কোরবানি আর্থিক ইবাদত। প্রতিবছর জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট সময়ে সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে কোরবানি করেন। ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য উপার্জন হালাল হওয়া অপরিহার্য। বর্তমানে হালাল ও হারামের মিশ্রণের এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সুদ-ঘুষ বা অন্যান্য হারাম উপায়ে উপার্জিত অর্থ এখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এই প্রেক্ষিতে, হারাম সম্পদ দ্বারা কোরবানি করার বিধান কী, এর ফলে অন্যান্য শরিকদের কোরবানির ওপর কী প্রভাব পড়ে এবং এই বিষয়ে একজন মুসলিমের করণীয় কী? তা জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
কোরবানির কারণ : কোরবানি মূলত মহান আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা এবং তার সীমাহীন আনুগত্যের এক ঐতিহাসিক স্মারক। কোরবানির মৌলিক কারণগুলো উল্লেখ করা হলে।
ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত : ইবরাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.) আল্লাহর আদেশে যে অভূতপূর্ব ত্যাগের নজির পেশ করেছিলেন, কোরবানি মূলত তারই ধারাবাহিকতা ও স্মারক।
আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষা : নিজের প্রিয় সম্পদ ও অর্থ ব্যয় করে আল্লাহর নামে পশু জবাই করার মাধ্যমে বান্দা প্রমাণ করে, তার কাছে নিজের মালের চেয়ে আল্লাহর হুকুমের মূল্য অনেক বেশি।
গরিব-দুঃখীদের প্রতি সহানুভূতি : কোরবানির মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র ও অভাবী মানুষের মাঝে গোশত বণ্টন করা হয়, যা সমাজে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি করে।
হারাম সম্পদ দিয়ে কোরবানির বিধান : ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কোরবানি কবুল হওয়ার জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, কোরবানি সম্পূর্ণ হালাল সম্পদ দ্বারা হতে হবে। সুদ-ঘুষ বা অন্যান্য হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে কোরবানি করা কোনোভাবেই জায়েজ নয়।
যদি কোনো ব্যক্তির কাছে শুধুই হারাম সম্পদ থাকে, তাহলে সেই মালের ওপর কোরবানি ও জাকাত কোনোটাই ওয়াজিব হয় না। কারণ, হারাম সম্পদের ওপর দখলদারের মালিকানাই সাব্যস্ত হয় না। ফতোয়ায়ে শামিতে উল্লেখ আছে, ‘হারাম সম্পদ যদি নিসাব পরিমাণও হয়, তবুও তার ওপর জাকাত ওয়াজিব হবে না। কারণ, সম্পূর্ণ সম্পদই ওই ব্যক্তির ওপর সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব।’ (ফতোয়ায়ে শামি ২/২৯১)
অতএব, যার পুরো সম্পদই হারাম, তার ওপর কোরবানি করার কোনো বিধান নেই। তবুও যদি সে এই টাকা দিয়ে কোরবানি করে, তাহলে তার কোরবানি শুদ্ধ হবে না এবং আল্লাহর দরবারে ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে না।
হালাল-হারাম সম্পদের মিশ্রণ থাকলে করণীয় : যদি হালাল সম্পদের সাথে হারাম সম্পদ মিশ্রিত হয়ে যায়, তাহলে সেই মিশ্রিত সম্পদ থেকে হারাম মালের সমপরিমাণ অংশ আলাদা করে দিতে হবে। এরপর অবশিষ্ট হালাল মালের পরিমাণ যদি নিসাব পরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি হয়, তবে তার ওপর জাকাত ও কোরবানি ওয়াজিব হবে। আর যদি হারাম অংশ আলাদা করার পর অবশিষ্ট হালাল মাল নিসাব পরিমাণের চেয়ে কম হয়, তবে তার ওপর জাকাত ও কোরবানি ওয়াজিব হবে না।
সম্পদের হারাম অংশটি যদি মূল মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে অবশ্যই তা ফিরিয়ে দেবে। অন্যথায় সওয়াবের নিয়ত ছাড়া তা সদকা করে দেবে। অর্থাৎ নিজের পক্ষ থেকে সওয়াবের আশা না করে, উক্ত সম্পদের যিনি প্রকৃত হকদার বা মালিক, তার পক্ষ থেকে সওয়াবের নিয়ত করবে।
ভাগে কোরবানি : ভাগে কোরবানি করার সময় শরিকদের আয়ের উৎস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি বড় পশুতে (যেমন গরু, মহিষ, উট) একাধিক ব্যক্তি শরিক হয় এবং তাদের মধ্যে কোনো একজনের সম্পূর্ণ টাকা বা অধিকাংশ টাকা হারাম হয়, তাহলে তার সাথে কোরবানি করা জায়েজ হবে না। এরকম ব্যক্তির সাথে কোরবানিতে শরিক হলে উক্ত পশুতে শরিক সবার কোরবানি বাতিল হয়ে যাবে। (খুলাসাতুল ফাতওয়া ৪১৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, অবশ্যই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র (মালই) কবুল করে থাকেন। আল্লাহ মুমিনদেরকে সেই আদেশ করেছেন, যে আদেশ করেছেন নবি-রাসুলদের। তিনি তাদেরকে উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘হে রাসুলগণ, তোমরা পবিত্র ও ভালো বস্তু থেকে খাও এবং সৎকর্ম করো। নিশ্চয় তোমরা যা করো সে সর্ম্পকে আমি সম্যক জ্ঞাত। (সুরা মুমিনুন ৫১)
অতঃপর রাসুল (সা.) সেই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে লম্বা সফর করে ধূলিমলিন বেশে নিজ হাত দুটিকে আকাশের দিকে লম্বা করে তুলে দোয়া করে, ‘হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রভু!’ কিন্তু তার আহার্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পরিধেয় লেবাস হারাম এবং হারাম দ্বারাই সে নিজেকে গড়ে তুলেছে। অতএব তার দোয়া কিভাবে কবুল হতে পারে? (সহিহ মুসলিম)
সুদ ও হারামের সাথে জড়িত থাকা মহান আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না করো তাহলে আল্লাহ ও তার রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও। আর যদি তোমরা তওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের জুলুম করা হবে না।’ (সুরা বাকারা ২৭৮-২৭৯)
অতএব, হারাম মাল দ্বারা কোরবানি, সদকা বা কোনো ইবাদত মহান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না, বরং তা আখেরাতে ভয়াবহ ক্ষতি ও শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একজন মুমিন হিসেবে আমাদের জীবন ও ইবাদত পরিশুদ্ধ করার জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা আবশ্যক।
আত্মপর্যালোচনা ও হিসাব-নিকাশ : কোরবানির দিন আসার আগেই নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ব্যবসা এবং আয়ের উৎসগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। নিজের উপার্জনে সুদের লভ্যাংশ বা কোনো অন্যায্য টাকা ঢুকে আছে কি না, তা সতর্কতার সাথে আলাদা করতে হবে।
হারাম সম্পদ ত্যাগের পদ্ধতি : যদি কারো কাছে কোনো হারাম সম্পদ থাকে, তবে সেটার বিধান হলো, যদি তার আসল মালিক বা ওয়ারিশদের সন্ধান জানা থাকে, তাহলে তাদের কাছে তা ফিরিয়ে দেওয়া অপরিহার্য। আর যদি মালিকের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব হয়, তাহলে সওয়াবের নিয়ত ছাড়াই সম্পূর্ণ টাকা কোনো গরিব বা জাকাতের উপযুক্ত ব্যক্তিকে সদকা করে দিতে হবে। হারাম টাকা নিজের ভোগে বা কোরবানির মতো ইবাদতে ব্যবহার করা যাবে না।
আমাদের যদি সামর্থ্য কমও থাকে, তবুও কষ্টের উপার্জিত অল্প হালাল টাকা দিয়ে ছোট একটি পশু বা ছাগল কোরবানি করা হাজার গুণ উত্তম, কোটি টাকার হারাম মালের জাঁকজমকপূর্ণ কোরবানির থেকে।
কোরবানির শরিক নির্বাচনে সতর্কতা : যখন আমরা যৌথভাবে কোরবানি দেব, তখন অবশ্যই দ্বীনদার, পরহেজগার এবং হালাল উপার্জনকারী ব্যক্তিদের শরিক হিসেবে নির্বাচন করা জরুরি। এতে আমাদের কোরাবানি কবুল হবে এবং এর লক্ষ্য অর্জিত হবে।
তওবা-ইস্তিগফার : অতীতের অনিচ্ছাকৃত বা ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে খাঁটি মনে তওবা করতে হবে এবং আজই সুদ, ঘুষ ও সমস্ত হারাম মাধ্যমকে চিরতরে ‘না’ বলতে হবে।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা