বিচারে এআইয়ের সীমাবদ্ধতা

মাত্র কয়েক বছরে জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (জেন এআই) স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে শিক্ষা, বিনোদন, অর্থ খাত, এমনকি আইন-আদালতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। যদিও আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তে জেন এআইয়ের ব্যবহার ন্যায়বিচারের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিচ্ছেন। এই প্রযুক্তি বিচারিক সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত হলে বিভ্রমমূলক (এআই হ্যালুসিনেশন) তথ্য থেকে সৃষ্ট ভুল ফলাফল, বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব প্রভৃতি উদ্বেগের কারণ হতে পারে। যদিও ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে বেশ কিছু বিচারক আদালতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং পরবর্তীকালে রায় লেখার কাজে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। বিচারিক সিদ্ধান্তে এআইয়ের অযাচিত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, স্পেন, জামাইকা, পাকিস্তান, ইতালি, ভারতের কিছু রাজ্যসহ বেশ কিছু দেশের উচ্চ আদালত বিচারক এবং আদালত স্টাফদের জন্য প্রযোজ্য এ বিষয়ক নির্দেশিকা, নীতি, নিয়ম বা প্র্যাকটিস ডিরেকশন জারি করেছে।

সাধারণভাবে এসব নির্দেশিকাগুলোতে বলা হয়েছে বিচারকরা আদালতের নির্দিষ্ট কাজে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবেন। যেমন : দীর্ঘ আইনি নথির সারসংক্ষেপ তৈরি, মোকদ্দমার কাগজপত্র অনুবাদ, কথ্য সাক্ষ্য লিপিবদ্ধকরণ, আইনি নজির শনাক্তকরণ বা রায়ের পাঠযোগ্যতা বৃদ্ধির মতো প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পাদনের জন্য সহায়ক সরঞ্জাম হিসেবে এআই ব্যবহার করা যাবে। তবে মূল বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রায় লেখাসহ বিচারিক সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত কার্যাবলিতে এআই প্রয়োগ করা যাবে না। এ ছাড়াও এআইয়ের সীমাবদ্ধতা, বিচারকদের জন্য সতর্কতা, পক্ষগুলো ও নথিপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা এবং বিচারকরা এআই ব্যবহার করলে, তার দায়িত্ব গ্রহণ প্রভৃতি বিষয়ে সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো এআই নিয়ে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার পরও সম্প্রতি কিছু দেশের বিচার বিভাগীয় নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে মতামত ব্যক্ত করেছেন যে, অদূর ভবিষ্যতে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন সাপেক্ষে, কম ঝুঁকিপূর্ণ বা স্বল্প জটিল অথবা সরল প্রকৃতির মামলা-মকদ্দমায় সিদ্ধান্ত নিতে এআই ব্যবহার করা যেতে পারে। যেখানে একজন মানব বিচারক এ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত থাকবেন, সামগ্রিক বিষয় তত্ত্বাবধান করার জন্য। কিন্তু বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এআই প্রযুক্তি। তাতে সহজ প্রকৃতির একই ধরনের মামলায় মানব বিচারকের বারবার সময়, প্রচেষ্টা বা শ্রম বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না এবং বিচারপ্রার্থী স্বল্প খরচ ও দ্রুত সময়ে আদালত থেকে রায় পেয়ে নিস্তার পাবেন। 

পরের বছর পুনরায় এক বক্তৃতায় এই প্রেক্ষাপটে মানুষের কোন অধিকারগুলো সুরক্ষিত থাকা উচিত, তা নিয়ে ভস আবারও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের আহ্বান জানান। তিনি আইনি ব্যবস্থা ও বিচারিক প্রক্রিয়াতে এআই প্রযুক্তি দায়িত্ব, কার্যকর ও নিরাপদভাবে ব্যবহারের ওপর জোর দেন। যদিও যুক্তরাজ্যে উল্লিখিত নির্দেশিকা দ্বারা বিচারিক সিদ্ধান্তে, এআই ব্যবহার না করার জন্য বলা হয়েছে। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু দেশের নির্দিষ্ট বিচার প্রক্রিয়ায় বিশেষ ধরনের ‘যান্ত্রিক’ মামলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা বা ব্যবহার করা হচ্ছে। এস্তোনিয়া ৭,০০০ ইউরো পর্যন্ত মূল্যমানের আর্থিক দাবির দেওয়ানি প্রকৃতির মামলায় একটি আধা-স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। যেখানে মানব কেরানিরা কেবল প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধান করেন এবং মূল নিষ্পত্তি এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। আবার জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের একটি আদালত, বিমানযাত্রীদের অধিকার সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য ফ্রাউকে নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। বিচারকরা তারপর সেই খসড়া থেকে চূড়ান্ত রায় তৈরি করেন; যা রায়ের খসড়া তৈরিতে ব্যয়িত সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস আদালতে, পাইলট প্রকল্প হিসেবে এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বিচারকবৃন্দ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার শুরু করেছেন। তারা এমন একটি টুল পরীক্ষা করছেন, যা দ্রুত শত শত পৃষ্ঠার আইনি আবেদনপত্র সংক্ষিপ্ত করতে পারে এবং কোনো বিচারকের লেখার শৈলীর নমুনা ব্যবহার করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে, এমনকি প্রাথমিক রায়ের খসড়া তৈরি করতে সাহায্য করে। আদালতের কর্মকর্তারা বলছেন, এই পাইলট প্রোগ্রামের মাধ্যমে মৌলিক বিচারিক কাজে সহায়তা ও মামলার জট কমাতে এআই প্রযুক্তি দারুণ ভূমিকা রাখবে।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশের আদালত অতিরিক্ত কাজের চাপ ও মামলাজটে জর্জরিত। যেখানে এআইয়ের মতো প্রযুক্তি, বিচারে সামঞ্জস্য ও কার্যকারিতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে। কিন্তু এ কথাও সত্য যে, দেশে দেশে স্বয়ংক্রিয় বিচার ব্যবস্থা চালু হলে, এটি শত শত বছরের বিচারিক পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে। তবে কিছু আইনজ্ঞের মতে, ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিবিচার পাওয়ার অধিকারকে ক্ষুন্ন করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। আদালতের বিচারকার্য কেবল একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মধ্যে বা রায় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি সামগ্রিক ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া; যার মধ্যে মানব বিচারকের উপস্থিতিতে পক্ষদ্বয়ের বক্তব্য পেশ করার অধিকার অন্তর্ভুক্ত। আদালতে বিচারকের সামনে আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ, পক্ষদ্বয়ের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যগুলো বিচার-বিশ্লেষণ, সাক্ষ্য পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ এবং আইন ও ন্যায়বিচারের আলোকে বিচারকের নিজস্ব সুবিবেচনা বা বিচার-বিবেচনা প্রয়োগ করা এর আওতাভুক্ত। এসব অধিকার চর্চার সুযোগ, এআই নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় অনুপস্থিত।

এআইয়ের মতো অ্যালগরিদমিক যন্ত্র যত উন্নত হোক না কেন, মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়পরায়ণতা, সুবিবেচনার প্রজ্ঞা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আনার তাগিদ বা পরিবর্তনশীল সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুধাবন দূরের কথা; এসব প্রযুক্তি নিজের উৎপাদিত তথ্য শুনতে, পড়তে বা বুঝতে অক্ষম। আইনি ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেলে দেখা যাবে, এআইয়ের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সংখ্যা বাড়ছে, যা মামলার বিদ্যমান জটকে না কমিয়ে বরং আরও বাড়িয়ে তুলছে। এআইয়ের মতো প্রযুক্তি, আদালত প্রশাসন পরিচালনা এবং করণিক কাজের চাপ কমাতে উপযুক্ত হতে পারে। কিন্তু মানব বিচারকদের প্রতিস্থাপন, এমনকি আপাতদৃষ্টিতে কম গুরুত্বপূর্ণ মামলাতেও, ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিসমূহ প্রচ-ভাবে ক্ষুন্ন করবে। যে মূল্যবোধ রক্ষা করার জন্য বিচারব্যবস্থা বিদ্যমান; সেসবের বিনিময়ে প্রশ্নবিদ্ধ সামঞ্জস্যতা, কার্যকারিতা বা দক্ষতার বিকাশ হওয়া নিশ্চয় উচিত নয়।