছি। পেসাররা নতুন বলে মাঝের ওভারে ভালো করছে, আরেক পাশ থেকে স্পিনাররাও সাহায্য করছে। মিরাজের প্রথম ম্যাচে ফাইফার, আজকে তাইজুল ভাইয়ের ৬ উইকেট আর রান আটকে রাখা খুবই জরুরি ছিল। সামনে অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকাতে টেস্ট খেলব, হয়তো সেখানে চার পেসারও খেলাতে পারি।’

অধিনায়ক আলাদাভাবে প্রশংসা করেছেন দলের লেজের সারির ব্যাটারদের (টেইল-এন্ডার), যা অতীতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল, ‘টেইল-এন্ডারদের ব্যাটিং এই সিরিজে আউটস্ট্যান্ডিং ছিল। এই জায়গায় আমরা আগে অনেক সংগ্রাম করেছি। এই সিরিজে তাসকিন ভাই, তাইজুল ভাই, শরিফুল, ইভেন রানা ২৭ বল খেলেছে। অনেক উন্নতি করেছে তারা।’

প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, তখন ১২৬ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেছিলেন লিটন দাস। শান্তর অকপট স্বীকারোক্তি, ‘এই যে জিতলাম, এখানে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব পাবে লিটনের প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং। কারণ প্রথম ইনিংসে ওভাবে রান করতে না পারলে তখনই আমরা অনেক পেছনে পড়ে যেতাম। ওটা ওর অন্যতম সেরা সেঞ্চুরি।’

মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মুশফিক, লিটন, মুমিনুল ও মিরাজদের মতো সিনিয়রদের কাছ থেকে পাওয়া সমর্থনের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন টাইগার অধিনায়ক, ‘আমি খুবই লাকি যে মুশফিক ভাই মাঠে আছে। লিটন, মিরাজ, মুমিনুলরাও আছে। কঠিন সময়ে মাঠে আলাপ করতে পছন্দ করি, তারা নিজে থেকে এসে ফিডব্যাক দেয়। এই ১৫-২০ জন সবাই দলের জন্য যেটা ভালো, সেভাবেই সিদ্ধান্ত দেওয়ার চেষ্টা করে।’

ভবিষ্যতে টেস্ট দলের সত্যিকারের উন্নতির জন্য আইসিসি এবং বড় দলগুলোর বিপক্ষে নিয়মিত খেলার ওপর জোর দিয়েছেন শান্ত। তিনি বলেন, ‘আমরা টেস্ট ম্যাচ খেলতে চাই আসলে, প্রত্যেকটা দলের সঙ্গেই খেলতে চাই। অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ড তাদের সঙ্গেও খেলতে চাই হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে। কারণ যত বেশি ম্যাচ খেলব, নতুন অভিজ্ঞতা যখন হবে তখন দল আসলে বানানো যাবে। একই কন্ডিশনে বারবার একই প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেললে দল বানানো কঠিন হবে। আশা করি, আইসিসি আমাদের আরও ম্যাচ দেবে।’

সংবাদ সম্মেলন শেষে ট্রফিটা বুকে জড়িয়ে যখন শান্ত বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল অধিনায়কে চোখেমুখে ছিল ভবিষ্যতের এক নতুন ও শক্তিশালী বাংলাদেশ টেস্ট দলের স্বপ্ন। সিলেট টেস্টটা অধিনায়ক হিসেবে শান্তর অষ্টম জয়। মুশফিকুর রহিমের রেকর্ড ভাঙলেন নাজমুল। ২০১১ থেকে ২০১৭ এ সময়ের মধ্যে ৩৪ টেস্টে অধিনায়কত্ব করে ৭ ম্যাচ জিতেছিলেন অধিনায়ক মুশফিক। শান্ত ২০২৩ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অধিনায়ক হিসেবে এ সংস্করণে ১৮ ম্যাচে ৮ জয় পেয়েছেন।