রামিসার জন্য রাজপথে

রাজধানীর পল্লবীর ৭ নম্বর সড়কের ৩৭ নম্বর বাড়ি। বাসার কলাপসিবল গেটে ঝুলছে একটি ব্যানার। তাতে স্কুল ড্রেস পরা ফুটফুটে রামিসার মিষ্টি হাসির ছবি। পাশে লেখা ‘রামিসা হত্যার বিচার চাই। হত্যাকারীর জনসম্মুখে ফাঁসি চাই।’ সেই ব্যানারে হাত বুলিয়ে কাঁদছিলেন প্রতিবেশী নারীরা। আপসোস করে বলছিলেন, জীবন্ত বাচ্চাটা আজ ছবি হয়ে গেল। ওর দুষ্টুমি, চঞ্চলতা চোখের সামনে ভাসছে। যে হাসি সবে ফুটছিল, তা আর বিকশিত হতে পারল না। ঘাতকের ছুরিকাঘাতে ছোট্ট জীবনটা ঝরে গেছে কুঁড়িতেই। শুক্রবার দুপুরে রামিসার বাসার সামনে  এভাবে আক্ষেপ করছিলেন প্রতিবেশীরা।

শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত¡না দিতে গতকালও বাসায় ছুটে যান রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয়রা। তাদের ধরে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন রামিসার বাবা। মেয়ে হত্যার বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দেওয়া বাবা জানালেন, প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পর বিচার পাওয়ার আশার কথা।

সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও রামিসার বাসার সামনে মানুষের ঢল কমেনি। জুমার নামাজের পর সেখানে জড়ো হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা অংশ নেন বিক্ষোভে। স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। যেন শোক আর ক্ষোভের এক প্রতিবাদমঞ্চে পরিণত হয়েছে সড়কটি।

এ ছাড়া রামিসার ধর্ষণ-হত্যার বিচার চেয়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে সারা দেশে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে বিচার চেয়েছে কয়েকটি সংগঠন। গুলশান-২ নম্বরে মানববন্ধন করেছে গুলশান সোসাইটি। শাহবাগ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসিতেও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন সংগঠন। মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বরে দুপুর থেকে অবস্থান নেয় বিক্ষুব্ধ মানুষ। বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে রাখা হয়। এতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। কয়েকটি জেলায়ও বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করে বিচার চেয়েছেন স্থানীয়রা এবং বিভিন্ন সংগঠন। এদিকে আসামিপক্ষকে আইনি সেবা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্যরা।

গত মঙ্গলবার সকালে পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে সাত বছরের রামিসার খ-িত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। রামিসা ছিল পল্লবীর পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোহেল রানা আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই রামিসার বাসার সামনে জড়ো হন স্থানীয়রা। ব্যানার হাতে বিক্ষোভ করে বিভিন্ন সংগঠন। ১০টার পর রামিসার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এমপি, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি নিপুণ রায় চৌধুরীসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাদের পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। তাকে সান্ত¡না দিয়ে সেলিমা রহমান বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। হত্যাকারীদের শাস্তির পাশাপাশি মেয়েদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

রামিসার বাবা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাকে কথা দিয়েছেন। আমি শতভাগ বিশ্বাস করি রামিসাসহ দেশে যত মেয়ে এভাবে হত্যার শিকার হয়েছে, সব ঘটনার বিচার করবেন। এটাই প্রত্যাশা। কথাগুলো বলে চোখ মুছতে মুছতে বাসা থেকে নিচে নামেন তিনি। এরপর স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে মেয়ের কুলখানিতে অংশ নিতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন।

দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয় কুলখানিতে। কয়েকদিন পরই বাবা-মা ও বোনের সঙ্গে ঈদুল আজহা উদযাপনের জন্য বাড়ি ফেরার কথা ছিল রামিসার। কিন্তু আর ফেরা হবে না তার। যে শিশুটি ঈদের আনন্দে মেতে ওঠার কথা, সেই রামিসাকে ঘিরেই এখন চলছে স্বজনদের কান্না আর বিচারের দাবিতে আকুতি। তাদের সঙ্গে কাঁদছে সারা দেশের সংবেদনশীল মানুষও।

বাসার সামনে তখনো চলছিল বিক্ষোভ। ‘রামিসা হত্যার বিচার চাই; আমার বোন কবরে, খুনি কেন বাহিরে’। শত শত মানুষের এমন সেøাগানে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সুইটি মাজেদা। তিনি বলেন, ‘রামিসার ঘটনার ছবি দেইখা আমার স্বামী আমাকে বলেছে, ঘরের বাইরে যেন আমি কাজে না যাই। সবসময় বাসায় বাচ্চার সঙ্গেই যেন থাকি। কতটা ভয় পেলে একজন এ কথা বলতে পারে। কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়াটা কি অপরাধ?’

রামিসার বাসার সামনে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী তাবাসসুম বলেন, ‘বাসা থেকে বের হলে বাবা-মা টেনশন করেন। বলেছেন সেফটির জন্য ব্যাগে ছুরি-কাঁচি নিতে। বছরের পর বছর নারী-শিশু ধর্ষণের ঘটনা দেখেই আসছি। কিন্তু সুষ্ঠু বিচার দেখিনি। রামিসার বাসার সামনে উপস্থিত হয়ে গতকাল প্রতিবাদ জানায় ৮-১০ বছরের শিশুরাও। তারাও রামিসা হত্যার বিচার দাবিতে সেøাগান দেয়।

রামিসার চাচা মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, রামিসার মা ক্ষণে ক্ষণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে, তাও কান্না থামছে না। খাওয়া-দাওয়া করছেন না। কষ্ট করে সামান্য পানি মুখে তুলে দেওয়া হচ্ছে। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, রামিসার খেলনাগুলো পড়ে আছে আগের জায়গায়। মেয়ের জন্য দুই দিন আগে কিনে আনা বোরকা নিয়ে ওর বাবা শুধু কাঁদছেন।

রামিসা হত্যার বিচার দাবিতে দুপুর ১২টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা। তারা ‘অপরাধীর আস্তানা ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘রামিসার হত্যাকারীর ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই’, ‘আমার বোন মরলো কেন জবাব চাই, জবাব চাই’ প্রভৃতি সেøাগান দেন। বিকেলে তাদের সঙ্গে যোগ দেন রামিসার বাসার সামনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী ও স্থানীয়রা। বিক্ষুব্ধ জনতা টিনের বেড়া এনে সড়ক অবরোধ করে রাখেন। মিছিল করতে করতে আইনের প্রতি তারা জুতা দেখান। বিক্ষোভ চলতে থাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এতে গুরুত্বপূর্ণ ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দেখা দেয় তীব্র যানজটের। যা আশপাশের অলিগলিতেও ছড়িয়ে পড়ে। পরে সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য উপস্থিত হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতাকে ধাওয়া দেয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। তবে ৬ ঘণ্টা পর পরিস্থিতি শান্ত হয়।

সন্ধ্যা ৭টার দিকে মিরপুর মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, টিনের বেড়া সরিয়ে সড়ক স্বাভাবিক করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর বিক্ষোভকারীরা চলে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

রামিসা ধর্ষণ-হত্যার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠন কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ডা. মাখদুমা নার্গিস রতœা বলেন, কন্যাশিশুরা যেমন নানা পাশবিকতার শিকার হচ্ছে, তেমনি মাদ্রাসায় ছেলে শিশুরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এমন পাশবিকতা মেনে নেওয়া যায় না। তাদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসার পাশাপাশি সমাজ বিপ্লব ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিকল্প নেই। 

ধর্ষণ ও হত্যারকারীর দ্রুত বিচার দাবি করে প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স) বলেন, যেসব অঞ্চলে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটবে, সেসব অঞ্চলের পুলিশ-প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা দিতে না পারার কারণে তাদেরও আইনের সম্মুখীন হতে হবে। একই স্থানে পৃথক কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থা। রামিসা হত্যাকান্ডের বিচার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে ইসলামী ছাত্রীর সংস্থার মহানগর দক্ষিণের সভানেত্রী মারুফা তাবাসসুম বলেন, শরিয়া আইন অনুযায়ী বিচার করলেই জাতি সুবিচার পাবে।

গুলশান-২ নম্বরে ‘গুলশান সোসাইটি’ ব্যানারে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। মানববন্ধনে সোসাইটির সদস্য নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ খুব দরকার। মা-বাবারা আজ আস্থাহীনতায় ভুগছেন। আমার বাচ্চাকে এখন কোথাও একা পাঠাতে ভয় হয়। আমাদের এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, আমাদের আশপাশটা নিরাপদ।

শাহবাগ জাদুঘরের সামনে বিকেলে অবস্থান ও মানববন্ধন করেছে মঞ্চ ২৪ নামের একটি সংগঠন। এ ছাড়া টিএসসিতে ঢাবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি সামাজিক সংগঠন মানববন্ধন করেছে। এসব কর্মসূচি থেকে রামিসা হত্যার বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করে ধর্ষণ প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে রামিসার মতো অতীতেও যারা ধর্ষণ-হত্যার শিকার হয়েছে, সেসব ঘটনায় অভিযুক্তদেরও বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলেছেন নেতারা।

ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, খুনি সোহেল রানা আগেও নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ে লিপ্ত ছিল। মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালতে জমা দেওয়া হবে। এর আগে ডিএনএ টেস্ট করা হবে। রবিবারের দিকে চার্জশিট দাখিল করা যাবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে বিচারকার্য নিষ্পন্ন হয় এবং অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে চেষ্টা থাকবে।

এদিকে আসামিপক্ষকে আইনি সেবা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্যরা। সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কালাম খান বলেন, কার্যনির্বাহী কমিটি জুম মিটিং শেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, রামিসা হত্যা মামলায় আসামিপক্ষে সমিতির কোনো সদস্য অংশ নেবে না।

শুধু রাজপথেই নয়; সামাজিক মাধ্যমে ফেসবুক, এক্স ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে হাজারো মানুষ রামিসা হত্যাকান্ড নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই লিখছেন, একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটলেও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা ভয় পাচ্ছে না।

কালশীতে সড়ক অবরোধ, যান চলাচল বন্ধ : সন্ধ্যার পর মিরপুরের কালশী রোডের ফুলকলি ও আধুনিকের মোড় এলাকার সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন স্থানীয়রা। বিক্ষোভকারীরা ‘জাস্টিস ফর রামিসা’, ‘ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই, রামিসার খুনির ফাঁসি চাই’, ‘আমার বোন খুন হলো কেন হত্যাকারীর বিচার চাই’, অপরাধীর আস্তানা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ প্রভৃতি সেøাগানে পুরো এলাকা মুখরিত করে তোলেন। এ সময় নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। সেখানে নামাজ পড়তেও দেখা যায় কয়েকজনকে। অবরোধের ফলে ওখানকার সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (রাত ১০টা) বিক্ষুব্ধ জনতা সড়কে অবস্থান করছেন।