পটচিত্রের কথা দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলার পটুয়া সম্প্রদায়ে হিন্দু আছে, মুসলিম আছে, কিন্তু তারা যে স্ক্রলচিত্র আঁকে, সেখানে কি কোনো ধর্মীয় বিভাজন উদ্ধার করা সম্ভব? একই স্ক্রলে কৃষ্ণের রাসলীলা, গাজী পীরের বাঘ, কারবালার যুদ্ধ। একই হাতে, একই রেখায়। পটুয়া কখনো জিজ্ঞেস করেন না, এটা হিন্দুর ছবি নাকি মুসলমানের। বৌদ্ধ যুগ থেকে হিন্দু আমল, মুসলিম আমল থেকে ঔপনিবেশিক কাল—ধর্ম বদলেছে, রাষ্ট্র বদলেছে, কিন্তু স্ক্রলচিত্রের ভাষা বদলায়নি।
এই ভাষার কোনো নাম নেই। কোনো তত্ত্ব তাকে ধারণ করে না। কোনো একাডেমি তাকে স্বীকৃতি দেয়নি। সে আগে থেকেই ছিল। রাষ্ট্রের আগে, জাতীয়তাবাদের আগে এবং আমাদের ফাইন আর্টের প্রশ্নের আগে।
বিশ শতকে দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পকলার সবচেয়ে বড় বিতর্কটা ছিল এইখানে। আধুনিকতার সঙ্গে লোকালিটির সম্পর্ক কী হবে? অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বেঙ্গল স্কুল ধারা’ ইউরোপীয় একাডেমিক ধারাকে প্রত্যাখ্যান করে মুঘল মিনিয়েচার ও অজন্তার দিকে ফিরল। একটা ‘খাঁটি’ ভারতীয় শিল্পের স্বপ্ন দেখল। পরে যামিনী রায় গেলেন আরও নিচে, বাংলার গ্রামীণ পটশিল্পে, কালিঘাটের রেখায়। কিন্তু এই প্রতিটি ফেরার মধ্যে একটা সমস্যা ছিল, এরা সবাই লোকশিল্পকে একটা ‘উদ্দেশ্যে’ ব্যবহার করছিলেন। জাতীয় পরিচয় নির্মাণের জন্য বা ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য লোকশিল্প হয়ে উঠছিল হাতিয়ার।
১৯৪৭-এর পরে এই বিতর্ক একটা নতুন জায়গায় এসে দাঁড়াল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, ঢাকায়, একটা আলাদা চারুকলা প্রতিষ্ঠান তৈরি হলো। নতুন রাষ্ট্রে, নতুন চাপে, নতুন প্রশ্ন নিয়ে। কিন্তু এই প্রশ্নটা ভারতের আলোচনায় কখনো ঢোকেনি। ‘বেঙ্গল স্কুল বা নব্যবঙ্গীয় ধারা’ বা যামিনী রায়ের উত্তরসূরিরা যে বিতর্ক চালিয়ে গেছেন, সেখানে ঢাকার শিল্পীরা অনুপস্থিত। এবং ঢাকার শিল্পীদের যে বিতর্ক, সেখানে কলকাতার প্রশ্নগুলো আর প্রাসঙ্গিক না।
ঢাকার পরিস্থিতিটাই আলাদা ছিল। পাকিস্তানি ইসলামিক সাংস্কৃতিক ধারা, যেখানে ক্যালিগ্রাফি ও বিমূর্ততা প্রধান, সেটা নেওয়া হয়নি। বেঙ্গল স্কুলের হিন্দু ভাববাদও নেওয়া হয়নি। দুদিককে প্রত্যাখ্যান করে, একটা শূন্যতার মধ্যে দাঁড়িয়ে, বাংলার মাটি-নদী-মানুষকে সামনে রেখে একটা ভাষা তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সেই চেষ্টার মধ্যে একটা দোটানা সবসময় ছিল।
আর্ট স্কুলের ভাষা আর লোকশিল্পের ভাষা, দুটো কখনো সত্যিকার অর্থে মেলেনি। মেলানোর চেষ্টা হয়েছে, মেলানোর ভিন্ন ভিন্ন পথ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রতিটি পথেই শেষ পর্যন্ত একটা গরমিল থেকে গেছে।
২.
১৯৪৮ সালে ঢাকায় চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার আগে এই অঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার কোনো ইতিহাস ছিল না বললেই চলে। দক্ষিণ ভারত এবং কলকাতায় যেই অর্থে ছিল। সেখানে উনিশ শতক থেকে গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুল, অবনীন্দ্রনাথের বেঙ্গল স্কুল ধারা, শান্তিনিকেতনে নন্দলাল বসুর লোকশিল্পমুখী চর্চা, আর যামিনী রায়ের কালিঘাটের রেখায় ফেরা, এই পুরো বিতর্কটা পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক। ঢাকা সেই বিতর্কের বাইরে।
তারপর ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলো। কলকাতা থেকে একদল শিল্পী এলেন ঢাকায়। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান প্রমুখ। তারা সবাই কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে পড়েছেন বা পড়িয়েছেন। তারা এমন একটা শহরে এসে দাঁড়ালেন যেখানে শিল্পচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা এখনো তৈরি হয়নি।
এই অপ্রস্তুততার মধ্যে একটা সম্ভাবনা ছিল এবং একটা সংকটও। কলকাতার বেঙ্গল স্কুল বা নব্যবঙ্গীয় ধারা যে ‘ভারতীয়’ ভাষা তৈরি করেছিল, সেটা মুঘল মিনিয়েচার আর অজন্তার মিশ্রণে, হিন্দু পৌরাণিক বিষয়বস্তুতে, সেটা এই অঞ্চলে নেওয়া যায় না, নেওয়া হয়ওনি। অন্যদিকে ইউরোপীয় একাডেমিক স্টাইল, যেটা কলকাতা আর্ট স্কুলে পড়ানো হতো, প্রচেষ্টা ছিল সেটা থেকে নিয়ে আলাদা কিছু তৈরি করা। এই প্রচেষ্টা জয়নুল আবেদিনের মধ্যে শুরু থেকেই ছিল।
জয়নুল আবেদিন লন্ডনের স্লেড স্কুল থেকে ফিরে একটা নতুন পথে হাঁটার চেষ্টা করলেন। লোকশিল্পের জ্যামিতিক ফর্ম, প্রাথমিক রঙ, পারস্পেকটিভের অনুপস্থিতি, এই নিয়ে তার একটা ‘বাংলা স্টাইল’ দাঁড় করানোর চেষ্টা। তার সেই সময়ের কাজ, ‘দুই নারী’, ‘প্রসাধন’, ‘পাইন্যার মা’—এই ছবিগুলোতে লোকশিল্পের সরলতা আছে, কিন্তু একই সঙ্গে আছে একজন আধুনিক শিল্পীর সচেতন দৃষ্টি।
কিন্তু এই পথে বেশিদূর যাওয়া গেল না। লোকশিল্পের নিজস্ব সীমা আছে। সেটা ফ্ল্যাট, দ্বিমাত্রিক, আলো-ছায়াহীন। সেই সীমার মধ্যে বাস্তব জীবনের গতি ও যন্ত্রণা ধরা যায় না। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের যে স্কেচগুলো জয়নুল করেছিলেন, সেগুলোতে লোকশিল্পের ভাষা নেই। সেখানে আছে এক্সপ্রেশনিস্ট রেখার তীব্রতা, মৃত্যুর সামনে দাঁড়ানো একজন মানুষের সরাসরি দৃষ্টি।
জয়নুল শেষ পর্যন্ত দুটো কাজ করলেন। গ্রামীণ বাস্তবতায় ফিরে গেলেন নিজের ছবিতে এবং আলাদাভাবে ১৯৭৫ সালে সোনারগাঁওয়ে লোকশিল্প মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করলেন। দুটো কাজ আলাদা থাকল, একটা তার ক্যানভাসে, আরেকটা ক্যানভাসের বাইরে। দুটো কখনো একই জায়গায় এলো না।
পাশাপাশি আরেকটা চাপ ছিল, যেটা কম আলোচিত। পাকিস্তান আমলে ফিগারেটিভ শিল্পকে ধর্মবিরোধী মনে করা হতো। ফলে পঞ্চাশের দশকে অনেক শিল্পী বিমূর্ততার দিকে গেলেন। শুধু নান্দনিক কারণে না, রাজনৈতিকভাবেও বিমূর্ততা ছিল নিরাপদ। মোহাম্মদ কিবরিয়া, আবদুর রাজ্জাকদের বিমূর্ত কাজের পেছনে শুধু জাপান বা ইউরোপের প্রভাব নয়, এই রাজনৈতিক বাস্তবতাও আছে। বাংলার শিল্পের ভাষা খোঁজার পথে রাষ্ট্র নিজেও একটা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
১৯৭১-এর পরে স্বাধীন বাংলাদেশে সেই বাধা সরে গেল। কিন্তু নতুন প্রশ্ন এলো, স্বাধীন বাংলাদেশের শিল্পের ভাষা কী হবে? জাতীয়তাবাদী উদযাপন? মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি? নাকি এর বাইরের কিছু? এই প্রশ্নের তিনটি ভিন্ন উত্তর দিলেন তিনজন শিল্পী। হয়তো তিনটি উত্তরই অসম্পূর্ণ, কিন্তু সৎ।
৩.
কামরুল হাসান নিজেকে পরিচয় করালেন ‘পটুয়া’ হিসেবে। এই উপাধিটা শুধু সম্মানের না, অবস্থানেরও। পটুয়া মানে যিনি পটে আঁকেন, লোকশিল্পের মানুষ। কিন্তু কামরুল ছিলেন আর্ট স্কুলের, কলকাতায় পড়েছেন, ইউরোপীয় একাডেমিক ধারা জানেন। দুটো পরিচয় একসঙ্গে, এইটাই তার অবস্থানের জটিলতা।
তার কাজে লোকশিল্পের ভাষা আছে। সরল রেখা, বোল্ড আউটলাইন, ফ্ল্যাট রঙ, দ্বিমাত্রিক ফিগার। কিন্তু সেই ভাষাকে তিনি একটা কাজে লাগালেন যেটা লোকশিল্প কখনো করেনি, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আঁকলেন ইয়াহিয়া খানকে। পটুয়ার ভাষায়, কিন্তু বিষয়বস্তু ছিল দানব, গণহত্যার হোতা।
এইটা লোকশিল্পের রাজনৈতিক রূপান্তর। যে ভাষা গাজী পীরের বাঘ আঁকে, কৃষ্ণের রাসলীলা আঁকে, সেই ভাষাকে আধুনিক রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো। এটা যামিনী রায়ের ‘লোকাল থেকে ন্যাশনাল’ করার চেষ্টার সাথে মিলে যায়। কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। যামিনী রায় লোকশিল্পকে আদর্শ ভারতীয়তার প্রতীক বানিয়েছিলেন, কিছুটা নস্টালজিয়া, কিছুটা ন্যাশনালিজম, এসব মিলিয়ে। কামরুলের হাতে সেই ভাষা হয়ে উঠল তাৎক্ষণিক, ক্ষুরধার এবং সমসাময়িক।
প্রশ্ন হলো, লোকশিল্পকে জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের ভেতরে নিয়ে গেলে তার নিজস্বতা কতটুকু থাকে? কামরুল শুধু ছবিই আঁকেননি, বিসিকের ডিজাইন সেন্টার চালিয়েছেন দুই দশক, কারিগর ও শিল্পীর মধ্যে সেতু হওয়ার চেষ্টা করেছেন। জাতীয় পতাকার চূড়ান্ত ডিজাইন করেছেন, বিমানের বলাকা লোগো করেছেন। লোকশিল্পের মোটিফ উঠে এসেছে রাষ্ট্রের প্রতীকে। এসবই গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, কিন্তু একই সাথে প্রশ্নও, লোকশিল্প যখন রাষ্ট্রের ভাষা হয়ে যায়, তখন কি তা আর লোকের থাকে?
এস এম সুলতান এই প্রশ্নের ভিন্ন উত্তর দিয়েছিলেন। সুলতান কলকাতায় কিছুদিন পড়েছেন, আমেরিকায় গেছেন, ইউরোপ দেখেছেন। তার প্রথম দিকের কাজে ইমপ্রেশনিজমের প্রভাব স্পষ্ট। কিন্তু পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝিতে তিনি নড়াইলে ফিরে গেলেন। তিনি বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রামকে নেননি, গ্রামে বাস করতে শুরু করলেন। নদীর ধারে পরিত্যক্ত বাড়িতে, বিড়াল-কুকুর-সাপ নিয়ে। গাব ফলের রস দিয়ে নিজে ক্যানভাস তৈরি করতেন, স্থানীয় উপাদান থেকে রঙ বানাতেন। তার এই সিদ্ধান্ত নিছক অ্যাস্থেটিক্যাল না। একটা সম্পূর্ণ জীবনদর্শন। আর্ট স্কুল থেকে, শহর থেকে, আন্তর্জাতিক শিল্পজগৎ থেকে, সব কিছু থেকে সরে গিয়ে লোকালিটিতে ফিরে যাওয়া। ছবির উপকরণ পর্যন্ত স্থানীয় করা।
তার ছবিতে যে কৃষকরা আছে, তারা শক্তিশালী ও বলিষ্ঠ, বিশাল, ভূমি-দখলকারী। ‘চরদখল’ ছবিতে কৃষকরা জমি ফিরিয়ে নিচ্ছে, এটা শুধু কৃষকজীবনের ছবি না, একটা পাল্টা ইতিহাসও। ঔপনিবেশিক আমলে, জমিদারি আমলে, যে কৃষককে সবসময় দুর্বল ও অসহায় হিসেবে দেখানো হয়েছে, সুলতানের ছবিতে সেই কৃষক বিশাল, শক্তিশালী, জমির মালিক।
তারেক মাসুদ যখন তাকে নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি করতে গেলেন সুলতান একটাই শর্ত দিয়েছিলেন, ছবির প্রধান চরিত্র হবে বাংলার কৃষক, সুলতান নিজে নয়। এইটুকুতেই তার পুরো দর্শনটা বোঝা যায়।
কিন্তু সুলতানের পথেও একটা প্রশ্ন থাকে। তিনি লোকশিল্পকে নেননি, লোকালিটিতে গেছেন সরাসরি। কিন্তু তার ক্যানভাস, তার তেলরঙ, তার কম্পোজিশন—এগুলো ইউরোপীয় ঐতিহ্যের। সুলতান ইউরোপীয় শিল্পের শরীর ব্যবহার করে বাংলার আত্মার কথা বলেছেন। এই দুটো কি আলাদা রাখা যায়? তার নিজের উত্তর ছিল, হ্যাঁ যায়। কারণ উপকরণ স্থানীয় হলে, জীবন স্থানীয় হলে, শিল্পও স্থানীয় হয়ে যায়।
এই তিনটি পথ—জয়নুলের লোকশিল্পকে নিয়ে এগোনো ও পরে আলাদা রাখা, কামরুলের লোকশিল্পকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো, সুলতানের লোকালিটিতে সরাসরি ফিরে যাওয়া, তিনটিই আলাদা উত্তর, কিন্তু তিনটিতেই একটা মিল আছে। তিনজনই বুঝেছিলেন যে আর্ট স্কুলের ভাষা একা যথেষ্ট নয়। বাংলার শিল্পের ‘বাংলা’টা শুধু টেকনিকে নেই, সাবজেক্টে নেই। সে আরও কোথাও, আরও গভীরে। সেই গভীরের দিকে যেতে গেলে আর্ট স্কুল ছেড়ে যেতে হয়। আর আর্ট স্কুল ছেড়ে গেলে, সেই ভাষা কি আর ‘ফাইন আর্ট’ থাকে, নাকি অন্য কিছু হয়ে যায়?
৪.
নকশিকাঁথার কথা বলা যাক। পুরনো শাড়ি, ধুতি, লুঙ্গি ব্যবহার করা কাপড়ের কয়েকটা স্তর একসাথে রেখে সুই-সুতা দিয়ে জুড়ে দেওয়া। এটাই কাঁথা। কিন্তু কাঁথা যখন নকশিকাঁথা হয়, তখন সেই সেলাইয়ের ভেতরে ঢোকে গল্প। পদ্মফুল, মাছ, সূর্য, গাছ, পাখি, উৎসবের মিছিল, দেবদেবীর মুখ, প্রেমিকের জন্য অপেক্ষা। একটা কাঁথা তৈরি করতে কয়েক মাস, কখনো বছরখানেক সময় লেগে যায়। সেই সময়ের প্রতিটি সন্ধ্যা, প্রতিটি অবসর, একজন নারীর হাত চলছে, সুতা টানছে, নকশা বুনছে।
এই শিল্পের সৃষ্টিকর্তারা নামহীন। তাদের কাজ মিউজিয়ামে যায়নি, গ্যালারিতে ঝোলেনি, কোনো আর্ট ক্রিটিক তাদের নিয়ে লেখেননি। তারা জানতেনই না যে তারা ‘শিল্প’ করছেন। তারা করছিলেন যা করতে হয়। ভাঙা কাপড় জুড়ে দিতে হয়, সেটা সুন্দর করে জুড়ে দেওয়া যায়, তাহলে সুন্দর করেই জুড়ে দাও। এই ‘সুন্দর করে’ করার ভেতরেই শিল্পের পুরো প্রশ্নটা লুকিয়ে আছে।
নকশিকাঁথার মোটিফে তিনটি ধর্মের চিহ্ন আছে। হিন্দুধর্মের পদ্ম ও মৎস্য, বৌদ্ধধর্মের চক্র, ইসলামের বিমূর্ত জ্যামিতি। কোনো একটা মোটিফ কোথা থেকে এসেছে, কোন ধর্মের, এই প্রশ্ন নকশিকাঁথার জগতে অর্থহীন। সেখানে শুধু আছে ‘এই নকশাটা সুন্দর’, ‘এটা এখানে বসলে মানায়’। বেঙ্গল স্কুল যে ‘খাঁটি ভারতীয়তা’ খুঁজছিল, তার সাথে নকশিকাঁথার কোনো সম্পর্ক নেই। জাতীয়তাবাদ যে পরিচয় নির্মাণ করতে চাইছিল, তার সাথেও নেই। নকশিকাঁথা সেই আলোচনায় ছিলই না।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় অনেক নারী শুধু একটা কাঁথা বুকে নিয়ে পালিয়েছিলেন। সেই কাঁথায় ছিল হারিয়ে যাওয়া বাড়ির স্মৃতি। উঠানের গাছ, পুকুরের পাড়, বিয়ের দিনের মিছিল। যখন রাষ্ট্র ভাগ হচ্ছিল, পরিচয় ভাগ হচ্ছিল, ইতিহাস ভাগ হচ্ছিল, তখন একটা কাঁথায় ব্যক্তিগত স্মৃতি অক্ষত ছিল। ফাইন আর্ট যখন জাতীয়তাবাদ নির্মাণে ব্যস্ত, নকশিকাঁথা তখন ব্যক্তিগত শোকের ধারক।
জসীমউদ্দীনের নকশিকাঁথার মাঠ-এ সাজু তার স্বামীর সাথে যৌথ স্মৃতি বুনে চলে কাঁথায়। স্বামী ফেরে না। কাঁথাটা শেষ পর্যন্ত স্মৃতির ধারক হয়ে থাকে, প্রেমের নয়, শোকের।
পটচিত্রের কথাও এখানে আসে। পটুয়া ছবি আঁকেন, গান করেন, স্ক্রল খোলেন। এই শিল্প কখনো জীবন থেকে আলাদা হয়ে গ্যালারিতে যায়নি, যাওয়ার কথাও ভাবেনি। সে জন্মেছিল গ্রামের আসরে, মাঠে, উঠানে এবং সেখানেই থেকেছে।
এই শিল্পে কোনো একক সৃষ্টিকর্তা নেই। একটা পরিবার এই কাজ করে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বাবার হাতের রেখা ছেলের হাতে চলে আসে। এই ধারাবাহিকতা আর্ট স্কুলের ধারাবাহিকতার মতো না। এটা জীবিকার ধারাবাহিকতা, পরিবারের ধারাবাহিকতা। শিল্পের ভাষা এখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে আসে না, আসে হাতের কাজ দেখে, পাশে বসে শিখে।
এই দুটো ধারা একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে। ফাইন আর্ট এবং লোকশিল্পের মাঝখানে যে প্রশ্নটা নিয়ে জয়নুল সারাজীবন দ্বিধায় ছিলেন, সুলতান যার উত্তরে গ্রামে ফিরে গেলেন, কামরুল যার উত্তরে লোকশিল্পকে রাজনৈতিক করলেন, সেই প্রশ্নটা নকশিকাঁথা বা পটচিত্রের কাছে কখনো আসেনি। তারা জানে না তারা ‘আর্ট’ কি না, ‘আধুনিক’ কি না। সেই প্রশ্ন করার অবস্থানে তারা কখনো ছিল না এবং সেই কারণেই হয়তো টিকে আছে। রাষ্ট্র বদলেছে, ধর্ম বদলেছে, কাঁথার সেলাই চলছে, স্ক্রলের রেখা চলছে।
আর্ট স্কুলে যে প্রশ্নটা নিয়ে দশকের পর দশক কাটানো হয়েছে, তার উত্তর হয়তো আর্ট স্কুলের বাইরে সবসময়ই ছিল। একটা পুরনো কাঁথায়, একজন নামহীন নারীর হাতে।
৫.
রিকশার পেছনে আঁকা ছবির কথা দিয়ে শেষ করা যাক। রিকশাচিত্র বাংলাদেশের একটা সম্পূর্ণ নিজস্ব শিল্পধারা। পঞ্চাশের দশকে শুরু, সত্তরের দশকে পরিপক্ব। এটা গ্রামীণ লোকশিল্প না, একেবারেই শহরের শিল্প। আবার আর্ট স্কুলের শিল্প না, রাস্তার শিল্প। সিনেমার নায়িকা, ফুল, পাখি, নদী, জাতীয় নেতার মুখ, সব একসাথে, কোনো শ্রেণিবিন্যাস ছাড়া। কিন্তু রিকশাচিত্রের শিল্পী কখনো জিজ্ঞেস করেননি, এটা কি ‘আসল’ শিল্প? তিনি এঁকেছেন কারণ রিকশার পেছনটা ফাঁকা ছিল।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের অনেক ‘ফাইন আর্টিস্ট’ হঠাৎ রিকশাচিত্রের দিকে তাকালেন। বুঝলেন এখানে একটা ভাষা আছে যেটা তারা কখনো শেখেননি। তখন থেকে গ্যালারিতে রিকশাচিত্রের মোটিফ ঢুকতে শুরু করল, পাঠ্যবইয়ে ঢুকল, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে ঢুকল। কিন্তু রিকশার পেছনের ছবি ততদিনে কমে আসছে। রিকশাওয়ালা এখন সস্তা স্টিকার লাগান, রঙ করার সময় নেই। যে ভাষাটা গ্যালারিতে পৌঁছাল, সেটা রাস্তা থেকে উঠে যাচ্ছে।
এই ঘটনাটাই বাংলাদেশের ফাইন আর্টস ও লোকশিল্পের সম্পর্কের একটা সারসংক্ষেপ। লোকশিল্প যখন ফাইন আর্টের দৃষ্টিতে পড়ে, তখন সে স্বীকৃতি পায়। তবে সেই স্বীকৃতির মুহূর্তে সে তার মাটি থেকে উঠে আসছে। গ্যালারির দেয়ালে পৌঁছানো মানে রাস্তা থেকেও সরে যাওয়া।
বাংলাদেশের ফাইন আর্টস এখনো এই অসম্পূর্ণতার ভেতরে আছে। আর্ট স্কুলের ভাষা পরিশীলিত হয়েছে, আন্তর্জাতিক সংলাপে যুক্ত হয়েছে, বিশ্বের বড় প্রদর্শনীতে জায়গা পাচ্ছে। একই সময়ে পটুয়ারা শহরে এসে দিনমজুরি করছেন, কারণ গ্রামে কেউ আর পটের গান শুনতে বসে না। নকশিকাঁথার কারিগররা বিদেশি ক্রেতার রুচি অনুযায়ী নকশা বদলাচ্ছেন। লোকশিল্প যখন বাজারে যায়, তখন সে টিকে থাকে, কিন্তু নিজের শর্তে আর থাকে না।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্নটা আরও জটিল হয়ে পড়ে। লোকশিল্পকে যদি বাজার গ্রাস করে, আর ফাইন আর্ট যদি আন্তর্জাতিক সংলাপে মিলিয়ে যায়, তাহলে বাংলার শিল্পের ‘বাংলা’টা কোথায় থাকে? জাতীয়তাবাদ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি, আর্ট স্কুল পারেনি, বাজারও পারবে না।
বাংলার শিল্পের ‘বাংলা’টা হয়তো কোনো একটা জায়গায় স্থির নয়। সে আছে এই টানের ভেতরে। আর্ট স্কুল ও পটুয়ার স্ক্রলের মাঝখানে, নামকরা শিল্পীর ক্যানভাস ও নামহীন নারীর কাঁথার মাঝখানে। সেই টানটা এখনো চলছে।
লেখক : শিল্পী, শিক্ষক ও গবেষক