বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্যবিষয়ক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ল্যানসেট’-এর এক নতুন গবেষণায় একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। তাতে বলা হচ্ছে, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত রোগ ইবোলা বা হ্যান্টাভাইরাস নয়; বরং তা হলো নানা ধরনের মানসিক রোগ। সম্প্রতি প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১২০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগেছেন, যা ১৯৯০ সালের তুলনায় ৯৫ শতাংশ বেশি। এই গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি বেড়েছে অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার (উদ্বেগজনিত সমস্যা ) এবং মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (মারাত্মক বিষণœতা )। রোগ দুটি যথাক্রমে ১৫৮ ও ১৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে, এই দুটি রোগই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত মানসিক সমস্যা হিসেবে রূপ নিয়েছে। এ ছাড়া ল্যানসেটের গবেষণায় আরও ১০টি সাধারণ মানসিক রোগ চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এডিএইচডি এবং আইডিআইডি নামের দুটি রোগের হার কিছুটা কমলেও (যথাক্রমে ১.৮% ও ১৬.৪% কমেছে), বাকি রোগগুলো জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। তবে এই বৃদ্ধির প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়েনি। গবেষণার ১২টি রোগের মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। যেমন বিষণœতা, উদ্বেগ, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, অ্যানোরেক্সিয়া বা বুলিমিয়ায় নারীদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। অন্যদিকে, এডিএইচডি, অটিজম বা অবাধ্যতার মতো সমস্যাগুলো পুরুষ বা ছেলেদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। গবেষণায় প্রথমবারের মতো এমন একটি তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের ওপরেই মানসিক রোগের সবচেয়ে বড় চাপটা যাচ্ছে। ২০৪টি দেশ ও অঞ্চলের ওপর এই গবেষণা চালানো হয়। সেখানে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি দেশেই মানসিক রোগীর সংখ্যা বাড়লেও, পশ্চিমা বা উন্নত দেশগুলোতেই এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ‘মানসিক রোগের কারণে হারানো জীবনকাল’-এর একটি মাপকাঠি ব্যবহার করে গবেষকরা দেখেছেন, নেদারল্যান্ডসে প্রতি ১ লাখে প্রায় ৩ হাজার ৫৫৫ জন মানসিক রোগে ভুগছেন, যেখানে ভিয়েতনামে এই হার মাত্র ১ হাজার ৩০২ জন। মাঝারি আয়ের দেশগুলোতে গড়ে প্রতি ১ লাখে প্রায় ১ হাজার ৮৫৩ জন মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগলেও, উন্নত ও ধনী দেশগুলোতে এই হার প্রতি লাখে ২ হাজার ১৮৪ জন!
মানসিক রোগ বাড়ার পেছনের কারণ সম্পর্কে প্রধান গবেষক ড. ডামিয়ান স্যান্টোমাউরো সিএনএনকে বলেন, এর পেছনে অনেকগুলো কারণ জড়িয়ে আছে, যেগুলো আলাদা করে চিহ্নিত করা সত্যিই বেশ কঠিন। তবে তার সহকর্মী ড. রবার্ট ট্রেস্টম্যান একটি মূল কারণের কথা উল্লেখ করে বলেন, মানসিক রোগ নিয়ে মানুষের মনে যে ভয় ছিল তা এখন অনেকটাই কমে গেছে। মানুষ মুখ বুজে কষ্ট সহ্য করার চেয়ে এখন নিজের সমস্যা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। তবে যেখানে ড. ট্রেস্টম্যান এই বৃদ্ধিতে মানুষের সচেতনতাকে বড় করে দেখছেন, সেখানে অনেকেই মনে করেন, মূলত অতিরিক্ত রোগ নির্ণয় বা ‘ওভার-ডায়াগনোসিস’-এর কারণেই এই সংখ্যাটা এত বেশি দেখাচ্ছে। ইংল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় (এনএইচএস) ২০১৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মানসিক রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ২০১৩ সালে সংখ্যাটি ছিল ৪০ লাখের সামান্য কম, যা ২০২৫ সালে বেড়ে প্রায় ৯০ লাখে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে অটিজম এবং এডিএইচডির কারণেই এই সংখ্যা এতটা বেড়েছে বলে মনে করছেন সম্প্রতি পদত্যাগ করা ব্রিটেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং। গত ডিসেম্বরে তিনি অতিরিক্ত মাত্রায় রোগগুলো নির্ণয়ের বিষয়টি নিয়ে একটি সরকারি পর্যালোচনার নির্দেশও দেন তিনি। এ বিষয়ে বিবিসি ৭৫০ জন ব্রিটিশ ডাক্তারের একটি ছোট জরিপ করেছিল। তাদের মধ্যে ৪৪২ জনই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। অন্যদিকে, মাত্র ৮১ জন ডাক্তার মনে করেন যে মানসিক রোগের এখনো আন্ডার-ডায়াগনোসিস বা কম নির্ণয় হচ্ছে।