লক্ষ্মীপুরে ধর্মীয় শিক্ষার বাতিঘর

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জনপদ লক্ষ্মীপুর। মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষে এ জেলার অবস্থান। সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, আর নারিকেল-সুপারির জন্য এ অঞ্চলের রয়েছে বিশেষ খ্যাতি। ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ঐতিহ্যের দিক থেকেও লক্ষ্মীপুর একটি সমৃদ্ধ জেলা। এই মাটিতে জন্ম নিয়েছেন বহু মনীষী, আলেম-ওলামা ও সমাজসংস্কারক, যারা নিজেদের কর্ম ও অবদানের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন। তাদেরই একজন প্রখ্যাত দ্বীনি ব্যক্তিত্ব, সমাজসংস্কারক ও কর্মোদ্যমী আলেম মাওলানা নুরুল হুদা। দ্বীনের খেদমত ও ইসলামি শিক্ষার প্রসারে তার নিরলস প্রচেষ্টা আজ লক্ষ্মীপুরের মানুষের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন।

২০০৩ সালের কথা। তখন লক্ষ্মীপুর জেলার উত্তরাঞ্চলে দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল খুবই কম। বিশেষ করে গ্রামের সাধারণ মানুষ তাদের সন্তানদের জন্য মানসম্পন্ন ইসলামি শিক্ষার সুযোগ সহজে পেতেন না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ধর্মীয় জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল এবং সমাজে দ্বীনি শিক্ষার বড় শূন্যতা তৈরি হচ্ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষদের আশা-ভরসার প্রতীক হয়ে এগিয়ে আসেন মাওলানা নুরুল হুদা। আকাবিরদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি লক্ষ্মীপুর জেলার উত্তরাঞ্চলের দত্তপাড়ায় দেওবন্দি ধরায় প্রতিষ্ঠা করেন আমীরুল মুমিনীন কওমি মাদ্রাসা।

প্রতিষ্ঠানের শুরুটা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। মাত্র চার কাঠা জমির ওপর একটি ছোট কুঁড়ে ঘরে নুরানি মক্তবের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয়। সেই সময় না ছিল পর্যাপ্ত অবকাঠামো, না ছিল আর্থিক সচ্ছলতা। কিন্তু ছিল অদম্য মনোবল, আল্লাহর ওপর দৃঢ় আস্থা এবং দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে এক আন্তরিক স্বপ্ন।

মাওলানা নুরুল হুদার অক্লান্ত পরিশ্রম, দূরদর্শিতা ও ত্যাগের ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ছোট সেই মক্তবটি একটি পূর্ণাঙ্গ কওমি মাদ্রাসায় পরিণত হয়। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, উন্নত হতে থাকে পাঠদান ব্যবস্থা এবং বিস্তৃত হতে থাকে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা এই মাদ্রাসায় ছুটে আসে। দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের আগ্রহে শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো, এখানে এমন যোগ্য ও আদর্শবান মানুষ গড়ে তোলা, যারা দ্বীনি জ্ঞানের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আমীরুল মুমিনীন কওমি মাদ্রাসা তার সুনাম, ঐতিহ্য ও শিক্ষার মান অক্ষুণœ রেখে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগুলোতে অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বারবার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। মেধাতালিকায় স্থান অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যেমন প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে, তেমনি লক্ষ্মীপুর জেলার জন্যও বয়ে এনেছে সম্মান। বর্তমানে এই মাদ্রাসা পুরো দেশে দ্বীনি শিক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। শিক্ষা, আদর্শ ও নৈতিকতার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানটি সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক