ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে ‘না’ ইরানের

স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান সব পক্ষই এ বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। সম্ভাব্য এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা করবে নাসেই প্রতিশ্রুতি দেবে দেশটি। তাছাড়া ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষ আরও আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাবে। এমনকি তেহরান তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এমনটাই জানিয়েছে। তবে গতকাল রবিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইউরেনিয়ামের মজুদ হস্তান্তরে রাজি নয় ইরান। সেখানে দেশটির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, পারমাণবিক ইস্যুটি মূলত চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনার জন্য তুলে রাখা হয়েছে এবং সে কারণেই এটি বর্তমান সমঝোতার অন্তর্ভুক্ত নয়। এ ছাড়া, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার বিষয়ে কোনো ধরনের ঐকমত্য হয়নি।

এই আসন্ন সমঝোতার মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালিী’ আবার সচল হবে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর এই প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এই সমঝোতা একটি পর্যায়ক্রমিক রূপরেখা তৈরি করেছে, যা কয়েক মাসের যুদ্ধের অবসান ঘটাবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের বিষয়ে আগামী ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা করা হবে। যে সব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মতপার্থক্য রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম তেহরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো উত্তর দেননি। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঠিক কীভাবে ইরান এই ইউরেনিয়ামের মজুদ ছেড়ে দেবে, তার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা এই প্রস্তাবে নেই। বরং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আগামী দফার আলোচনার জন্যই এই বিস্তারিত রূপরেখাটি তুলে রাখা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনাকারীরা সম্প্রতি ট্রাম্পের সামনে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদে বোমা হামলার বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা পেশ করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই ইউরেনিয়ামের বেশির ভাগই ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনায় রয়েছে। গত জুনে এই স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছিল, যার ফলে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামগুলো আপাতত মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। আলোচিত বিকল্পগুলোর মধ্যে ইসফাহানে ‘বাঙ্কার-বাস্টিং’ (মাটির গভীরের স্থাপনা ধ্বংসকারী) বোমা দিয়ে হামলা চালিয়ে মাটির নিচের এই মজুদ ধ্বংস করার পরিকল্পনাও ছিল। গত গ্রীষ্মে হামলার পর ইরান যখন ইউরেনিয়ামের এই মজুদে পৌঁছানোর সুযোগ পায়, তখন ট্রাম্প এই মজুদ উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ কমান্ডো অভিযান চালানোর কথা বিবেচনা করেছিলেন। তবে অত্যন্ত বিপজ্জনক এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক প্রাণহানির ঝুঁকি থাকায় শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প এর অনুমোদন দেননি।

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মতে, ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ প্রায় ৯৭০ পাউন্ড ইউরেনিয়ামের মজুদ রয়েছে। ওবামা প্রশাসনের আমলে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানিরা তাদের ইউরেনিয়ামের মজুদ রাশিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিল। এবারও তারা একই কাজ করতে পারেন। এ ছাড়া তারা তাদের এই মজুদের সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমিয়ে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন, যা দিয়ে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব নয়। আগামী কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে শুরু হতে যাওয়া পারমাণবিক আলোচনায় মূলত এই ইউরেনিয়ামের মজুদ এবং ইরানের সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হবে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইরান ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখুক। অন্যদিকে ইরান এর চেয়ে অনেক কম সময়ের জন্য স্থগিতাদেশের প্রস্তাব দিয়েছিল।

খসড়া সমঝোতা স্মারকে ইরানের পক্ষ থেকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা না করার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত করা এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনায় বসার কথাও রয়েছে বলে ওয়াশিংটনের কর্মকর্তা জানিয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে মৌখিকভাবে জানিয়েছে যে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করা এবং পারমাণবিক উপাদান ত্যাগের বিষয়ে কিছুটা ছাড় দিতে প্রস্তুত।