বাঙালি সংস্কৃতির পুরনো একটি প্রবাদ আছে ‘কারও ঘর পোড়ে, কেউ আলু পোড়া খায়।’ রাজনৈতিক সমাজে প্রবাদটি শুধু রসিকতা নয়, বরং ক্ষমতার নির্মম বাস্তবতা। যখন রাষ্ট্রে সংকট তৈরি হয়, যখন মানুষ রাস্তায় নামে ন্যায়বিচার, অধিকার কিংবা বৈষম্যের বিরুদ্ধে, তখন একদল মানুষ আগুন নেভাতে ছুটে যায়। আরেক দল নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকে লবণ হাতে। তারা অপেক্ষা করে, কখন আগুন যথেষ্ট বড় হবে, কখন পোড়া আলুর ভাগ মিলবে। দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক তরুণ বিদ্রোহগুলোকে দেখলে, এই চিত্র বারবার ফিরে আসে। বাংলদেশের ছাত্র আন্দোলন, শ্রীলঙ্কার গণঅভ্যুত্থান, পাকিস্তানের বিক্ষোভ, নেপালের তরুণ প্রতিবাদ কিংবা ভারতের নাগরিক আন্দোলন সবখানে তরুণরা ন্যায্যতার প্রশ্ন তুলেছে। তারা পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে অস্বীকার করেছে, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং এমন এক সমাজের কথা বলেছে যেখানে রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতাবানদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও কাজ করবে। কিন্তু ইতিহাসের মতো এখানেও প্রশ্ন রয়ে গেছে, এই বিদ্রোহের ফসল শেষ পর্যন্ত কার হাতে যায়? ১৭৫ বছর আগে মার্কস ও এঙ্গেলস লিখেছিলেন ‘ইউরোপকে তাড়া করছে এক ভূত।’ আজ মনে হয়, এশিয়াকে তাড়া করছে আরেক ভূত, ডিজিটাল তারুণ্যের ভূত। এই ভূত দেয়ালে পোস্টার সাঁটে না; এটি হ্যাশট্যাগ ছুড়ে দেয়। এটি লিফলেট বিলি করে না; বরং মিম, রিলস আর ভিডিওর মাধ্যমে ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
এই প্রজন্মের হাতে স্মার্টফোন কেবল বিনোদনের যন্ত্র নয়, বরং রাজনৈতিক অস্ত্র। ফেসবুক, টিকটক, এক্স বা ইউটিউব এখন শুধু সামাজিক যোগাযোগের জায়গা নয়; এগুলো নতুন জনপরিসর, যেখানে প্রতিবাদ সংগঠিত হয়, মত গড়ে ওঠে এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়। ম্যানুয়েল কাস্টেলস এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন ‘নেটওয়ার্কড পাবলিক স্ফিয়ার’ ধারণার মাধ্যমে। তার মতে, আধুনিক সমাজে যোগাযোগ একমুখী নয়; এটি অনুভূমিক। নাগরিক থেকে নাগরিকে ছড়িয়ে পড়ে তথ্য, অভিজ্ঞতা ও প্রতিরোধ। দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ আন্দোলনগুলো ঠিক এই ছাঁচে গড়ে উঠেছে যেখানে একটি পোস্ট, মিম বা লাইভ ভিডিও মুহূর্তে হাজারো মানুষের রাজনৈতিক ভাষা হয়ে ওঠে। শ্রীলঙ্কার ‘গো হোম রাজাপাকসে’ আন্দোলনের সময়, বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ‘ওয়ানডে ইন গণভবন’ সেøাগান ছিল এই আন্তঃদেশীয় ডিজিটাল প্রতিধ্বনির প্রতীক। পরে সেই প্রতিধ্বনি বাংলাদেশের রাজপথে বাস্তব হয়ে ওঠে। একইভাবে নেপালের ‘নেপোকিডস’ বিতর্ক কিংবা ভারতের ArjikorMovement দেখিয়েছে, তরুণদের ক্ষোভ আর জাতীয় সীমানায় আটকে নেই; এটি সংযুক্ত, দ্রুত সংক্রমিত এবং ডিজিটালভাবে বহুগুণে বিস্তার লাভ করতে সক্ষম। পিউ রিসার্চ সেন্টার এই প্রজন্মকে বলেছে ‘ডিজিটাল নেটিভস’। তারা প্রযুক্তির সঙ্গে বেড়ে উঠেছে এবং প্রযুক্তিকেই রাজনৈতিক ভাষায় রূপান্তর করেছে। এই প্রজন্ম লিঙ্গ, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক। অথচ তারা এমন রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাস করছে, যেখানে অর্থনীতি ক্রমশ করপোরেট ও রাজনৈতিক অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
তাদের আন্দোলন শুধু কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়; বরং বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তবে এখানেই সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। এই আন্দোলনগুলো প্রায়ই নেতৃত্বহীন, বিকেন্দ্রীভূত এবং আবেগনির্ভর। কাস্টেলস যাকে ‘শক্তি’ বলেছেন, সেটিই আবার তাদের ‘দুর্বলতা’। কারণ সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কাঠামো না থাকলে, বিদ্রোহের শক্তি খুব সহজে পুরনো ক্ষমতার খেলায় ব্যবহৃত হতে পারে। ইতিহাস অবশ্য তরুণদের জন্য খুব আশাবাদী গল্প বলে না। বহু বড় আন্দোলন শেষ পর্যন্ত পুরনো শক্তির হাতেই বন্দি হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। ফরাসি বিপ্লব ‘স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব’-এর স্বপ্ন নিয়ে শুরু হলেও, শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়নের সামরিক কর্র্তৃত্ববাদের ভিত গড়ে দেয়। রুশ বিপ্লব শ্রমিক ও কৃষকের মুক্তির কথা বললেও, অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি একদলীয় রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রে রূপ নেয়। আরব বসন্তের সময় মিসরের তরুণেরা তাহরির স্কয়ারে দাঁড়িয়ে যে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিল, কয়েক বছরের মধ্যেই সেই স্বপ্ন সামরিক শাসনের কঠোর বাস্তবতায় ফিরে যায়। হোসনি মুবারকের পতনের পর জনগণ ভেবেছিল পুরনো বন্দোবস্ত ভেঙে গেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা আবারও সামরিক প্রতিষ্ঠানের কাছেই ফিরে যায়। ২০১১ সালের ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন বৈষম্য ও করপোরেট পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করেছিল। ‘উই আর দ্য ৯৯ পার্সেন্ট’ সেøাগান তরুণদের মধ্যে এক বৈশ্বিক সংহতি তৈরি করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষোভকে পদ্ধতিগত রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দেওয়া যায়নি; বরং করপোরেট পুঁজিবাদ আরও শক্তিশালী হয়েছে। হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থি তরুণ আন্দোলনও একই পরিণতির উদাহরণ। ডিজিটাল সংগঠন, বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব এবং তরুণদের সৃজনশীল প্রতিরোধ বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নজরদারি, দমননীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত সেই আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এমনকি ১৯৬৮ সালের প্যারিস ছাত্র বিদ্রোহ, যা একসময় পুরো ইউরোপের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কল্পনাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল শেষ পর্যন্ত ফরাসি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভাঙতে পারেনি। বরং বিদ্রোহের ভাষা, ফ্যাশন ও সংস্কৃতিকে পরে বাজার অর্থনীতি পণ্য হিসেবে ব্যবহার করেছে। এই উদাহরণগুলো দেখায়, বিদ্রোহের শক্তি যত বড় হোক, যদি সেটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক রূপান্তরে পৌঁছাতে না পারে, তবে পুরনো শক্তি দ্রুত নতুন মুখোশ পরে ফিরে আসে। তখন তরুণদের স্বপ্ন, রক্ত ও প্রতিরোধই হয়ে ওঠে অন্য কারও ক্ষমতায় ফেরার সিঁড়ি। সেই কারণে দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল বিদ্রোহগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি কেবল ‘কীভাবে সরকার বদলাবে’ তা নয়; বরং ‘কীভাবে পুরনো ক্ষমতার ছক ভাঙা যাবে।’ নইলে প্রতিবারের মতো আগুন জ্বালাবে তরুণরা, আর পোড়া আলু খাবে অন্য কেউ।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে বারবার দেখেছি, তরুণরা রাস্তায় নামে পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার দরজায় বসে পুরনো খেলোয়াড়রা লাভের হিসাব কষে। যারা আন্দোলনের সময় সামনে থাকে না, তারাই পরে নতুন বন্দোবস্তের মালিক বনে যায়। আলুর গুদামে আগুন লাগলে, সাধারণ মানুষ পানি নিয়ে দৌড়ায়; আর সুবিধাবাদীরা অপেক্ষা করে কখন পোড়া আলুতে লবণ মাখানো যাবে। আজকের ডিজিটাল আন্দোলনগুলোর ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ রাষ্ট্র, করপোরেট শক্তি, এমনকি উগ্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো জানে, ডিজিটাল ক্ষোভকে কীভাবে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। ট্রল আর্মি, ফেক নিউজ, অ্যালগরিদমিক প্রোপাগান্ডা কিংবা ‘ভাইরাল ন্যারেটিভ’ সবই এখন রাজনৈতিক ক্ষমতার নতুন অস্ত্র। ফলে তরুণদের বিদ্রোহ এক জটিল বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে তারা নতুন রাজনৈতিক ভাষা সৃষ্টি করছে মিম, ব্যঙ্গ, হ্যাশট্যাগ ও ডিজিটাল সংহতির ভাষা অন্যদিকে সেই ভাষাকে পুরনো শক্তিগুলো নিজের ছকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তবু এই প্রজন্মকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ তারা অন্তত এই সত্যটি স্পষ্ট করেছে যে, রাজনীতি আর শুধু সংসদে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতি এখন কমেন্ট সেকশনে হয়, রিলসে হয়, স্টোরিতে হয়। প্রতিবাদ এখন শুধু মিছিলে নয়; এটি ডিজিটাল সংযোগের মধ্যেও জন্ম নেয়। এশিয়ার এই তরুণরা হয়তো এখনো পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করতে পারেনি, কিন্তু তারা পুরনো ব্যবস্থার নৈতিক দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করেছে। তারা দেখিয়েছে, মানুষ আর আগের মতো নীরব দর্শক হয়ে থাকতে চায় না। কিন্তু শেষ প্রশ্ন থেকেই যায়। এই বিদ্রোহ কি সত্যিই নতুন সমাজ নির্মাণ করবে? নাকি প্রতিবারের মতোই তরুণদের রক্ত, ক্ষোভ ও স্বপ্নকে ব্যবহার করে আবারও পুরনো শক্তিরাই পোড়া আলু খাবে লবণ হাতে?
সমাধান সম্ভবত শুধু বিদ্রোহে নয়, বরং বিদ্রোহের পরে কী ধরনের রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠবে, সেই প্রস্তুতিতে। ইতিহাস দেখিয়েছে, কেবল ক্ষোভ ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাতে পারে, কিন্তু টেকসই ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে না। তরুণদের আন্দোলন যদি শুধুই ‘সরাও’ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেই শূন্যস্থান খুব দ্রুত পুরনো শক্তি, করপোরেট স্বার্থ বা নতুন মুখের পুরনো রাজনীতিবিদরা দখল করে নেয়। তাই ডিজিটাল আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক সংস্কৃতি, বিকল্প নীতি-ভাবনা, স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। অন্যথায় আন্দোলন থাকবে তরুণদের, কিন্তু বন্দোবস্ত লিখবে পুরনোরা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তরুণদের নিজেদেরও ‘নেতৃত্বহীনতার রোমান্টিসিজম’ থেকে বের হতে হবে। বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্ক আন্দোলনের শক্তি হতে পারে, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ছাড়া সেটি সহজেই বিভ্রান্ত, বিভক্ত বা হাইজ্যাকড হয়ে পড়ে। ফলে প্রয়োজন এমন নতুন নেতৃত্ব, যারা ব্যক্তিপূজার রাজনীতি করবে না, আবার সম্পূর্ণ শূন্যতাও তৈরি করবে না। অর্থাৎ, ভবিষ্যতের লড়াই শুধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়; বরং এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরির লড়াই, যেখানে বিদ্রোহের শক্তি আর কখনো ‘লবণ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা’ সুবিধাবাদীদের পাতে গিয়ে না পড়ে। ‘হীরক রাজা দেশে’ সিনেমায় সত্যজিৎ রায় আমাদের দেখান অত্যাচারী শাসকের পতন। সিনেমার শেষ দৃশ্যে দেখি, রাজা সমূলে উৎপাটন হয়। কিন্তু সেই পতনের পর রাষ্ট্র কে চালায়, সিনেমা সেখানে থেমে যায়। রাজার মূর্তি ভাঙার যে আবেগময় ক্লাইম্যাক্স তৈরি হয়, তার পরে ক্ষমতার শূন্যতা কীভাবে পূরণ হয়, তা আর দেখানো হয় না। উদয়ন পণ্ডিতের মতো জ্ঞানী শিক্ষক, নিশ্চয়ই পরদিন কোনো ‘সংস্কার কমিশন’-এর চেয়ারম্যান হয়ে বসেন না, কিংবা রাজদরবারের পুরনো আমলারা রাতারাতি গণতন্ত্রী হয়ে ওঠেন না। বাস্তবতা অনেক বেশি নির্মম। কারণ ইতিহাস বলে, স্বৈরাচারের পতনের চেয়ে কঠিন কাজ হলো পতনের পর ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। ‘আমরা সবাই রাজা’ বলে কোরাস গাওয়া যায়, তাতে হাততালি মেলে, ভাইরাল সেøাগান তৈরি হয়; কিন্তু সমাজ কেবল সেøাগানে চলে না। রাষ্ট্র চালাতে লাগে প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, জবাবদিহি ও নৈতিক নেতৃত্ব। সেগুলো না থাকলে বিপ্লবের মঞ্চ খালি হওয়ার আগেই সেখানে ঢুকে পড়ে নতুন মুখের পুরনো সুবিধাবাদীরা। তখন দেখা যায় আগুন জ্বালিয়েছে তরুণরা, আর পোড়া আলু খাচ্ছে আবারও সেই লবণ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
rajibnandy@cu.ac.bd