“যত বই তত প্রাণ”

নিউ ইয়র্কে শুরু হলো উত্তর আমেরিকার বৃহত্তম বাংলা বইমেলা

উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক আয়োজন ‘৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ২০২৬’ উৎসবমুখর পরিবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। শুক্রবার (২২ মে) নিউইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে চার দিনব্যাপী এই মেলার উদ্বোধন করা হয়। আগামীকাল সোমবার (২৫ মে) পর্যন্ত চলবে প্রবাসী বাঙালিদের প্রাণের এই মিলনমেলা। এবারের মেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- “যত বই তত প্রাণ।”

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা আমেরিকায় একটি দৃশ্যমান জাতিগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে; আগামী ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা এদেশের সমাজ-সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠবে।’

১৯৭১ সালের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকায় তার প্রথম সফরের সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিচিতিই ছিল তার প্রধান সম্বল। আজকের প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং এ নিয়ে বিতর্কের অবসানের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সঠিক ইতিহাসচর্চার মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের বহু বিতর্কিত বিষয়ে ঐকমত্যের প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অনুষ্ঠানে রেহমান সোবহানকে ‘মুক্তধারা সুকৃতজ্ঞ সম্মাননা’ ও আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মাননা পর্বে উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে তাঁকে করতালি ও শ্রদ্ধার মাধ্যমে সম্মান জানান।

উদ্বোধনী মঞ্চের বিশেষ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, তাদের প্রজন্মের কাছে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের ধারণা ছিল ভিত্তিমূলের মতো দৃঢ়। তবে বর্তমান বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের একটি অংশকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন জানাতে দেখা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। রেহমান সোবহান ও রওনক জাহানের এই বিশেষ আলোচনা পর্বটি সঞ্চালনা করেন বইমেলার আহ্বায়ক ড. নজরুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধক বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, বাংলা গ্রন্থ অনুবাদের একটি বড় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। নিউ ইয়র্ক বইমেলায় বাংলাদেশের খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণের স্মৃতিচারণও করেন তিনি।

এর আগে, অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ এবং বিশ্বজিত সাহা। তাঁরা বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিশ্বায়নে এই বইমেলার ঐতিহাসিক ভূমিকা তুলে ধরেন। ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ জানান, বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা ও বই পড়ার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়াই এবারের বইমেলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বজিত সাহাকে দেওয়া বিশেষ সম্মাননা পর্ব। অনুষ্ঠানে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন সৃষ্টি এবং উত্তর আমেরিকায় বাঙালির প্রাণের উৎসব এই আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা প্রচলনে তার ঐতিহাসিক অবদান তুলে ধরে একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। এতে দেখানো হয়, কীভাবে ১৯৯২ সালে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে, অত্যন্ত সীমিত পরিসরে বিশ্বজিত সাহা নিউ ইয়র্কে এই বইমেলার বীজ বপন করেছিলেন। প্রবাসে বাংলা বইয়ের সহজলভ্যতা যখন কঠিন ছিল, তখন তিনি নিউ ইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটিকে বইয়ের ছায়াতলে এক সুতোয় গাঁথার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে ছড়িয়ে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে দেশীয় ঐতিহ্যের চেতনা টিকিয়ে রাখার পেছনে তার এই দীর্ঘ ও নিরলস পথচলাকে সম্মান জানিয়ে অনুষ্ঠানে তাকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। স্বাগত বক্তব্যে বিশ্বজিত সাহা বইমেলার দীর্ঘ পথচলার স্মৃতিচারণ করে বলেন, এই মেলা কেবল বই বিক্রির জায়গা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের এক হওয়ার মঞ্চ। তথ্যচিত্র প্রদর্শনী ও সম্মাননা প্রদানের সময় মেলা প্রাঙ্গণে উপস্থিত দেশ-বিদেশের লেখক, কবি ও অগণিত পাঠক দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে এই সাংস্কৃতিক সংগঠককে অভিনন্দন জানান।

শুক্রবার বিকেল থেকেই বইপ্রেমী, লেখক, পাঠক, শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ। মে দিবসের দীর্ঘ ছুটির উইকএন্ডে রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সন্ধ্যা নামার আগেই মেলা প্রাঙ্গণ উপচে পড়া ভিড়ে পরিণত হয়। দেশীয় পোশাকে সজ্জিত প্রবাসী বাঙালিরা পরিবার-পরিজন নিয়ে বইকে কেন্দ্র করে এক অনন্য মিলনমেলায় অংশ নেন।

দর্শনার্থীদের অনেকেই মন্তব্য করেন, নিউ ইয়র্কে বইকে কেন্দ্র করে এমন প্রাণবন্ত, আবেগঘন এবং বৃহৎ আয়োজন অন্য কোনো প্রবাসী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না। ১৯৯২ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে যাত্রা শুরু করা এই বইমেলা তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষাভাষীদের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এটি এখন প্রবাসী বাঙালিদের কাছে বইকে কেন্দ্র করে এক বার্ষিক পুনর্মিলনী। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য- নিউজার্সি, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, ভার্জিনিয়া, পেনসিলভানিয়া, মেরিল্যান্ড, ফ্লোরিডাসহ দূরবর্তী অঞ্চল থেকেও বহু মানুষ এই বইমেলায় যোগ দিয়েছেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরসহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি। প্রাক-উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী ঢোলের বাদ্য এবং রবীন্দ্রসংগীতের মধ্য দিয়ে। উদ্বোধনী দিনে ছিল আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য ও বিশেষ স্মরণানুষ্ঠান। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির তিন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব- মহাশ্বেতা দেবী, আবুল কালাম শামসুদ্দিন এবং তপন রায় চৌধুরী-এর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তাঁদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়।

৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলায় বাংলাদেশ ও কলকাতার বহু খ্যাতিমান প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। প্রথম দিনেই পাঠকদের বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নতুন প্রকাশিত বই, গবেষণাগ্রন্থ, প্রবাসভিত্তিক সাহিত্য, উপন্যাস, স্মৃতিকথা এবং শিশু-কিশোরদের বই।

মেলার প্রথম দিনের প্রাণবন্ত পরিবেশে সন্তোষ প্রকাশ করে অন্যতম শীর্ষ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘অনন্যা’র প্রকাশক মনিরুল হক বলেন, ‘প্রথম দিনই অনেক বই বিক্রি হয়েছে। পাঠকের উপস্থিতিও ছিল প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। প্রবাসে বাংলা বই নিয়ে মানুষের এমন আগ্রহ সত্যিই উৎসাহব্যঞ্জক। নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা এখন শুধু বই বিক্রির আয়োজন নয়, বরং এটি প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও আবেগের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।’

মেলায় অংশগ্রহণকারী উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও প্রতিনিধিরা হলেন- মুক্তধারা ফাউন্ডেশন (নিউ ইয়র্ক), অনন্যা (মনিরুল হক), ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (মাহরুখ মহিউদ্দীন), প্রথমা প্রকাশন (প্রতিনিধি), আহমেদ পাবলিশার্স (মেসবাহউদ্দীন আহমেদ), ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ (জহিরুল আবেদীন জুয়েল), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (তৌফিক ইমরোজ খালিদী), অঙ্কুর প্রকাশনী (মেজবাহ উদ্দিন আহমদ), অন্বয় প্রকাশ (হুমায়ূন কবীর ঢালী), কথাপ্রকাশ (জসিম উদ্দিন), কবি প্রকাশনী (সজল আহমেদ), নালন্দা (রেদওয়ানুর রহমান জুয়েল), বাতিঘর (দিপংকর তালুকদার), গ্রন্থকুঠির (রতন চন্দ্র পাল), জলধি (নাহিদা আশরাফি)।

এবারের চার দিনব্যাপী মেলায় প্রতিদিন থাকছে বই বিক্রি, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, সাহিত্য আলোচনা, কবিতা পাঠ, শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, লেখক-পাঠক আড্ডা এবং প্রবাসী সংস্কৃতি নিয়ে বিশেষ আলোচনা। বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে আগত বহু লেখক, কবি, গবেষক ও শিল্পী এই মেলায় অংশ নিচ্ছেন।

ইমদাদুল হক মিলন, রেহমান সোবহান, রওনক জাহান, ফরিদুর রেজা সাগর, প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী দীপেন ভট্টাচার্য, তৌফিক ইমরোজ খালিদী, সুবোধ সরকার, ফারুক মঈনউদ্দীন, সাদাত হোসাইন, মনিরুল হক, মোস্তফা সারওয়ার, জাফর আহমদ রাশেদ, গৌতম দত্ত, শামস আল মমীন, ফারুক আহমেদ, রোকেয়া হায়দার, ফেরদৌস সাজেদীন, খোরশেদুল ইসলাম, আশরাফ কায়সার, গোলাম ফারুক ভূঁইয়া, রাজু আলাউদ্দিন, সৈয়দ জاکی হোসেন, বিরূপাক্ষ পাল, নজরুল মিন্টু, আশরাফ আহমেদ এবং মহিতোষ তালুকদার তাপস প্রমুখ।

বইয়ের ঘ্রাণ, প্রিয় মুখের হাসি, বাংলা ভাষার আবেগ আর প্রবাসের মাটিতে শিকড়ের টান- সব মিলিয়ে নিউইয়র্কে আবারও প্রমাণ হলো, বাংলা বইয়ের প্রতি প্রবাসীদের ভালোবাসা এখনও অটুট ও প্রাণবন্ত। ‘যত বই তত প্রাণ’- এই উচ্চারণে চার দিনের জন্য যেন প্রবাসের বুকেই গড়ে উঠেছে এক টুকরো বাংলাদেশ।