নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত ৩৫তম আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার তৃতীয় দিনে বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে “মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৬” প্রদান করা হয়েছে বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক, গবেষক ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. আব্দুন নূরকে। একই অনুষ্ঠানে প্রদান করা হয় “চিত্তরঞ্জন সাহা শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কার ২০২৬”।
মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রবর্তিত এই সাহিত্য পুরস্কার প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। এর আগে এই পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন নির্মলেন্দু গুণ, শামসুজ্জামান খান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, দিলারা হাশেম, সেলিনা হোসেন, সমরেশ মজুমদার, গোলাম মুরশিদ, আসাদ চৌধুরী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং পবিত্র সরকার।
মেলার তৃতীয় দিনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের বিভিন্ন মঞ্চে সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিশু-কিশোর সৃজনশীলতা এবং প্রবাসী বাঙালির আবেগে ভরপুর নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। দিনটির শুরুতে বইয়ের স্টল উদ্বোধন করেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন, কবি সুবোধ সরকার, ফারুক মঈনউদ্দীন, নজরুল ইসলাম ও ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ। এরপর অনুষ্ঠিত হয় নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, স্বরচিত কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি অনুষ্ঠান।
দুপুরে “শব্দ ও ছন্দের আড্ডা” শীর্ষক অনুষ্ঠানে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন শামস আল মমীন, জাফর আহমদ রাশেদ, হুমায়ূন কবীর ঢালী, মোস্তফা সারওয়ার, আশরাফ কায়সার, রাজু আলাউদ্দিন, তানভীর তারেক, কণা রেজাসহ অনেকে। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ফারুক আহমদ।
তৃতীয় দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিশু-কিশোর-যুবদের চিত্রাংকন ও বাংলা লিখন প্রতিযোগিতা। শতাধিক শিশু-কিশোর এতে অংশ নেয়। বিভিন্ন বয়সভিত্তিক বিভাগে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, শহীদ মিনার ও জাতীয় স্মৃতিসৌধ বিষয়ক চিত্রাংকন অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি বাংলা বর্ণমালা, “একুশের গান”-এর প্রথম ছয় লাইন এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত লিখন প্রতিযোগিতাও আয়োজন করা হয়। বইমেলা প্রাঙ্গণ শিশুদের রঙতুলি, বাংলা ভাষা ও সৃজনশীলতায় হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
বিকেলে “কবিতার আঙিনায়” শীর্ষক স্বরচিত কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে অংশ নেন শামস আল মমীন, হোসাইন কবির, বেনজির শিকদার, জেবুন্নেছা জ্যোৎস্না, মো. আলী বাবুল, শারমিন রেজা ইভা, লায়লা ফারজানা, সৈয়দ মামুনুর রশীদসহ আরও অনেকে। একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় নতুন বই নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান।
“বাংলা সাহিত্যে সমকালীনতা” শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন ফরিদুর রেজা সাগর, ইমদাদুল হক মিলন, ফারুক মঈনউদ্দীন ও মেজবাহ উদ্দিন আহমদ। বাংলা সাহিত্য, প্রবাসী সংস্কৃতি এবং নতুন প্রজন্মের সাহিত্যচর্চা নিয়ে তাদের আলোচনা দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে।
সন্ধ্যায় “৩৫ বছরে বইমেলার সার্থকতা ও অর্জন” শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম ও বিশ্বজিত সাহা। সেখানে নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার দীর্ঘ যাত্রা, প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। একই অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় বইমেলার গান- “নিউ ইয়র্ক বইমেলা প্রাণের মেলা”।
এরপর অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন “হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ ও চেতনায় নজরুল”। আল্পনা গুহ ও সুমিত্রা সেনের পরিকল্পনায় আয়োজিত এ পরিবেশনায় শিশু-কিশোর শিল্পীদের নৃত্য ও সংগীত দর্শকদের মুগ্ধ করে। পরে “গানে মিলে প্রাণের সন্ধান” শীর্ষক সংগীতানুষ্ঠানে পরিবেশনা করে আবহমান বাংলা।
রাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ছিল “মুক্তধারা স্মারক বক্তৃতা ২০২৬”। এতে বক্তৃতা প্রদান করেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, প্রবাসী সংস্কৃতি ও নতুন প্রজন্মের পরিচয় সংকট নিয়ে তাঁর আবেগঘন বক্তব্য দর্শকদের গভীরভাবে আলোড়িত করে।
এছাড়া জীবনানন্দ দাশের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, নজরুলের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান এবং একক রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনাও দর্শকদের মুগ্ধ করে। রাত ১১টার পর সমাপনী ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হয় বইমেলার তৃতীয় দিনের আয়োজন।