চট্টগ্রামে চাঁদাবাজদের ভয়ংকর রূপ, আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৪ এএম

চট্টগ্রামে সংঘবব্ধ ‘চাঁদাবাজ চক্র’ ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। বিদেশ থেকে ফোন করে নির্মাণাধীন বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি এখন নিত্য ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই প্রাণ হারানোর ভয়ে নীরবে ওই চক্রকে চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন। ঝামেলা এড়াতে অনেকে পুলিশের দ্বারস্থ হচ্ছেন না। দাবি মতো চাঁদা না পেলে সন্ত্রাসীরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর, গুলি ও বোমা বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। তাদের এমন দৌরাত্ম্যে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন চট্টগ্রামের অধিকাংশ ব্যবসায়ী ও নির্মাণাধীন বাড়িঘরের মালিকরা। কিছু কিছু ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জড়িতদের গ্রেপ্তার করলেও চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের মূলহোতাকে ধরতে পারছেন না।

গেল ১৩ দিনে চট্টগ্রাম নগর ও শহরতলি এলাকায় তিনটি ঘটনায় দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং একটি নির্মাণাধীন বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর, গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রবিবার সকালে বড়দীঘিরপাড় এলাকায় ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন নামে এক চাল ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন দশ তলা ভবনে ভাঙচুর  ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় মুখোশপরা সশস্ত্র ‘সন্ত্রাসীরা’। তারা ওই ভবনে ঢুকে হাসান সাকিব নামে এক নির্মাণশ্রমিককে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে আহত করেন এবং ভবনের নিরাপত্তাকর্মী কোরবান আলীসহ কয়েকজন শ্রমিককে মারধর করেন। বিকেলে এ ঘটনায় অজ্ঞাত সাতজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন জসিম উদ্দিন।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার নগরের পাঁচলাইশ থানাধীন পুলিশ কমিশনারের বাসভবনের সামনে ‘আটলান্টিক লিভিং লিমিটেড’ নামে একটি আবাসন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর চালায় দুর্বৃত্তরা। তারও আগে গত ১৩ জুলাই ২ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বাকলিয়া অ্যাক্সেস রোডে ‘ডিডিএন’ নামে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা-ভাঙচুর চালায় এবং ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, ‘অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে যেভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালাচ্ছে,  তা অত্যন্ত উদ্বেগের। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এ অবস্থায় অপরাধীদের ধরা না হলে এবং প্রশাসন নিরাপত্তা দিতে না পারলে ব্যবসা চালু রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।’

তিনি বলেন, ‘গত এক মাস ধরে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে আমার কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছে সন্ত্রাসীরা। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানানো হয়েছিল।’ স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, শুধু জসিম উদ্দিনের ভবন নয়, বড় দীঘিরপাড় ও আশপাশের এলাকায় নির্মাণাধীন অন্তত এক ডজন ভবন মালিককে বিদেশ থেকে ফোন করে ইতিমধ্যে অর্ধকোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছে চক্রটি। নাম প্রকাশ না করে ওই এক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে জানান, সম্প্রতি ওই চাঁদাবাজ চক্রকে স্থানীয় মাহবুবুল আলম ১০ লাখ টাকা, ব্যবসায়ী নাছির উদ্দিন ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছেন। তবে এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ দেননি। জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে হামলার বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ‘ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। অজ্ঞাত সাতজনের নামে মামলা হয়েছে। আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

তথ্যসূত্র বলছে, সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্র অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ‘আটলান্টিক লিভিং লিমিটেড’-এ হামলার ঘটনায় অভিযোগ দিলেও ঘটনার তিন দিন পরেও নিয়মিত মামলা রুজু করেনি পাঁচলাইশ থানা পুলিশ কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির মালিক  মোহাম্মদ মোসলেম দেশ রূপান্তরকে জানান, আটলান্টিক লিভিং লিমিটেড নামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওই জায়গাটি তাদের মালিকানাধীন। হাবিবুল্লাহ ইদ্রিস নামে এক ব্যক্তি জায়গাটি কিনে নিতে সম্প্রতি তাকে (মোসলেম) প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি রাজি না হওয়ায় হাবিবুল্লাহ ইদ্রিস তিন-চারজন ‘ভাড়াটে সন্ত্রাসী’ দিয়ে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাটি ঘটান। মোহাম্মদ মোসলেম আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় হাবিবুল্লাহ ইদ্রিসসহ অজ্ঞাত আরও তিনজনের নামে পাঁচলাইশ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। ঘটনার দুই দিন পর গত শনিবার হাবিবুল্লাহ ইদ্রিসের বাসা থেকে লুট হওয়া সিসি টিভি ক্যামেরার স্মার্ট টিভি উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে তাকে আটক বা গ্রেপ্তার করেনি। অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজু করেনি পুলিশ।’

এর আগে গত ১৩ জুলাই বাকলিয়া আ্যাক্সেস রোডে ‘ডিডিএন’ নামে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল হঠাৎ ডিডিএনের কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। দেশি অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা অফিসের কম্পিউটার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন আসবাব ভাঙচুর করে। ওই ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। পরে র‌্যাব ও  পুলিশ অভিযান চালিয়ে ঘটনার সমন্বয়কারী মাইকেল চ্যাংসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। 

ওই ঘটনায় ফোন যিনি দিয়েছিলেন, তিনি নিজেকে ডেভিড ইমন নামে পরিচয় দেন। ‘ব্যবসা করতে হলে এককালীন ২ কোটি, এরপর প্রতি মাসে ১০ লাখ করে টাকা চাঁদা দিতে হবে’ বলছিলেন রিদোয়ানুল কবির। টেলিফোনে তাদের কথোপকথনের একটি অডিও ইতিমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে চাঁদা দাবি করা ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের সম্পর্কে না জানলে বেশিদূর যাইতে হবে না, আপনি পুলিশ কমিশনার থেকে জিজ্ঞেস করলেই হবে। ২ কোটি টাকা রেডি রাখিবেন, আর প্রতি মাসে ১০ লাখ করে দিবেন। তাহলে আপনি ব্যবসা কইরেন, না হলে কইরেন না।’ চাঁদার টাকা দেওয়ার জন্য দুই দিন সময়ও বেঁধে দেন তিনি। এর মধ্যে টাকা না দিলে চট্টগ্রামের শীর্ষ ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাসার মতো তাদের ওপরেও হামলা করা হবে বলে হুমকি দেন ইমন।

পুলিশ জানায়, চট্টগ্রামে খুন-খারাবি ছাড়াও নির্মাণাধীন ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি করে আসছে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা। বিশেষ করে নগরের বায়েজিদ বোস্তামি, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজান এলাকায় ভবন নির্মাণের জন্য বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের চাঁদা দিতে হচ্ছে। আগে বড় সাজ্জাদের দলটির দেশে নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। প্রকাশ্যে বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসিকে পেটানোর হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। সাজ্জাদ এখন কারাবন্দি। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ ১৭টি মামলা রয়েছে। পুলিশ আরও জানায়, সাজ্জাদের বাহিনীতে ৫০ জনের বেশি সক্রিয় সদস্য রয়েছে। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর দেশে বাহিনীর হাল ধরেছে মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন, মোহাম্মদ রায়হান ও বোরহান উদ্দিন। এই গ্রুপটিই চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টার দিকে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গুলি চালায়। ওই সময় বাসাটিতে পুলিশের পাঁচ সদস্য পাহারায় ছিলেন। এর আগে ২ জানুয়ারিও একই বাসায় গুলি চালানো হয়েছিল। কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত