ত্যাগের শিক্ষা দেয় কোরবানি

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম

মানবজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হলো ত্যাগ। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রসহ সর্বত্র উন্নতি ও শান্তির জন্য প্রয়োজন নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ। ইসলামে ত্যাগের এই মহান আদর্শকে বাস্তবভাবে তুলে ধরেছে কোরবানি। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তু ত্যাগ করার অনন্য শিক্ষা কোরবানি। প্রতি বছর জিলহজ মাসে মুসলমানরা কোরবানির মাধ্যমে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর অতুলনীয় আনুগত্য ও আত্মত্যাগের স্মৃতি স্মরণ করে। তাই কোরবানি মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির এক মহিমান্বিত শিক্ষা। 

কোরবানির ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। মানবজাতির প্রথম যুগ থেকেই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি দেওয়ার প্রচলন ছিল। পবিত্র কোরআনে হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কোরবানির ঘটনা উল্লেখ রয়েছে। তবে মুসলিম উম্মাহর জন্য কোরবানির সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হলো হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ঘটনা। তিনি ছিলেন আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা। আল্লাহর নির্দেশে তিনি নিজের প্রাণ, সম্পদ, পরিবার সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পাওয়া প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে আল্লাহর আদেশে কোরবানি করতে উদ্যত হওয়া মানব ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘অতঃপর যখন সে তার পিতার সাথে চলাফেরার বয়সে পৌঁছল, তখন ইবরাহিম বলল, হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে জবাই করছি।’

এ কথা শুনে ইসমাইল (আ.) বললেন, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তাই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’

এই ঘটনা প্রমাণ করে, প্রকৃত মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসও ত্যাগ করতে দ্বিধা করে না। মহান আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-এর এ আত্মত্যাগ কবুল করেন এবং ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দেন। সেই স্মৃতিকে জীবন্ত রাখতেই মুসলমানরা প্রতি বছর কোরবানি করে থাকে।

কোরবানির মূল শিক্ষা হলো তাকওয়া ও আত্মত্যাগ। মহান আল্লাহ কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কোরবানির গোশত ও রক্ত। বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’

অর্থাৎ কোরবানির আসল উদ্দেশ্য পশুর রক্ত প্রবাহিত করা নয়, বরং অন্তরের খাঁটি ইমান, আল্লাহভীতি ও আনুগত্য প্রকাশ করা। মানুষ যখন নিজের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে আল্লাহর নামে পশু কোরবানি করে, তখন সে মূলত নিজের ভেতরের লোভ, স্বার্থপরতা ও কৃপণতাকে কোরবানি দেয়।

বর্তমান সমাজে মানুষ ভোগ-বিলাস ও আত্মকেন্দ্রিকতায় দিন দিন বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে। মানুষ নিজের স্বার্থ ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করতে চায় না। এমন পরিস্থিতিতে কোরবানি আমাদের শেখায়, নিজের আনন্দের পাশাপাশি অন্যের কল্যাণের কথাও ভাবতে হবে। কোরবানির গোশত আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিব-দুঃখীদের মাঝে বণ্টন করার মাধ্যমে সমাজে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়। ধনী-গরিবের বৈষম্য কিছুটা হলেও কমে আসে। গরিব মানুষও ঈদের আনন্দে শরিক হওয়ার সুযোগ পায়। এভাবে কোরবানি সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলে।

কোরবানি আমাদের আত্মশুদ্ধিরও শিক্ষা দেয়। মানুষের অন্তরে নানা ধরনের কুপ্রবৃত্তি বাসা বাঁধে। যেমন অহংকার, হিংসা, লোভ, কামনা-বাসনা ইত্যাদি। কোরবানির মাধ্যমে একজন মুমিন শপথ নেয়, সে এসব খারাপ প্রবৃত্তিকে দমন করবে এবং আল্লাহর পথে জীবন পরিচালনা করবে। প্রকৃত কোরবানি তখনই সফল হয়, যখন মানুষের চরিত্রে পরিবর্তন আসে এবং সে নৈতিকভাবে উন্নত মানুষে পরিণত হয়।

ত্যাগ ছাড়া কোনো মহৎ কাজ সফল হয় না। ইসলামও ত্যাগের ধর্ম। ইসলামের ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহ ও তার রাসুলের সন্তুষ্টির জন্য জীবন, সম্পদ ও পরিবার সবকিছু ত্যাগ করেছেন। বদর, ওহুদ ও কারবালার প্রান্তরে মুসলমানদের আত্মত্যাগ ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। কোরবানি সেই ত্যাগের চেতনাকে পুনর্জাগ্রত করে। এটি মানুষকে আল্লাহর পথে সংগ্রাম ও কষ্ট সহ্য করার শক্তি জোগায়। 

বর্তমানে অনেকেই কোরবানিকে শুধুমাত্র সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করছে। বড় পশু কেনা, লোক দেখানো আয়োজন ও অহেতুক অপচয়ের মাধ্যমে কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ ইসলাম অহংকার ও অপচয়কে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা হলো বিনয়, আন্তরিকতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই কোরবানির সময় বাহ্যিক জাঁকজমকের পরিবর্তে অন্তরের একনিষ্ঠতা ও তাকওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।

কোরবানি আমাদের পরিবার ও সমাজে দায়িত্ববোধও সৃষ্টি করে। একজন বাবা যখন সন্তানকে কোরবানির তাৎপর্য শেখান, তখন তার হৃদয়ে ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আল্লাহভীতির বীজ রোপিত হয়। ফলে নতুন প্রজন্ম নৈতিক ও আদর্শবান হিসেবে গড়ে ওঠে। আজকের পৃথিবীতে যেখানে স্বার্থপরতা, হিংসা ও অমানবিকতা বেড়ে চলেছে, সেখানে কোরবানির শিক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত