আত্মত্যাগ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন উৎসব আছে। একটি জাতির স্বতন্ত্র পরিচয় সত্তা নির্মাণ করতে তাদের মধ্যে ঐক্যবোধ, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের  চেতনা জাগ্রত করতে সম্মিলিত আনন্দ ও উদযাপন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘ঈদ’ শব্দে জড়িয়ে আছে এক আনন্দ শিহরণ। নাড়ির অচ্ছেদ্য টান যেন প্রাণ ফিরে পায় ঈদ এলে। প্রবাসের দুঃখ-বেদনা-যন্ত্রণা সব পেছনে ফেলে, মানুষ অনেক কষ্ট করে হলেও ছুটে যায় আপনজনের মধ্যে। পথের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট আমলে না নিয়ে, সবাই ফিরতে চায় ফেলে আসা শত সহস্র স্মৃতিবিজড়িত শৈশবের পরিবেশ, আত্মীয়-পরিজন ও বন্ধুদের মধ্যে। মুসলিম জীবনাচারের সাংস্কৃতিক ধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ ঈদ এবং ঈদ আনন্দ। ঈদে আছে সাম্যের বাণী, সহানুভূতিশীল হৃদয়ের পরিচয়। তাই পরোপকার ও ত্যাগের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় মানুষের মন। এটাই ঈদের শিক্ষা ও সার্থকতা।

কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং ইসলামি নিদর্শন ও অন্যতম ঐতিহ্য। ত্যাগ, তিতিক্ষা ও প্রিয় বস্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করাই কোরবানির তাৎপর্য। বস্তুত কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহা আমাদের কাছে আত্মশুদ্ধি, আত্মতৃপ্তি ও আত্মত্যাগের এক সুমহান বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়। ঈদুল আজহার শিক্ষায় উজ্জীবিত হলে আমরা সব পাপ, বঞ্চনা, সামাজিক অনাচার, রিপুর তাড়না ও শয়তানের প্রবঞ্চনা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হব। মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস এটাই সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীর সব জাতি ও সম্প্রদায় কোনো না কোনোভাবে আল্লাহর দরবারে নিজেদের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করে। এটাই মানুষের চিরন্তন স্বভাব। কোরবানি হলো চিত্তশুদ্ধি এবং পবিত্রতার মাধ্যম। এটি সামাজিক রীতি হলেও, আল্লাহর জন্যই এ রীতি প্রবর্তিত হয়েছে। তিনিই একমাত্র বিধাতা প্রতি মুহূর্তে যার করুণা লাভের জন্য মানুষ প্রত্যাশী। আমাদের বিত্ত, সংসার এবং সমাজ তার উদ্দেশেই নিবেদিত এবং কোরবানি হচ্ছে সেই নিবেদনের একটি প্রতীক।

কোরবানির মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর জন্য তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ত্যাগ করতে রাজি আছে কি-না সেটিই পরীক্ষার বিষয়। কোরবানি আমাদের সেই পরীক্ষার কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। ইমানের কঠিন পরীক্ষায় যারা যত বেশি নম্বর অর্জন করতে পারেন, তারাই হন তত বড় খোদাপ্রেমিক ও তত সফল মানুষ এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে তত সফল। ঈদের প্রকৃত আধ্যাত্মিক আনন্দ তারা ঠিক ততটাই উপভোগ করতে পারেন, যতটা তারা এ জাতীয় পরীক্ষায় সফল হন। কোরবানির পশুর রক্ত মাটি স্পর্শ করার আগেই আল্লাহর কাছে তার সওয়াব গ্রাহ্য হয়ে যায়। কোরবানি হচ্ছে, একটি প্রতীকী ব্যাপার। আল্লাহর জন্য বান্দার আত্মত্যাগের একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। কোরবানি থেকে শিক্ষা নিয়ে সারা বছর আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায়, নিজ সম্পদ অন্য মানুষের কল্যাণে ত্যাগের মনোভাব গড়ে উঠলে বুঝতে হবে কোরবানি সার্থক হয়েছে, কোরবানি ঈদ সার্থক হয়েছে। নতুবা এটি নামমাত্র একটি ভোগবাদী অনুষ্ঠান থেকে যাবে চিরকাল। কোরবানি কোনো লোক দেখানো বা  গোশত খাওয়ার উৎসব নয়। কোরবানিতে যদি আল্লাহভীতি ও মনের একাগ্রতা না থাকে, তাহলে এই সুবর্ণ সুযোগ বিফল মনোরথ ছাড়া আর কিছুই হবে না।

ঈদুল আজহার চিরায়ত শিক্ষা মানুষ মহান আল্লাহর জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবে, এই শিক্ষাই ইবরাহিম (আ.) আমাদের জন্য রেখে গেছেন। সুতরাং কোরবানির মাধ্যমে প্রতিটি মুসলিম পরিবারের আল্লাহর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করাই হবে একমাত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। ঈদ যেমনি আনন্দের বার্তা দিচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে শিক্ষা দিচ্ছে মহান আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনের প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করার। নিজের মধ্যে থাকা পশুত্ব ও অমানবিক মন মানসিকতা বিসর্জন দেওয়ার। বার্তা দিচ্ছে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর। সুপথ দেখাচ্ছে ন্যায়নীতি আর নিষ্ঠার পথে চলার। শিক্ষা দিচ্ছে, সুন্দর ও পবিত্র মনের অধিকারী হওয়ার। তাই আসুন, ঈদুল আজহার প্রকৃত মহত্ত্ব ও তাৎপর্য নিজে লালন করতে শিখি। অসুন্দর ও কলুষিত হৃদয় পবিত্র করার লক্ষ্যে ঈদুল আজহায় শিক্ষা গ্রহণ করি। ঈদুল আজহার পশু  কোরবানির মাধ্যমে, প্রকৃতপক্ষে মানুষের মধ্যে বিরাজমান ষড়রিপুকে কোরবানি দিতে হয়। হালাল অর্থে কেনা পশু কোরবানির মাধ্যমে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটায় মানুষ। কিন্তু এর মধ্যে যদি কোনো বৈপরীত্য থাকে, তাহলে কোনোভাবেই কোরবানি হালাল হবে না। আমরা যেন এ বিষয়টি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।

ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সব অনিশ্চয়তা-শঙ্কা দূর হোক। হিংসা, হানাহানি ও বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে একসঙ্গে এক কাতারে পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দে শামিল হয়ে সবার মধ্যে সাম্য ও সহমর্মিতার মনোভাব গড়ে উঠুক। মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে আমাদের প্রার্থনা হোক জগতের সব মানুষের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি। পৃথিবী সব ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানি মুক্ত হোক। নারী নির্যাতন ও সন্ত্রাসের বিভীষিকা দূর হোক। আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে বন্ধন দৃঢ়তর হোক। আগামী দিনগুলো সুন্দর ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হোক হাসিখুশি ও ঈদের আনন্দে ভরে উঠুক প্রতিটি প্রাণ। সবাইকে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন ঈদ মোবারক।