সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যেভাবে আক্রান্ত হলো তাতে মনে হয়, এটাই বুঝি বাংলার মুখ? তারও আগে দশকের পর দশক ধরে আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও লোক ঐতিহ্যে যেভাবে আঘাত এসেছে, তাতে মনে হয়েছে বাংলা বোধহয় এমনই। কোনো বছর নেই যে বছর পূজায় কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেনি।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পরপর সাম্প্রদায়িক হামলাগুলো যেমন আমাদের মনে আছে, তেমনি আমাদের মাথায় আছে আগের অগ্নিকাণ্ডগুলো। আমাদের মগজে এখনো দাউদাউ করছে ২০১৬ সালের নাসিরনগর ও ২০১২ সালের রামুর আগুন। কোভিডের মধ্যে হুট করে ধর্ম অবমাননার যে হিড়িক উঠেছিল, সেই স্মৃতি পুরনো মাস্কের সঙ্গে নিশ্চয়ই আমরা ডাস্টবিনে ফেলে দিইনি।
পীর শামীম, নুরাল পাগলার ঘটনা আমাদের যেমন চোখের সামনে ভাসে, তেমনি হলি আর্টিজান, ব্লগার হত্যার সিরিজ আমাদের চোখের চোখে এখনো জ্বলজ্বলে হয়ে আছে। আবুল সরকারের ঘটনা যেমন আমরা এখনো স্ক্রল করি তেমনি আজও আমাদের বিক্ষত করে বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মন্ডলের ঘটনাটি।
এই বৈশাখে যেমন ‘নাজায়েজে’র ঝড় উঠেছে, তার আগের বৈশাখেও একই রকম মৌলবাদী টর্নেডো উঠেছিল। এবার হয়তো শুধু ধর্মীয় মজমায় গালি দিয়েছে, কিন্তু একসময় যে বৈশাখের দেয়ালচিত্রটাই মুছে ফেলা হয়েছিল কালি দিয়ে!
অভ্যুত্থান-পরবর্তী ১৫ মাসে সাংস্কৃতিক আয়োজনে ১৩৫টি বাধার খবর মিডিয়াতেই এসেছে। এক দশকের চিত্রই এমন। কখনো বেড়েছে, কখনো একটু কমেছে। কিন্তু গড় চিত্র এমনই। একশ বছরের চিত্রও হয়তো তাই বলবে, যদি তাকে আগের শতাব্দীর সঙ্গে তুলনা করা হয়। আমরা যদি এভাবে কয়েক শতাব্দী পেছনে যাই তবে হয়তো দেখব বাংলা একদিন এমন ছিল না। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এখানে প্লেটোনিক ইউটোপিয়া না, বাস্তব। আমাদের পুরনো সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় বাংলার এই সম্প্রীতি ও সমন্বয়বাদের উদাহরণ অসংখ্য। সেসব উদাহরণের একটি—গাজী কালু ও চম্পাবতীর আখ্যান।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে এই আখ্যানটির গুরুত্ব কী, নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানে না। কিন্তু সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ঠিকই জেনে বসে আছে। তার এর গুরুত্ব বুঝে বলেই তো আঘাত করে। ২২ মে ২০২৫ তারিখে ডেইলি স্টার বাংলা ভার্সন একটি রিপোর্ট করে, ‘জামায়াতের বাধায় ভাঙল শতবর্ষী গাজী-কালু-চম্পাবতীর মেলা’। বিডিনিউজ, প্রতিদিনের সংবাদসহ একাধিক পত্রিকায় খবরটি প্রকাশিত হয়েছে।
গাজী-কালু ও চম্পাবতীর মতো এই চরিত্রগুলোকে আঘাত করার সময় যুক্তি দেওয়া হয় এই চরিত্রগুলো মিথ। মিথ বলেই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ মিলে শতাধিক স্থানে তাদের মাজার, দরগাহ ও স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে।
কিন্তু গাজী-কালু কি সত্যিই মিথ? শুধুই লোকজ চরিত্র? তাদের গল্প কি শুধুই মিথের গল্প? এই গল্পের কি কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই? শতাব্দীর পুরনো জারি, যাত্রা, পটচিত্র ও পুঁথি সাহিত্যের রসধারা কি আমাদের ইতিহাসের দিকে গতিমুখ করে নয়?
মিথ ও লোকজ গল্পে গাজী-কালু ও চম্পাবতী সম্পর্কে আমরা জেনেছি, এই গাজীর আসল নাম জাফর খাঁ গাজী। যিনি তেরো শতকের ত্রিবেণী বিজয়ী, একজন সুফি সাধক, মধ্য এশিয়া থেকে ধর্ম প্রচার ও আধ্যাত্মিক মুক্তির সন্ধানে বাংলায় এসেছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন তার পালিত ভাই বা ঘনিষ্ঠ সহচর কালু। ঝিনাইদহ অঞ্চলের সামন্ত রাজা মুকুট রায়ের কন্যা চম্পাবতীর সঙ্গে গাজীর প্রণয় ও পরিণয় হয়। কেউ বলেন এই কারণে রাজার সঙ্গে তার একটি যুদ্ধ হয়, কেউ বলেন সন্ধি হয়।
গাজী-কালু উপাখ্যানের ঐতিহাসিক শিকড় গিয়ে পৌঁছায় তেরো শতকের শেষভাগে। ১২৯৮ খ্রিস্টাব্দের জাফর খাঁ গাজী বাংলায় সুফি বা আধ্যাত্মিক ধারার অন্যতম অগ্রদূত। রায়মঙ্গল কাব্যের ভূমিকায় সত্যনারায়ণ ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন, এই জাফর খাঁ গাজীর ঐতিহাসিক বীরত্বই কালক্রমে লোকমানসে ‘বড় খাঁ গাজী’ বা ‘গাজী পীর’-এর অতিমানবিক রূপ পরিগ্রহ করেছে।
তলোয়ারের চেয়েও গাজী বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তাঁর চারিত্রিক ঔদার্য ও আধ্যাত্মিক তেজ দিয়ে। আবদুর রহিমের পুঁথিতে বর্ণিত শাহজাদা গাজীর বৈরাগ্য এবং ফকিরি গ্রহণ মূলত সেই সুফি দর্শনেরই প্রতিচ্ছবি, যেখানে পার্থিব রাজত্বের চেয়ে আধ্যাত্মিক মুক্তিকে বড় করে দেখা হয়েছে। বড় খাঁ গাজী চরিত্রটি তাই বাংলায় ইসলাম প্রচারের সেই আদি ও তেজস্বী উত্তরাধিকারেরও প্রতীক, যা ছিল একই সঙ্গে সামরিক বীরত্ব এবং মরমি সাধনার সংমিশ্রণ।
গাজী-কালু আখ্যানের সময়টি ছিল বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ। বিশেষ করে ইলিয়াস শাহী আমলের (১৪শ-১৫শ শতাব্দী) সেই সময়টাতে গৌড়ের সুলতানরা চেষ্টা করছিলেন সমগ্র বাংলাকে একটি একক প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে আনতে। কিন্তু দক্ষিণ ও পশ্চিম বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল তখন ছোট ছোট স্বাধীন সামন্ত রাজাদের দ্বারা শাসিত হতো। এই রাজনৈতিক মানচিত্রে একদিকে ছিল সুলতানি শাসনের বিস্তারকামী নীতি, আর অন্যদিকে ছিল রাজা মুকুট রায়ের মতো স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত রাজাদের আভিজাত্য রক্ষার লড়াই। মুকুট রায়ের সঙ্গে গাজীর সংঘাতকে তাই কেবল ধর্মীয় চশমায় দেখা ঐতিহাসিক ভুল হবে। বরং তা ছিল মূলত কেন্দ্রীয় শক্তির প্রভাব বনাম স্থানীয় সামন্ততান্ত্রিক স্বায়ত্তশাসনের দ্বন্দ্ব। গাজীর এই অভিযানে সম্ভবত সুলতানি শক্তির প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল, যা এই অঞ্চলকে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বলয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে সহায়ক হয়েছিল।
গাজী-কালু ও চম্পাবতী মিথের সত্যতা যাচাই করতে গেলে আমাদের যেতে হবে বারোবাজারে। পুঁথিতে এসেছে—
‘বারোবাজার বারো পীর আঠারো লোকমান,/
ছাপাইনগর ধন্য হলো গাজীর সম্মান।’
এখানে ‘বারোবাজার’ নামক স্থানের পাশাপাশি আমরা ‘ছাপাইনগর’ নামে আরেকটি স্থানের নাম দেখতে পাচ্ছি। সেই স্থানের বর্ণনা দিতে গিয়ে পুঁথিকার বলেন :
‘ছাপাইনগর শহর অতি অনুপম,/
যাহাতে বসতি করে গাজী মহোত্তম।/ কালু সাথে করি গাজী আইল ত্বরিত,/
ছাপাইনগর দেখে অতি আনন্দিত।’
বর্তমানে ঝিনাইদহে ‘বারোবাজার’ নামে একটি জায়গা থাকলেও ‘ছাপাইনগর’ নামে কোনো প্রশাসনিক গ্রাম বা বাজার নেই। তবে গবেষক ও ইতিহাসবিদদের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ইতিহাসবিদরা মনে করেন, সুলতানি আমলে এখানে যে শহর ছিল সেই সমৃদ্ধ শহরের নামই ছিল ‘ছাপাইনগর’ বা ‘চাপাইনগর’। লোকমুখে এবং গাজীর পুঁথিতে ছাপাইনগরই অমর হয়ে আছে। ছাপাইনগরের বারোবাজারও যে কতটা সমৃদ্ধ ছিল তা সেখানকার জোড়া মসজিদ দেখলে এখনো অবাক হয়ে টের পেতে হয়। ১১ ফুট উঁচু এই মসজিদের ভেতরের গম্বুজ, পাতলা ইটের গাঁথুনি জানান দেয়, এখনকার নান্দনিকতার অস্তিত্ব।
কিন্তু ছাপাইনগর নামটি কীভাবে হলো? কোথা থেকে এলো বারোবাজার নামটি? ছাপাইনগর নাম সম্পর্কে ধারণা করা হয়, সুলতানি আমলে যখন কোনো নতুন শহর বা টাকশাল শহর প্রতিষ্ঠিত হতো, তখন সেখানে রাজকীয় সিল বা ছাপ মারা হতো। ছাপাইনগর বা চাপাইনগর এমন এক শহর হতে পারে, যা রাজকীয় সিলমোহর বা বিশেষ কোনো ‘ছাপ’ বা চিহ্নের মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছিল। পুঁথিতে বর্ণিত ছাপাইনগর যেহেতু একটি সমৃদ্ধ সুলতানি শহর ছিল, তাই এর নাম ফারসি ‘চাপ’ থেকে আসা অসম্ভব নয়। মুঘল এবং ব্রিটিশ আমলের ম্যাপ ও নথিপত্রে এই এলাকাটিকে ‘বারোবাজার’ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে।
কিন্তু বারোবাজার নামটা কোথা থেকে এলো, তার মীমাংসা এখনো হয়নি। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, খান জাহান আলীর সমসাময়িক ১২ জন সুফি সাধকের বসতি স্থাপনের পর এলাকাটি ‘বারো পীরের বাজার’ থেকে ‘বারোবাজার’ নামে পরিচিতি পায়। একই সঙ্গে পুরনো ‘ছাপাইনগর’ নামটি লোকজ পুঁথির বাইরে মানুষের মুখ থেকে হারিয়ে যায়।
চম্পাবতীর সঙ্গে গাজীর প্রণয় পরিণতি সম্ভবনা এই বারোবাজার বা ছাপাইনগরের ইতিহাসের মধ্যেই রয়েছে। চম্পাবতীর পিতা রাজা মুকুট রায়ের রাজ্য এবং ছাপাইনগরের নৈকট্য বোঝাতে পুঁথিতে বলা হয়েছে :
‘মুকুট রায়ের রাজ্য ছিল অতি চমৎকার,/
ছাপাইনগর হতে তার নিকট বিস্তার।/
গাজী কহে শুন কালু ভাই রে আমার,/
ছাপাইনগর করিব মোরা বসতি এবার।’
পুঁথিতে বর্ণিত এই ছাপাইনগর যে কাল্পনিক কোনো স্থান নয়, তার আরেকটি বড় প্রমাণ ঝিনাইদহের বারোবাজার এলাকায় খননকাজের সময় আবিষ্কৃত সুলতানি আমলের অসংখ্য মসজিদ। সাতগাছিয়া মসজিদ, গোরা মসজিদ, শুকুর মল্লিক মসজিদের মতো পরিকল্পিত নিদর্শনগুলো পুঁথির ‘সমৃদ্ধ শহর’ বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
এই নগরীটি যে একসময় বাংলার নৌ-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রও ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পুঁথিতে তার চিত্রপট আঁকা হয়েছে এভাবে :
‘সাজিল সকল নৌকা গাজীর আদেশে,/
বাহিয়া চলিল তরী ছাপাইনগর দেশে।/
ভৈরব নদীর কূলে তরী দিল দেখা,/
ছাপাইনগর বন্দর যেন চিত্রপটে আঁকা।’
গাজীর আধ্যাত্মিক মহিমা এই সমৃদ্ধ নৌ-বন্দরকে কেন্দ্র করেই ছড়িয়ে পড়েছিল। ব্যবসায়ীরা যখন নৌপথে যাতায়াত করতেন, তাঁরা গাজীর আধ্যাত্মিক শক্তি ও নিরাপত্তার গল্প সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন দেশ-দেশান্তরে। গাজীর চোখে ছাপাইনগর বা বারোবাজার যে একটি জাঁকজমকপূর্ণ বন্দর ছিল, তার প্রমাণ মেলে এই পঙ্ক্তিতেও :
‘ছাপাইনগর শহর অতি চমৎকার,/
নদীতীরে শোভে কত তরণী-সম্ভার।/
দেশ-বিদেশের সওদাগর তথা করে বাস,/
গাজী কহে এই স্থানে পূর্ণ হবে আশ।’
এভাবেই একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র ক্রমে ক্রমে পীর-সংস্কৃতির পবিত্র কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়, যার প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ আজও আমাদের ইতিহাসের সত্যতার জানান দেয়।
মধ্যযুগে সুন্দরবনের ভৌগোলিক সীমানা আজকের তুলনায় অনেক বেশি উত্তর ও পশ্চিমে বিস্তৃত ছিল। তৎকালীন যশোর, খুলনা এবং বর্তমান চব্বিশ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল ঘন অরণ্য ও নদ-নদী বেষ্টিত। কৃষ্ণরাম দাসের ‘রায়মঙ্গল’ কাব্যের বর্ণনায় আমরা দেখি, এই দুর্গম সুন্দরবন এলাকায় মানুষের প্রধান শত্রু ছিল বাঘ ও কুমির। তাঁর কবিতায় এসেছে :
‘জলে কুমীর ডাঙ্গায় বাঘ।/
মধ্যে পড়ে কান্দে মাঘ।’
এই প্রতিকূল পরিবেশে ইসলাম প্রচারকারী সুফি সাধকরা সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেছিলেন আর্তমানবতার রক্ষকর্তা হিসেবে। তাঁরা বনের ভয়াল পশুর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মনে সাহস জুগিয়েছেন। রায়মঙ্গল কাব্যে দেখা যায়, গাজী যখন এভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন, তখন তাঁর সংঘর্ষ বাঁধে এই বনের দীর্ঘদিনের লৌকিক অধিপতি ও দেবতা দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে।
এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কোনো সহজ সমাধান পাওয়া যাচ্ছিল না। ঐতিহাসিক ও যৌক্তিক বিচারে এই সংঘাতের একটি দিক ছিল রাজা মুকুট রায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই, আর অন্যটি ছিল লৌকিক দেবতা দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে সংস্কৃতির সংঘাত। অবশেষে এই বিবাদের মীমাংসা করেন শ্রীহরি তথা পরমাত্মার এক অনন্য সমন্বয়বাদী রূপ।
শ্রীহরি অর্ধেক পীর ও অর্ধেক ব্রাহ্মণের এক অলৌকিক বেশে আবির্ভূত হয়ে তাঁদের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন। এই সন্ধির শর্ত অনুযায়ী, সুন্দরবনের সীমানা ভাগ করে দেওয়া হয়—পূর্বদিকের এলাকা গাজীর নিয়ন্ত্রণে এবং পশ্চিমদিকের এলাকা দক্ষিণ রায়ের অধীনে ন্যস্ত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাধারণ মানুষ বা বনজীবীরা যাতে নির্বিঘ্নে বনে প্রবেশ করতে পারে, সেজন্য উভয় পক্ষ একে-অপরের এলাকায় পারস্পরিক সম্মান ও অধিকার বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই ঘটনা এ অঞ্চলে আদিবাসী বিশ্বাস ও সুফি দর্শনের এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বা ‘লৌকিক সমন্বয়বাদে’র ভিত্তি স্থাপন করে।
রায়মঙ্গল কাব্যে উল্লেখকৃত ‘গাজী ও রায়ের সন্ধি’ প্রমাণ করে, এই অঞ্চলে ইসলাম চর্চা ছিল অত্যন্ত উদার। যা স্থানীয় আদিবাসী ও বনজীবীদের সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে এক নতুন লৌকিক দর্শনের জন্ম দিয়েছিল। সাড়ে তিনশ বছর আগের এই কাব্যে শ্রীহরি ও আল্লাহর অভিন্নতার কথা এসেছে চমৎকারভাবে :
‘একহি অদ্বৈতরূপ নাম মাত্র ভেদ,/
পুরাণ কোরাণ মতে নাহিক প্রভেদ।’
পূজায় ও শিরনিতে অধিকারের প্রসঙ্গও এসেছে এই কাব্যে। সন্ধির শর্তানুযায়ী ঠিক হয়, সুন্দরবনের মানুষ যখনই কোনো বিপদ থেকে মুক্তি চাইবে, তখন তারা দক্ষিণ রায় এবং গাজী পীর—উভয়কেই সমানভাবে শ্রদ্ধা জানাবে। কাব্যে বলা হয়েছে :
‘পূজা দিবে দক্ষিণ রায়ে করি ভক্তি মন,/
গাজীর দোহাই দিয়া করিবে বন্দন।.../
শিরনি দিবে গাজীর নামে, রায়েরে দিবে পূজা,/
দুই জনাই বনের রাজা, নাইকো কেহ ত্যাজ্য।’
সুন্দরবনের ‘আঠারো ভাটি’ অঞ্চলে কে কোথায় আধিপত্য করবে, সেই দ্বন্দ্বে লড়াই না করে তারা এলাকা ভাগ করে নেন। দক্ষিণ রায়কে স্বীকার করা হয় বনের রাজা হিসেবে, আর গাজীকে দেওয়া হয় আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব :
‘বাঘেরে করিলা রাজা রায়ের আদেশে,/
গাজী রহিলা পীর হয়ে সর্ব দেশে।’
গাজী ও দক্ষিণ রায়ের এই ঐতিহাসিক সমঝোতাই সুন্দরবনের হিন্দু-মুসলমানের যৌথদেবী ‘বনবিবি’ আখ্যানের ভিত্তি। বনবিবি জহুরনামা পুঁথি অনুসারে, বাঘ-রূপী দক্ষিণ রায়ের কবল থেকে অসহায় শিশু ‘দুখু’কে রক্ষার মাধ্যমে বনবিবি ও তাঁর ভাই শাহ জাঙ্গলী এই অরণ্যে মানবিক শাসনের সূচনা করেন। অনুমান করা অসংগত নয় যে এটা শুধু একটা লৌকিক গল্প নয়, বরং সুন্দরবনের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে মানুষের এক অখণ্ড সামাজিক নিরাপত্তা ও অসাম্প্রদায়িক ঐক্যের প্রতিশ্রুতি। গাজীর আধ্যাত্মিক করুণা ও দক্ষিণ রায়ের বন্য পরাক্রমের এই সমন্বয় বনবিবির আখ্যানে এসে একটি সুশৃঙ্খল ‘ইউটোপিয়া’ বা বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার রূপ নিয়েছে।
বাংলার ইসলাম কেন আরব বা পারস্যের চেয়ে আলাদা, তার উত্তর লুকিয়ে আছে এই ‘দোহাই’ এবং ‘সন্ধি’র দর্শনে। এখানে সুফি সাধকরা তলোয়ারের পরিবর্তে মানুষের অস্তিত্বের সংকটকে আপন করে নিয়েছিলেন। এটাই বাংলার মুখশ্রী।
রায়মঙ্গল কাব্য প্রমাণ করে, এই বদ্বীপে ইসলাম এবং স্থানীয় সংস্কৃতি একে-অপরকে মুছে দিতে চায়নি, বরং একে-অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। তলোয়ারের চেয়ে ‘দোহাই’ এবং যুদ্ধের চেয়ে ‘সন্ধি’ যেখানে বড় হয়ে ওঠে, সেখানেই জন্ম নেয় এক অজেয় অসাম্প্রদায়িক শক্তি। রায়মঙ্গল কাব্যের এই দর্শনই মূলত আমাদের লৌকিক ইসলামের সেই মূল ভিত্তি, যা শত শত বছর ধরে বাঙালি সত্তাকে ধারণ করে আছে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা