কোরবানির ইতিহাস তাৎপর্যপূর্ণ। ইবরাহিম (আ.)-এর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর নির্দেশে কোরবানি দিতে উদ্যত হওয়া ও তাদের উভয়ের সর্বোচ্চ আত্মসমর্পণ এই ইবাদতের সূচনাপর্বকে মহান করে তুলেছে। আল্লাহর নৈকট্য লাভে এ ইবাদতের গুরুত্ব এতটাই যে, কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার পরও যদি কেউ তা না করে, তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে ঈদগাহমুখী হতে নিষেধ করেছেন, এমন হাদিস দ্বারা এর গুরুত্ব সুস্পষ্ট হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি কার ওপর ওয়াজিব এবং কাদের জন্য এটি করা আবশ্যক, সে বিষয়ে অনেক মুসলমান এখনো সঠিকভাবে অবগত নন। বিশেষত নারীদের কারও কারও কাছে অলংকার বা সঞ্চিত অর্থ থাকার পরও কোরবানি ওয়াজিব হওয়া সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকেন। ফলে সচেতনতার অভাবে একটি জরুরি ইবাদত থেকে তারা বঞ্চিত হন। অনেক সময় পুরুষের আর্থিক দায়িত্বেই কোরবানি সীমাবদ্ধ রেখে নারীদের সম্পদকে বিবেচনায় আনা হয় না, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
এ বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্রয়োজন কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শরয়ি মানদণ্ড সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি। নেসাব, মালিকানা, সময়সীমা ও প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদের সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা বুঝতে পারলেই কোরবানির বিষয়ে একজন মুমিনের অবস্থান স্পষ্ট হবে। এখানে কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার বিষয়টি সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো, যাতে প্রত্যেক মুসলমান নিজের অবস্থান নিরূপণ করে যথাযথ ইবাদত পালন করতে পারেন।
সামর্থ্যবান প্রত্যেক নর-নারীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব। শরিয়তের ভাষায় সামর্থ্যবান বলা হয়, যার নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে। নিম্নে নিসাব ও তার ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো। পবিত্র কোরআন ও হাদিস দ্বারা কোরবানি ওয়াজিব হওয়া প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার রবের জন্য নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ (সুরা কাউসার ২)
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)
ওয়াজিব হওয়ার শর্ত : সহজ করে বললে, যার ওপর জাকাত ওয়াজিব, তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন স্বাধীন মুসলিম নর-নারীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব। যদি সে ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়। (আদ দুররুল মুখতার ৫/২১৯)
নেসাবের পরিচয় : যার কাছে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি রুপা আছে তিনিই নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক। একইভাবে যার কাছে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ বা এমন প্রয়োজনাতিরিক্ত জিনিস থাকে, যার মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ বা বেশি হয় সে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক। কারও কাছে যদি এই পরিমাণ স্বর্ণ, রৌপ্য বা টাকা-পয়সা না থাকে যেগুলো কোনো একটি পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ হয়, কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।
যেমন কারও কাছে কোরবানির দিনগুলোতে অল্প (এক ভরির কম) স্বর্ণ ও এক হাজার টাকা আছে, যার কোনো একটিও পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ নয়। কিন্তু সামান্য স্বর্ণের মূল্য ও এক হাজার টাকা একত্র করলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের বেশি হয়ে যায়। তাই তিনি নেসাবের মালিক বলে গণ্য হবেন এবং তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
নারীদের জন্য সতর্কতা : সমাজের বহু নারীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার পরও তারা অজ্ঞতা বা অসতর্কতার কারণে কোরবানি দেন না। স্বর্ণ ও রুপার অলংকার, অথবা কিছু অলংকার ও কিছু নগদ অর্থ থাকার কারণে তাদের অনেকের ওপরই কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যায়। তাই এই বিষয়ে তাদের জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার