উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় শত্রু, যা সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান যথার্থই বলেছিলেন, ‘আমরা যদি সহিংসতাকে প্রশ্রয় দিই, তবে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎকেই হত্যা করছি।’ বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, ‘ঘৃণা দিয়ে ঘৃণাকে দূর করা যায় না, কেবল ভালোবাসা দিয়েই তা সম্ভব।’ আর নোবেল পুরস্কারজয়ী মালালা ইউসুফজাই বলেছেন, ‘বন্দুক দিয়ে আপনি সন্ত্রাসীকে মারতে পারেন, কিন্তু শিক্ষা দিয়ে আপনি সন্ত্রাসবাদকে ধ্বংস করতে পারেন।’ সন্ত্রাসবাদ-উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ নিয়ে এমন অনেক মূল্যবান বাণীই রয়েছে।
আমাদের স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকেই জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ-উগ্রবাদ-বিচ্ছিন্নতাবাদের পদধ্বনি শুনতে হচ্ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধকে বিচ্ছিন্নতাবাদের আবরণে ঢেকে দিতে চেয়েছিল বিরোধী পক্ষ। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ-উগ্রবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের মতো ঘৃণিত
বিষয়গুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও মূলত তা একই বিষয় নয়। এগুলোর উদ্দেশ্য, পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। উগ্রবাদ সমাজে প্রচলিত রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক মূল্যবোধের বাইরে চরমপন্থি মতাদর্শে বিশ্বাস করে। এটি একটি চিন্তাধারা। সব উগ্রবাদী সহিংস হয় না। জঙ্গিবাদ কোনো মতাদর্শ বা লক্ষ্য অর্জনে সংগঠিতভাবে অস্ত্র হাতে নেয় বা সহিংসতার পথ বেছে নেয়। সন্ত্রাসবাদ রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা আদর্শগত উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করতে পরিকল্পিত সহিংসতা পথে চলে। এর প্রধান লক্ষ্য ভীতি সৃষ্টি। আর বিচ্ছিন্নতাবাদ কোনো অঞ্চলকে একটি রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে স্বাধীন রাষ্ট্র বা স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন নির্দেশ করে। এটি একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য। এটি শান্তিপূর্ণ বা সহিংস উভয়ভাবেই হতে পারে।
জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ-উগ্রবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা আদর্শগত লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে। একটি অন্যটির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। যেমন, উগ্রবাদ থেকে জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদের জন্ম হতে পারে। কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সশস্ত্র সংগ্রাম বা সন্ত্রাসী কৌশল গ্রহণ করতে পারে, আবার অনেক বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণও হয়। তবে এ কথাও সত্য, উগ্রবাদ হলো মতাদর্শ আর জঙ্গিবাদ হলো অস্ত্রধারী বা সহিংস সংগ্রামের পদ্ধতি। অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদ হলো ভয় সৃষ্টি করে লক্ষ্য অর্জনের কৌশল, যেখানে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। পক্ষান্তরে বিচ্ছিন্নতাবাদ হলো একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, অর্থাৎ আলাদা রাষ্ট্র বা স্বায়ত্তশাসন অর্জন প্রচেষ্টা। এদের সম্পর্ককে সহজভাবে বলা যায় উগ্রবাদ (চিন্তাধারা) থেকে জঙ্গিবাদ (অস্ত্রধারী সহিংসতা) ও সন্ত্রাসবাদ (ভয় সৃষ্টিকারী সহিংস কৌশল) সূচিত হয়। অন্যদিকে, বিচ্ছিন্নতাবাদ এই ধারার অংশ হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন যদি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে পরিচালিত হয়, তবে সেটিকে জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ বলা যায় না। তবে যদি তারা বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা ভীতি সৃষ্টির কৌশল ব্যবহার করে, তখন তা সন্ত্রাসবাদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের দেশ। স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রটি গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল ও উন্নত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে সচেষ্ট রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে নানাবিধ প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে বহুবার। ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে অপারেশন ‘বুল ডগ’ পরিচালনা করতে হয়েছে তথাকথিত চরমপন্থিদের নির্মূল করতে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে বহু সেনাসদস্য অঙ্গহানিসহ হতাহতের শিকার হন। বামপন্থি একাধিক সংগঠন তখন নানা দাবি সামনে এনে মূলত অস্থিরতা সৃষ্টি করে সদ্য স্বাধীন দেশের সরকারকে বেকায়দায় ফেলে। পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, মতাদর্শিক চরমপন্থার বিস্তার এবং তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশও উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের মতো জটিল নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের উত্থান কোনো একক ঘটনার ফল নয়; বরং এটি রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, শিক্ষাগত এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রভাবকের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর রূপ, কৌশল এবং কার্যক্রমের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। এদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের কিছু শেকড় স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৮০-এর দশকে আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা কিছু বাংলাদেশি যোদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক জিহাদি মতাদর্শের বিস্তার পরবর্তী সময়ে কিছু চরমপন্থি সংগঠনের আদর্শগত ভিত্তি গঠনে ভূমিকা রাখে। ২০০০ সালের পর এ প্রবণতা আরও সংগঠিত রূপ নিতে শুরু করে। তখন দেশে জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ, নব্য জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আনসার আল ইসলাম, আল্লাহর দলসহ বেশ কিছু জঙ্গি সংগঠন প্রকাশ্যে সক্রিয় হয়। বিশেষ করে জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) এবং হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি) বিভিন্ন স্থানে হামলা, বোমা বিস্ফোরণ এবং রাষ্ট্রকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়।
১৭ আগস্ট ২০০৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সেদিন দেশের ৬৩টি জেলার প্রায় ৫০০ স্থানে একযোগে শত শত ছোট আকারের বোমা বিস্ফোরণ করা হয়। ওই হামলার মাধ্যমে জেএমবি দেশব্যাপী নিজেদের সংগঠিত সক্ষমতা প্রদর্শন করে। তখন থেকেই সরকার জঙ্গিবিরোধী কঠোর অভিযান শুরু করে। জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলামসহ (বাংলা ভাই) কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করে বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এরপর জঙ্গি কার্যক্রম কিছুটা কমে আসে। তবে সংগঠনগুলো গোপনে ফের পুনর্গঠিত হতে থাকে এবং নতুন সদস্য সংগ্রহে মনোযোগ দেয়। এরই মধ্যে ব্লগার, মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক, বিদেশি নাগরিক এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিক হামলা ঘটে। তখন এ নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। নব্য জেএমবি নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক জঙ্গি মতাদর্শ, বিশেষ করে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট-এর প্রচারণা দ্বারা প্রভাবিত হয় বলে বিভিন্ন তদন্তে উঠে আসে।
১ জুলাই ২০১৬ ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জঙ্গি হামলা সংঘটিত হয়। এতে বাংলাদেশি ও বিদেশি নাগরিকসহ বহু মানুষ নিহত হয়। ওই হামলার পর সরকার সর্বাত্মক জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো তখন দেশব্যাপী অনেক অভিযান পরিচালনা করে। বহু জঙ্গি নিহত বা গ্রেপ্তার হয় এবং তাদের অনেক আস্তানা ধ্বংস করা হয়। ওই অভিযানকে বিরোধী মতাদর্শকে মাটিচাপা দিতে সরকারের সাজানো নাটক বলেছিল তখন সরকারবিরোধী কোনো কোনো দল। এরই মধ্যে উগ্রবাদী প্রচারণার বিষবাষ্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যমে স্থানান্তরিত হতে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ধরনের হামলার ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম হলেও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সতর্ক রয়েছে। অনলাইন চরমপন্থা, বিদেশি উগ্রবাদী প্রচারণা, ক্ষুদ্র গোপন সেল গঠন এবং সীমান্ত পাড়ের যোগাযোগ নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গি সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার এবং সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করার কথা জানিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো সরকার যদি জঙ্গিবাদ নির্মূলে আন্তরিক হয় ও জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে বিরোধীদলীয় মতাদর্শকে দমনের পথে না হাঁটে, তবে পরিস্থিতিকে আমূল পরিবর্তন সম্ভব।
বাংলাদেশে উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের বিস্তারের পেছনে অন্যতম কারণ ধর্মীয় শিক্ষার অপব্যাখ্যা ও চরমপন্থি মতাদর্শের প্রচার। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক ও বৈশ্বিক উগ্রবাদী প্রচারণার প্রভাব। সামাজিক বৈষম্য, বেকারত্ব ও হতাশা এদেশের তরুণ সমাজকে সহজেই ভুলপথে পা বাড়াতে প্রলুব্ধ করে। আর তার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন, পরিবর্ধন ও সংশোধন, সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে কার্যকরী ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষায়িত ইউনিট ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বিত অভিযান জঙ্গি আস্তানা শনাক্ত ও ধ্বংস করতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিশেষত ইন্টারপোলসহ বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময় সন্ত্রাস দমনের অন্যতম হাতিয়ার। অনলাইন নজরদারি তথা সামাজিক মাধ্যমে উগ্রবাদী প্রচারণা শনাক্তকরণ ও প্রতিকার সুফল বয়ে আনে। মসজিদের ইমাম, আলেম, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে সব ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশে উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ একটি বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সমস্যা, যার শেকড় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় প্রেক্ষাপটে নিহিত। ২০০০ সালের পর থেকে এ ধরনের সহিংস চরমপন্থা উল্লেখযোগ্যভাবে দৃশ্যমান হলেও ধারাবাহিক আইনগত পদক্ষেপ, গোয়েন্দা তৎপরতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এর সাংগঠনিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়। তবে পরিবর্তিত প্রযুক্তিগত পরিবেশ, অনলাইন চরমপন্থি প্রচারণা এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য প্রভাবের কারণে ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। দীর্ঘমেয়াদে উগ্রবাদ প্রতিরোধের জন্য কেবল নিরাপত্তা অভিযান যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা, ধর্মীয় সহনশীলতার প্রসার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা এবং আইনের শাসন আরও শক্তিশালী করতে হবে। জরুরি হচ্ছে রাজনৈতিক ঐকমত্যও। রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও উগ্রবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত মেজর, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
