দুই বছর সেতুর নিচে মানবেতর একা বসবাস করছিল পরিচয়হীন এক অসুস্থ্য বৃদ্ধ এক ব্যাক্তি। ওই ব্যাক্তি নানা রোগে আক্রান্ত ছিল। গত ১৭ মে তাকে উদ্ধার করে সাটুরিয়া ৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করেন সদ্য যোগদানকারী সাটুরিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম। ওই বৃদ্ধকে সুস্থ্য করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে শনিবার (২৩ মে) বিকেলে তাকে মিরপুর আশ্রায়ন কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। নিয়তির নির্মম পরিহাস ঠিকানাহীন হওয়া এই বৃদ্ধের কাছে এগিয়ে এসে মানবসেবার এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ইউএনও।
জানা গেছে, গত ২০২৪ সালের ৮ জুলাই সফিউল্লাহ কালাচাঁন নামক এক ব্যক্তিকে হাড়ভাঙ্গা, কোমড় ভাঙা, মাথা কপালে ঘাঁ এবং কুনইেতে পচন ধরা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গভীর ক্ষত অবস্থায় সাটুরিয়া উপজেলার গোলড়ার সাউদান সিএনজি ফিলিং স্টেশনের পাশে ঢাকা আরিচা মহাসড়কের সেতুর নিচে পাওয়া যায়। গোলড়া গ্রামের স্থানীয় যুবক মো. আব্দুল্লাহ তাকে সেবা করতে একটু সুস্থ করে তোলেন। কিন্তু কোথাও রাখার স্থান না পাওয়ায় ঐ যুবক আব্দুল্লাহ বৃদ্ধ কালাচান ব্যক্তিকে সেতুর নিচে বিছানা তৈরি করে দেন। সেখানে বৃদ্ধটি ২৪ ঘণ্টা মশারি টানিয়ে বসবাস করতে থাকেন। আর তিন বেলা খাবার ও ঔষধ দিয়ে সাহায্য করেন স্থানীয় যুবক আব্দুল্লাহ।
কামতা গ্রামের মিজানুর রহমান বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে ঐ সেতুর নিচ দিয়ে যাতায়াত করার সময় একটি লোক এখানে মশারি টানিয়ে বসবাস করছে এমন দৃশ্য দেখতাম। প্রকৃতির কাজসহ পানি ও অন্যান্য কিছু প্রয়োজন হলে কিভাবে তা সমাধান হয় সেটা নিয়ে আলোচনা করতাম। এ বিষয়ে অনেকে ফেসবুকে পোষ্ট করলেও কোন সমাধান হয়নি। পরে শুনলাম তাকে সরকারিভাবে সাহায্য করা হয়েছে। যা খুবই প্রসংসার দাবীদার।
পরে চলতি মাসের ১৭ মে সাটুরিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম সেতুর নিচ থেকে উদ্ধার করে সাটুরিয়া হাসপাতালে ভর্তি করেন। এছাড়া বৃদ্ধদের সাথে কথা বলে তার দেওয়া ঠিকানা ঢাকার লালবাগে যোগাযোগ করেও তার পরিবারের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। বৃদ্ধটির পরিচয় না পাওয়ায় তাকে সরকারি মিরপুর আশ্রয় অভ্যর্থনা কেন্দ্রে শনিবার (২৩) বিকেলে পাঠিয়ে দেন।
সফিউল্লাহ কালাচাঁনকে দুই বছর লালন পালন করেন মো. আব্দুল্লাহ নামে এক যুবক। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, যখন ওই বৃদ্ধকে এই সেতুর নিচে দেখি তখন তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। মানুষ হিসেবে নিজেরে বিবেকের তাড়না থেকেই ওই বৃদ্ধর পাশে দাড়াই। সাধ্য মতো তার মুখে অন্ন তুলে দিয়েছি। পরে নিজেকে ক্লান্ত মনে হলেও তাকে কোনদিন কষ্ট দেয়নি।
আব্দুল্লাহ আরো বলেন, শেষ বয়সে সে তার পরিবারের সন্ধান করে সে। কিন্তু তার মুখের ভাষা বুঝা যায় না। কিন্তু সঠিক তথ্য না পাওয়ায় তার পরিবারকে শনাক্ত করতে পারিনি। পরিচয় না পেয়ে নিজেই দুই বছর তার সেবাযত্ন করেছি। তার তিনবেলা খাবারসহ বিছানা, গোছল, মলমূত্র আমি নিজে পরিষ্কার করেছি।
এ বিষয়ে সাটুরিয়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম বলেন, আনুমানিক ৬০ বছর হতে পারে কালাচান ব্যক্তির। তাকে যে আব্দুল্লাহ নামে এক যুবক তত্তাবধানে রেখেছিল। সে আমাকে ফোন দিয়ে এ খবরটি দেন। তাছাড়া তাকে নিয়ে স্বচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচারিত হয় গণমাধ্যমে। পরে তাকে আমি প্রথমে সাটুরিয়া হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যাবস্থা করি। এর পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নিয়ে তাকে মিরপুর সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে পাঠিয়েছি। তিনি বলেন, কোন রকম কথা বলতে পারেন। কোন ঠিকানা বলতে পারেন না। তার নিচের অংশ অবস হয়ে আছে। বর্তমানে তিনি আশ্রয় কেন্দ্রে ভাল আছেন।