এই শহরের ঈদ ওদের নয়

আমরা একজন আলি হোসেনকে খুঁজে পেয়েছি। ওর বয়স ৯। দেখলে মনে হয় ছয় বা সাত। ক্ষুধা আর অপুষ্টি ওকে বেড়ে উঠতে দেয়নি। আমাদের আলি হোসেন নিজের বাবা-মায়ের নাম জানে না। শুধু জানে তার বাড়ি জয়দেবপুর। কে ওকে বলেছে ওর বাড়ি জয়দেবপুর! তাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ৬নং প্ল্যাটফর্মের স্থায়ী বাসিন্দা আলি হোসেন। মাঝে মাঝে নিজের বাড়ি মনে করে জয়দেবপুরে যায়। জয়দেবপুরের কোথায় যায়? আরেকটি স্টেশনে।

আলি হোসেনকে এক বছর বয়সে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে কে বা কারা ফেলে রেখে যায়। সেই থেকে এখানেই আছে। তার নাম রেখেছে এক বড় ভাই। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পরিচ্ছন্ন পোশাকে অনেক শিশু বাবা-মায়ের হাত ধরে বাড়ি ফিরছে। কিন্তু আলি হোসেনের কোথাও কেউ নেই। ঘর নেই, তাই ফেরার তাড়াও নেই। এই তো ঈদ এলো। মানুষ কত কি আয়োজন করছে, কিন্তু আলি হোসেনের জীবনে কোনো আয়োজন নেই। কোনো আয়োজন থাকেও না। এই শহরের ঈদ ওর নয়।

ঈদ মানে খুশি। নতুন জামা-জুতা। সকালবেলা মজাদার সেমাই। সারা দিন কতই না বাহারি খাবার। নানা জায়গায় ঘুরতে যাওয়া। দিনশেষ আনন্দে  ক্লান্ত হয়ে পড়া। কিন্তু এই শহরে এমন অনেক মানুষ আছেন, ঈদ তাদের জীবনে ভিন্ন কিছু বয়ে আনে না। তাদের জন্য কেউ অপেক্ষা করে থাকে না। নতুন জামা জোটে না, জুতা তো অনেক দূরের। কেউ ডেকে সেমাই খাওয়ায় না। তারা ঈদের সকালে ঘুম থেকে জেগে গোসল করে না, কাপড়ে আতর মাখে না। তারা কিচ্ছু করে না। এই স্টেশনে, এই শহরে কোলাহলের ভিড়ে আলি হোসেনরা এক কোণে পড়ে থাকে, বেড়ে ওঠে। হয়তো এই শহরেই আরও একজন নতুন আলি হোসেনকে খুঁজে পেয়ে তারও নাম রাখে আলি হোসেন।

আলি হোসেনের মতো আরেকটি চরিত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জের রনি। হালকা-পাতলা ছিপছিপে কালো গড়নের, দেখলে মনে হবে বয়স পাঁচ বা ছয়। কিন্তু এই বয়স সে মানতে রাজি নয়। ওর এক কথা ‘আমার বয়স ৯’। বললাম, বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ তো বুঝলাম, বাবার নাম কি? কিছুটা সময় ভেবে জানাল রনি। নিজের নামও রনি, বাবার নামও রনি? এমন হয় নাকি? বাবা নিয়ে গল্পটা আর এগুলো না। ওর এসবে একেবারেই আগ্রহ নেই। এদের জীবনে এসব গল্প খুব একটা এগোয় না। জানাল, অনেক ছোটবেলায় বাবা মারা গেছে। এরপর মা আরেকটা বিয়ে করেছে। সে ট্রেনে করে এখানে চলে এসেছে। কবে এসেছে সে নিজেও জানে না। জানতে চেয়েছিলাম ঈদ কর কোথায়? জানি এই প্রশ্নটা অবান্তর। কিন্তু রনি জানাল, এখানে বন্ধুদের সঙ্গে। ঈদের দিন অনেক টাকা পাই। টাকা? কীভাবে? দূরে এক মহিলাকে দেখিয়ে বলল, ওই মহিলা যেভাবে পাচ্ছে সেই ভাবে। ভিক্ষা কথাটা নিজের মুখে সরাসরি বলল না।

আলি হোসেন কিন্তু ভিক্ষা করে না। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে সে ব্যবসা করে। পপকর্ন কিনে স্টেশনে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে। পাঁচ টাকা করে কিনে ১০ টাকায় বিক্রি। কে কিনে এনে দেয়? অন্য কেউ এই প্রশ্নে খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলে, ‘না আমিই আনি।’ ৯ বছরের আলি হোসেন নিজের পায়ে নিজেই দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করেছে। প্রকৃতি মানুষকে অভিযোজন শেখায়। আলি হোসেনকে শিখিয়েছে ওর জীবন।

এমন জীবন এখানে আরও অনেকের। তাদেরই একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আল আমিন। বয়সে খানিকটা বড় হলেও আল আমিন জানে ওর মায়ের নাম আয়েশা আর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। বাবার নাম না জানা আল আমিনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম ঈদের দিন ওর কেমন কাটে? কোথায় করে ঈদ? স্মৃতি হাতড়ে  সুখী হওয়া যায়, আল আমিনের ঝুলিতে এমন কোনো কিচ্ছু নেই।

খুশি শব্দটার অর্থই হয়তো আল আমিনের মতো বোঝে না সাব্বিরও। ওর বাড়ি খুব বেশি দূরে না, জানাল টঙ্গীতে। জানতে চেয়েছিলাম বাড়ি যাও না কেন? ও পাল্টা প্রশ্ন করে জানতে চাইল কোথায় যাব? আব্বা আর একটা বিয়ে করছে। মাও চলে গেছে। এখন ওর বাড়ি-ঘর সব এই স্টেশন।

এসব হারানো মানুষের সঙ্গে জুটি বেঁধেছে সিরাজগঞ্জের আব্দুর রহমান। ওর দেওয়াল ভালো লাগে না। ঘর ভালো লাগে না। বাড়িতে বাবা-মা সবই আছে। কিন্তু কেন যেন ওর সেই জীবন ভালো লাগেনি। সে জন্যই সব ছেড়ে এসেছে। আব্দুর রহমান জানাল, এবার কোরবানির ঈদের পর সে বাড়ি যাবে। এখানে আর আসবে না। কারণ তার এই জীবনও ভালো লাগছে না।

এই কথা শুনে সাব্বিরও বলে উঠল সেও চলে যাবে। কিন্তু কোথায়? ওর ফেরার ঠিকানা হারিয়ে গেছে।

একটি পুরনো জরিপের তথ্য বলছে, দেশে পথশিশুদের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এদের প্রায় ৮০ শতাংশ ঢাকায় বসবাস করে। এদের রাতে ঘুমানোর জায়গা নেই। গোসল, খাওয়া কিংবা মলত্যাগের জায়গার সংকট রয়েছে। বিশেষ উৎসবে ব্যক্তি উদ্যোগে খাবার বিলি করা হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এদের জন্য তেমন কিছু করা হয় না।

আল আমিনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কখনো সরকারের কেউ ঈদের দিন তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছে? আল আমিন জানায়, তার এত বছরের পথের জীবনে সে এমন দেখেনি।

জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্র সামাজিক সুরক্ষা খাতে এক লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন বাদে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৮১ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। প্রতি বছরই বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে এমন বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এই নিরাপত্তা ব্যয়ের কতটা পায় পিতৃপরিচয় ছাড়া বেড়ে ওঠা আলি হোসেনরা? কোনো দিন কি রাষ্ট্র মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার পথ বাতলে দেবে রনি, আল আমিন, সাব্বিদের?