প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ৩

বাংলাদেশের অর্থনীতি : সংখ্যার আড়ালে বাস্তবের চাপ

বাংলাদেশের অর্থনীতি যেন গভীর সাগরে চলমান এক জাহাজ—এগোচ্ছে, কিন্তু গন্তব্য অনিশ্চিত। দূর থেকে দেখলে মনে হবে চলছে, দিকও ঠিকঠাক আছে। তবে কাছে গেলে বোঝা যায় যে, জাহাজের গায়ে সূক্ষ্ম ফাটল ধরেছে। কোথাও কোথাও পানি ঢুকছে, আবার ইঞ্জিনের শব্দেও ক্লান্তির ছাপ। ঢেউগুলোও আর আগের মতো অনুকূলে নেই। বাতাসও যেন দিক বদলাচ্ছে। আর এই জাহাজের ভেতরেই রয়েছে দেশের ১৮-২০ কোটি মানুষ। যাদের প্রতিদিনের জীবন আর এখন কেবল পরিসংখ্যানের হিসাব নয়, বরং অনিশ্চয়তায় ভরা।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হলো মূল্যস্ফীতি। এমন এক আগুন, যা দেখা না গেলেও প্রতিদিন অনুভূত হয়—রান্নাঘরের খরচে, বাজারের দামে আর ভাড়ার চাপে। সর্বশেষ হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৯.০৪ শতাংশ, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ আয় বাড়লেও বাস্তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এই ব্যবধানই আজকের অর্থনীতির সবচেয়ে স্পষ্ট সংকেত।

মূল্যস্ফীতির এই আগুন হঠাৎ জ্বলে ওঠেনি। কোভিড-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ভাঙন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত বিলম্ব মিলিয়ে এটা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়েছে। যখন নীতি সুদহার বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তত দিনে এই চাপ অর্থনীতির নানা স্তরে ঢুকে পড়েছে। এখন এটা শুধু একটি সামষ্টিক সূচক নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা। এটা এমন এক দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি, যা মানুষকেই ছোট করে দেয়।

এই বাস্তবতায় নীতিনির্ধারকরাও দাঁড়িয়ে আছেন এক জটিল দ্বিধার মধ্যে। সুদহার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও ঋণের খরচ বাড়ে, বিনিয়োগ কমে, কর্মসংস্থানের গতি শ্লথ হয়। আবার সুদহার কমালে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়লেও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা এমন এক সরু দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটা, যেখানে এক পা ভুল হলেই ভারসাম্য হারানোর ভয় থাকে।

এক সময় প্রবৃদ্ধির গল্প ছিল আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, যা এখন অনেকটা  ম্লান। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩.৪৯ শতাংশে। টানা কয়েক বছর ধরে এই পতন একটি বড় বার্তা দিয়ে গেল। অর্থনীতির ভেতরের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। শুধু বড় সংখ্যা দিয়ে শক্তি বোঝানো যায় না; তার ভিত্তিও শক্ত হতে হয়। নইলে প্রবৃদ্ধি হয়ে ওঠে কাগজের আলো। দেখতে উজ্জ্বল, কিন্তু বাস্তবে উষ্ণতা দেয় না।

এই দুর্বলতার প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্ট হয় দারিদ্র্যে। এক সময় দারিদ্র্য হ্রাসের যে ধারাবাহিকতা ছিল, তা এখন ভেঙে পড়েছে। দারিদ্র্যের হার বেড়ে প্রায় ২১ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে। এই পরিবর্তন কি হঠাৎ ঘটেছে? না। এটি ধীরে ধীরে জমে ওঠা এক বাস্তবতা। মানুষের আয় যখন স্থির থাকে বা কমে, তখন তারা শুধু খরচই কমায় না, এর প্রভাবে তাদের স্বপ্নও ছোট হয়ে আসে। আর স্বপ্নের পরিধি সংকুচিত হলে অর্থনীতির দিগন্তও ছোট হতে বাধ্য।

এই চিত্রকে আরও জটিল করে তুলেছে বৈষম্য। জিনি সহগ (Gini Coefficient) প্রায় ০.৫-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। দেশের মোট আয়ের বড় অংশ এখন একটি ছোট একটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে অর্থনীতির ভেতরে এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একদিকে আলো, অন্যদিকে দীর্ঘ ছায়া। সবচেয়ে বড় চাপটি পড়ছে মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর, যারা দীর্ঘদিন অর্থনীতির চাহিদার মূল চালিকাশক্তি ছিল। এখন সেই শ্রেণি নিজেই টিকে থাকার হিসাব কষছে।

প্রবৃদ্ধি থাকলেও কর্মসংস্থান সেই অনুপাতে বাড়েনি। ২০০০ সালে দেশের এমপ্লয়মেন্ট ইলাস্টিসিটি ছিল ১.১১। অর্থাৎ অর্থনীতির যতটা প্রবৃদ্ধি ঘটত, কর্মসংস্থান তার চেয়েও দ্রুত বাড়ত। প্রবৃদ্ধির প্রতিটি ধাপে নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হতো, মানুষের জীবনে জাগত সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই সম্পর্ক ক্রমেই ক্ষীণ হয়েছে।

২০২৪ সালে এসে এমপ্লয়মেন্ট ইলাস্টিসিটি নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ০.১২-তে। অর্থনীতির আকার বেড়েছে, জিডিপির অঙ্ক ফুলে উঠেছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। ফলে উন্নয়নের বাহ্যিক জৌলুসের আড়ালে জমে উঠেছে এক গভীর কাঠামোগত সংকট, যেখানে প্রবৃদ্ধির সুফল আর কর্মজীবী মানুষের বাস্তবতার মধ্যে তৈরি হয়েছে বিস্তর দূরত্ব। যারা কাজ পেয়েছে, তাদের বড় অংশই কম উৎপাদনশীল খাতে—বিশেষ করে কৃষিতে। অথচ শিল্প খাত বেড়েছে, কিন্তু সেখানে কর্মসংস্থান বাড়েনি বরং কমেছে। সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারত যে এসএমই খাত, সেই খাত উপেক্ষিতই থেকে গেছে। অর্থনীতি বেড়েছে ওপরের দিকে, কিন্তু তার শিকড় মাটির ভেতর ততটা গভীর হয়নি। এ কারণে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকেও আমরা কাজে লাগাতে পারছি না।

এই প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানেই দেখা যাচ্ছে গভীর আস্থার সংকট। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে ভয়াবহভাবে, যেখানে সরকারি খাতে ঋণ দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র অর্থনীতিতে বেশি জায়গা নিচ্ছে, কিন্তু বেসরকারি খাত পিছিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগের এই স্থবিরতা কর্মসংস্থান ও উৎপাদন উভয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। অর্থনীতির চাকা ঘুরছে, কিন্তু তার গতি ভীষণ শ্লথ।

এই আস্থাহীনতার কেন্দ্রে রয়েছে ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। পুনঃতফসিলের পরও এটি ৩০ শতাংশের ওপরে। তার মানে এটি শুধু একটি আর্থিক সমস্যা নয় বরং কাঠামোগত সংকট। ব্যাংকের মূল কাজ হলো সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তর করা। কিন্তু যখন ঋণ ফেরত আসে না, তখন সেই প্রবাহে স্থবিরতা জমে। এ অনেকটা রক্তনালিতে জমে থাকা বিষের মতো, যা ধীরে ধীরে পুরো শরীরকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে সুদহার কমানোর দাবি স্বাভাবিকভাবেই উঠছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মূল্যস্ফীতি যখন উচ্চ, তখন সুদহার কমানো ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বজুড়েই দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়ানো একটি কার্যকর পদ্ধতি। বাংলাদেশও সেই পথেই আছে, যদিও কিছুটা দেরিতে। এখন তাড়াহুড়ো করে সুদহার কমানো হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। তাতে কেবল আগুনের সামনে বাতাসই জুড়ে দেওয়া হবে।

সরকারের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব। কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা প্রয়োজনীয় মাত্রার অর্ধেকেরও কম। অথচ ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা, ব্যাংক খাতের দায়, অবকাঠামো বিনিয়োগ সব মিলিয়ে ব্যয়ের চাপ বেড়েই চলেছে। নতুন করে যোগ হচ্ছে সরকারের নানান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতেই  প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট যেন ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল অট্টালিকা, যার ভিত্তি এখনো দুর্বল রাজস্ব কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা অর্জনে প্রয়োজন প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি—এক কঠিন ও প্রায় অসম্ভব চ্যালেঞ্জ। তাই উন্নয়নের বিশাল এডিপি আর ব্যয়ের ভার সামলাতে রাষ্ট্রকে ক্রমেই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে ঋণের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া মানে বাজারে নতুন টাকা প্রবেশ, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। আবার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের জোগান কমে যায়। আর বিদেশি ঋণ নেওয়ার অর্থ হবে ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখা। ফলে অর্থনীতি চাপের চক্রেই আটকে পড়ে। তাই বাজেটে সংখ্যার বাহারি বিস্তার আছে, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে ধার-কর্জনির্ভর এক অনিশ্চিত অর্থনীতির দীর্ঘ ছায়া।

এই চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে জ্বালানি খাত। বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকট মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সরকার জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা, ডিজেল ১১৫ টাকা। এতে ভর্তুকির চাপ কমলেও মানুষের খরচ বেড়েছে এবং বাজারে মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এক জায়গার ভার কমাতে গিয়ে অন্য জায়গায় চাপ বাড়ছে।

তবে এই সংকটের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, রপ্তানি কিছুটা পুনরুদ্ধারের পথে। অর্থাৎ অর্থনীতির ভেতরের সক্ষমতা এখনো পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু এই সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হলে আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। যে আস্থা ছাড়া কোনো অর্থনীতি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে না।

এই আস্থার কেন্দ্রেই রয়েছে ব্যাংক খাতের সংস্কার। রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, তদারকি জোরদার করা, খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। এসব ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমাধান সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক জটিল সমীকরণের মধ্যে রয়েছে। এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত কোনো না কোনো খাতে প্রতিধ্বনি তোলে। মূল্যস্ফীতি কমাতে গিয়ে কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সুদহার কমালে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, রাজস্ব না বাড়ালে প্রতিশ্রুতি ভেঙে পড়তে পারে।

এ কারণেই বর্তমান সময় শুধু অর্থনৈতিক নয়, নীতিগত পরিপক্বতারও পরীক্ষা। দ্রুত ফল লাভের আশার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। কারণ ভুল পথে দ্রুত এগোনোর চেয়ে ধীরে হলেও সঠিক পথে থাকা বেশি নিরাপদ।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো ভাসমান। কিন্তু সামনে যে সাগর, তা জটিল ও গভীর। এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে স্থিতি, গতি নয়। এই জাহাজ যদি ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে, তবেই একদিন শান্ত জলের দেখা মিলবে। আর তখনই লেখা যাবে এক নতুন এক গল্প, যা শুধু সংখ্যার নয়, মানুষেরও।

লেখক : ব্যাংকার ও কথাসাহিত্যিক