জসীম উদ্দীনের কেবিনে কেন গিয়েছিলেন নজরুল

১৯৭৫ সালের আগস্ট মাস। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তখন পিজি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কেবিনে ভর্তি। কবি জসীম উদ্দীনও তখন অসুস্থ হয়ে একই হাসপাতালে ভর্তি। নজরুলের পাশের কেবিনে ছিলেন জসীম উদ্দীন। এর পরের কেবিনে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের খাদ্যমন্ত্রী ফণীভূষণ মজুমদার। নজরুল যে কক্ষে থাকতেন সেই কক্ষটা বেশ অন্ধকার। আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুন একদিন সকালে পিজি হাসপাতালে গেলেন নজরুলের ছবি তুলতে। অনেকক্ষণ কবির কেবিনের সামনে ঘোরাঘুরি করলেন। দেখলেন, আশপাশে কোনো পুলিশ আছে কি না।

এরপর মামুন গেলেন জসীম উদ্দীনের কেবিনে। তার সঙ্গে কাওয়া ব্র্যান্ডের একটি অপ্রচলিত ক্যামেরা। তাতে রিফিল ফিল্ম লোড করা। খাটে শুয়ে আছেন জসীম উদ্দীন। তাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। পরনে পাঞ্জাবি ও চেক লুঙ্গি। মামুনকে তিনি বসতে বললেন। মামুন তখন জসীম উদ্দীনের কয়েকটা ছবি তুললেন। ছবি তুলতে তুলতে মামুন বললেন, ‘আপনার সঙ্গে তো নজরুলের অনেকবার দেখা হয়েছে। আপনাদের দুজনের একসঙ্গে কোনো ছবি আছে?’ জসীম উদ্দীন বললেন, ‘না, নাই। কখনো কেউ তোলে নাই।’ তখন মামুন বললেন, ‘আপনাদের দুজনের একটা ছবি তুলতে চাই।’ জসীম উদ্দীন বললেন, ‘ওই রুমে তো আলো নাই। কেমন করে ছবি তুলবা?’ মামুন বললেন, ‘যে করেই হোক, একটা ছবি তোলা লাগবে। এ জন্যই আজ আসছি।’ মামুনের কথায় পটে গেলেন জসীম উদ্দীন। বললেন, ‘এক কাজ করি। আমি তার রুমে যাই। আমি গেলে তাকে নিয়ে আসতে পারবো।’

জসীম উদ্দীন রওনা হলেন নজরুলের কেবিনের দিকে। তার পেছনে মামুন। কবিকে দেখে নার্সরা দরজা খুলে দিলেন। রুমের ভেতরে এত কম আলো যে, কোনোভাবেই ছবি তোলা সম্ভব হচ্ছে না। সঙ্গে ফ্ল্যাশও নাই যে এই আলোতে ছবি তুলবেন। কবি বিছানায় বসেছিলেন। তার হাতে একটি পত্রিকা। পরনে সাদা হাফ শার্ট ও চেক লুঙ্গি। শার্টের নিচের বোতাম নাই। উপরের বোতাম দুটি কোনোভাবে লাগালেন জসীম উদ্দীন। এই দৃশ্য দেখে নার্সরা একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। জসীম উদ্দীন দরাজ গলায় বললেন, ‘কবিকে আমার রুমে নিয়ে যাচ্ছি। এখনই দিয়ে যাব।’ নার্সরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি পাঁজাকোলা করে কবিকে ধরলেন। মামুন ধরলেন আরেক পাশে। কবির পায়ে স্যান্ডেল পরিয়ে দেওয়া হলো। নজরুল তো শরীরের ভার ধরে রাখতে পারছেন না। তিনি দুজনের শরীরের মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন। দরজা দিয়ে বেরুতেই দেখেন বাইরে বেশ কিছু দর্শনার্থী কবিকে দেখার অপেক্ষায়। অপরিচিত এক দর্শনার্থী এগিয়ে এলেন সাহায্য করতে। তিনজন কবিকে হাঁটিয়ে নিয়ে গেলেন জসীম উদ্দীনের কেবিনে।

জসীম উদ্দীনের কবিনের বারান্দায় একটা ইজি চেয়ার। তার ডানপাশে আরেকটা চেয়ার। চেয়ারটার হাতল ভাঙা। জসীম উদ্দীন এই ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বাইরের দিকটা দেখতেন। ওইদিন আকাশটা ছিল বেশ গুমোট। কেমন যেন উদাস উদাস। রোদ নাই; বৃষ্টি পড়বে পড়বেএরকম ভাব। নজরুলকে ইজি চেয়ারে বসানো হলো। জসীম উদ্দীন বসলেন পাশের চেয়ারে। নজরুল এদিক-ওদিক হেলে পড়ে যাচ্ছিলেন। অপরিচিত লোকটা নজরুলের পিঠে ঠেস দিয়ে ধরে রাখলেন। মামুন ঠাস ঠাস ছবি তুলে যাচ্ছেন। আন্ডার এক্সপোজার হচ্ছে। আউট অব ফোকাস হচ্ছে। তবু ছবি তোলা থামছে না। এত ছবি তোলার পরও জুতসই ছবি পাওয়া   গেল না। মামুনের দরকারদুই কবির একটা অন্তরঙ্গ  মুহূর্তের ছবি। জসীম উদ্দীনকে মামুন বললেন, ‘আপনি কবির সঙ্গে কথা বলেন। দেখেন কবি আপনাকে চিনতে পারেন কী না।’ তখন জসীম উদ্দীন কবির ডান হাত ও আঙুল স্পর্শ করলেন। বললেন, ‘কাজীদা, আমি জসীম। কাজীদা আমি জসীম।’ দুইবার বলার পর কবি তার দিকে খেয়াল করে তাকালেন। আর তখনই মামুন পেয়ে গেলেন তার কাক্সিক্ষত ছবি!

মামুন যখন এই দুই কবির ছবি তুলছিলেন তখন সমস্ত পিজি হাসপাতাল কেঁপে উঠলো। মামুনের শরীর ও ক্যামেরা কেঁপে উঠলো। তিনি টের পেলেন একটা ভূমিকম্প হচ্ছে। এই ভূমিকম্প আসলে প্রাকৃতিক ভূমিকম্প নয়, সাংস্কৃতিক ভূ-কম্পন। চোখে চোখ রেখে বিদ্রোহী কবির সঙ্গে পল্লী কবির এই যে চক্ষুমিলনএ তো আসলে সাংস্কৃতিক কম্পনই। এই কম্পন যখন শেষ হলো তখন হঠাৎ করে এলেন ইত্তেফাকের আলোকচিত্রী শামসুদ্দীন আহমেদ চারু। মামুন তার ক্যামেরাটা চারুর হাতে দিলেন। বললেন, দুই কবির সঙ্গে তার একটি ছবি তুলে দিতে। ছবি তুলে চলে গেলেন চারু।

ছবি তোলা শেষে জসীম উদ্দীন বললেন, ‘তাড়াতাড়ি দিয়ে আসি।’ নজরুলের শরীর তখন কাঁপছে। এ সময় তিনজন নার্স দৌড়ে এলেন। এক নার্স হঠাৎ করে কবিকে ছেড়ে দিয়ে অন্যদিকে চলে গেল। সবাই মিলে নজরুলকে নিয়ে গেলেন তার কেবিনে। কবিকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তারা রুমে চলে এলেন। রুমের ভেতর থেকেই পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মামুনের বুঝতে বাকি রইল নাকারা আসছেন। পায়ের শব্দ জসীম উদ্দীনের রুম ক্রস করে গেল। একটু পর আবার একই শব্দ। জসীম উদ্দীনের কেবিনে অতর্কিতে এসে ঢুকলেন বিখ্যাত ডাক্তার ও পিজি হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক নুরুল ইসলাম। তার সঙ্গে আরও পাঁচজন ডাক্তার। সবার গলায় স্টেথস্কোপ, গায়ে সাদা অ্যাপ্রোন। জসীম উদ্দীন তখন বিছানায় হেলান দিয়ে বসেছিলেন। মামুন তার পাশেই বসা।

ডা. নুরুল ইসলাম মামুনের সামনে এলেন। মামুনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার পরিচয় কি? আপনি কেমন করে এটা করতে পারলেন?’ কিছুক্ষণ খুব বকাবকি করে বললেন, ‘যদি কিছু হয়ে যেত, আপনি কী এর দায়িত্ব নিতেন? নজরুল তো আমাদের জাতীয় সম্পদ। তার কিছু হয়ে গেলে আমি জাতির কাছে কী জবাব দিতাম? আপনি খবরের কাগজের বুলেটিন দেখেন না?’ কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে রইলেন মামুন। রাগে নুরুল ইসলামের শরীর কাঁপছে।

তখন জসীম উদ্দীন বললেন, ‘ও আনে নাই, আমি আনছি।’ নুরুল ইসলাম তখন চুপ। আর কোনো কথা বললেন না। সবাইকে নিয়ে বাইরে চলে গেলেন। মামুনও ভয়ে ভয়ে হাসপাতাল ছাড়লেন। বাইরে বের হয়ে দেখলেন হাসপাতালের সামনে একটা ট্যাংক। থমথমে অবস্থা। এর মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হাতিপুলের ভেতর দিয়ে তিনি উধাও হয়ে গেলেন।