প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, সরকারপ্রধান হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভিআইপি কালচার থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। গণভবনের বাইরে দীর্ঘ অপেক্ষার চিরাচরিত নিয়ম বদলে সরকার এখন জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
গতকাল সোমবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ের ‘করবী’ হলে সরকারের ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
এ সময় সরকারের বিভিন্ন অর্জন, সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন মাহদী আমিন। তিনি দাবি করেন গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ‘জুলাই চার্টার’ এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে এই ১০০ দিনে বেশ কিছু দৃশ্যমান ও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে দেশে নারী সমাজের ক্ষমতায়নের প্রকল্প ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, ‘দেশের বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন গতি আনতে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ইকোনমিক করিডোর বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের কাজ।’
তিনি বলেন, ‘বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বিমানবন্দর ও ট্রেনে হাই-স্পিড ফ্রি ওয়াইফাই চালুর মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তরুণদের ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশে নতুন করে স্পোর্টস ও নতুন কুঁড়ি কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে সরকার দ্রুত ও মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হামের টিকা এনে প্রায় শতভাগ শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনা হয়েছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি উন্নীত করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিতের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’
সরকার গঠনের পর এত স্বল্প সময়ে মন্ত্রিসভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ কার্যকর করতে সক্ষম হওয়া সরকারের দ্রুততা, কার্যকারিতা ও আন্তরিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে বলে মন্তব্য করেন মাহাদী আমিন। তিনি বলেন, ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভা ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি মাসের ২৪ মে পর্যন্ত মোট ১০টি কেবিনেট সভা সম্পন্ন করেছে। এসব সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। তার মধ্যে ৩৭টি সিদ্ধান্ত অর্থাৎ প্রায় ৬২ শতাংশ এরই মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২৩টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বিএনপি চেয়ারপারসন প্রয়াত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন তাদের সময়কার সরকার দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিকাশ নিশ্চিত করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জন্য সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে। এ নজিরবিহীন স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে একটি গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে এবং বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, অশোভন আচরণ ও অশালীন কর্মকা-ের মাধ্যমে সামাজিক অস্থিতিশীলতা তৈরির যে প্রয়াস চলছে, তা গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর বলেও অভিমত প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘সরকার একদিকে মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যার প্রতিফলন গত ১০০ দিনের উদার ও সহিষ্ণুতার নতুন মানদ-ে বারবার প্রতীয়মান হয়েছে। অন্যদিকে বাকস্বাধীনতার নামে অপপ্রচার, বিদ্বেষ বা বিষোদগারের যে রাজনীতি একটি গোষ্ঠীর অপকৌশলে পরিণত হয়েছে, সেই চর্চা গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক দিক : সংবাদ সম্মেলনে শিশু রামিসার ঘটনায় সরকারের অবস্থানের কথা উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী রামিসার বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিতের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ইতিমধ্যেই এ ঘটনায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব সর্বোচ্চ বিচার নিশ্চিত করা হবে। মেহেরপুরে ৯ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে এক আসামিকে ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে একটি বিরল নজির।’
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক দিক তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, ‘এখন ভুক্তভোগীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে যান না; বরং প্রধানমন্ত্রীই জনগণের দুয়ারে পৌঁছে যাচ্ছেন। তিনি মানুষের কথা শুনছেন, দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়াচ্ছেন এবং সাহস ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি প্রশ্নোত্তর সেশন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে মানবিক ও জনমুখী রাজনীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশি পাসপোর্টে আবারও ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এস আলম গ্রুপের ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে তিনটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত মাসে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে এবং প্রবাসীদের পাঠানো মাসিক রেমিট্যান্স প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। প্রায় ২ লাখ ফ্রিল্যান্সারকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। পরিচালনা করেন উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান, উপ-প্রেস সচিব মোস্তফা জুলফিকার হাসান, সুজাউদ্দৌলা সুজন, শাহদাৎ হোসেন স্বাধীন প্রমুখ।