মাদকের গ্রাস

চাই সামাজিক প্রতিরোধ

একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ঘরে ঘরে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত সাড়ে চার মাসে পল্লবীর শিশু রামিসাসহ ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের অনেকে খুন হয়েছে। কারা ঘটাচ্ছে এসব ঘটনা? রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনার প্রধান আসামি সোহেল একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি। সিলেটের মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন র‌্যাব সদস্য ইমন আচার্য্য। যশোরের তিন বছরের শিশু ধর্ষণচেষ্টার আসামি আলম গাজীও মাদকাসক্ত। দেশের বিভিন্ন স্থানে দলবদ্ধ ধর্ষণ, পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকা-ের ঘটনার অভিযুক্তদের অধিকাংশ মাদকাসক্ত। পুলিশের গোপন জরিপেও উঠে এসেছে এ তথ্য। ইয়াবা ও আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত ব্যক্তি তীব্র উত্তেজনা ও অতিরিক্ত সক্রিয়তার কারণে একই সঙ্গে একাধিক অপরাধ করছে। কেউ ধর্ষণের পর খুন করছে। কেউ ছিনতাইয়ের সময় মানুষ মেরে ফেলছে। আবার কেউ চুরি-ডাকাতি করতে গিয়ে হত্যাকান্ড ঘটাচ্ছে। সামান্য ঘটনায় এক বন্ধু অন্য বন্ধুকে খুন করছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, অপরাধ সংঘটনের এই প্রবণতা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। মাদকাসক্তি অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড় কারণ হয়ে সামনে আসছে।

মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেরা দলবদ্ধ হয়; বিভিন্ন অঘটন ঘটনায়। মাদকচক্রে জড়িত ব্যক্তিরা বিষয়টিকে কেবল নিজের ‘ব্যবসার’ বিষয় হিসেবে দেখলেও তারা সমাজের নৈতিক ভিত্তি ভঙ্গুর করে ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি করছে। মাদকের সর্বব্যাপী বিস্তারের পরিণামে যুবসমাজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বেকারদের মধ্যে মাদকের প্রভাব মারাত্মক। মাদকাসক্তি কেমন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে, এক পুলিশ কর্মকর্তার সস্ত্রীক খুন হওয়ার সঙ্গে তাদের নিজের মাদকাসক্ত কন্যা জড়িত থাকা এর প্রমাণ। রাজধানীসহ দেশের জেলা-উপজেলায় স্থানীয় পর্যায়ে অসংখ্য কিশোর গ্যাং প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অপরাধ করছে, তাদের প্রায় সবাই মাদকে আসক্ত। পুলিশ সদর দপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন সময়ের মামলার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশের অপরাধ জগতের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ঘটনার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে মাদক। কিন্তু কেন অপরাধ ও মাদক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না? হেরোইন, আইস ও ইয়াবাসহ বেশিরভাগ মাদক আসছে সীমান্তের ওপার থেকে। প্রতিবেশী দুই দেশ থেকে আসা মাদক বাংলাদেশ হয়ে অন্য দেশে পাচারের রুট হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে,  সীমান্তবর্তী এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ কিছু সরকারি কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় অনেক নেতা মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। অতীতে ইয়াবাকা-ে কক্সবাজার থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যের নামও আলোচনায় এসেছে। এভাবে ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যুক্ত থাকায় সীমান্তপথে মাদক প্রবেশ এবং সারা দেশে তা ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করা সম্ভব হয় না। 

পুরুষ-নারী ও বয়স নির্বিশেষে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিকদের ধর্ষণ ও হত্যাকা-সহ অপরাধে জড়িয়ে পড়া রোধ করতে মাদকের গ্রাস থেকে সমাজকে উদ্ধার করা দরকার। এ ক্ষেত্রে সরকারকে দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এগোতে হবে। মাদক-সংশ্লিষ্টতা মামলাগুলোর দ্রুত বিচার হতে হবে; দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে সমাজে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছায়। মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতার প্রথম পাঠ হতে হবে পরিবারে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে তা নজর রাখতে হবে। নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি চাকরি এবং বিশেষায়িত পেশায় নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মিত ‘ডোপ টেস্ট’ বাধ্যতামূলক করতে হবে। সব মিলিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে দেশে সামাজিক ও সামগ্রিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই।