বাংলাদেশের সামনে নতুন দুর্যোগ ঝুঁকি

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০৮ এএম

গত ১৪ জুলাই দেশ রূপান্তরে ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) বরাত দিয়ে বিশ^জুড়ে এল নিনোর সতর্কতা এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট বন্যা-খরা ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ ৬ দেশ রয়েছে বলে গুরুত্ব সহকারে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একেকটি শতাব্দী একেকটি কারণে পরিচিত। কোনো শতাব্দী পুনর্জাগরণের জন্য, কোনোটি শিল্প বিপ্লবের জন্য, কোনোটি যুদ্ধের জন্য। আর একবিংশ শতাব্দী হলো জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের। এ শতাব্দীতে পরিবেশগত বিপর্যয় মানবিক বিপর্যয়ের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা অতীতের সব শতাব্দীকে অতিক্রম করছে। ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা নির্বিশেষে বিশ্বের প্রতিটি দেশ কোনো না কোনো প্রাকৃতিক বা জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকিতে। এরই মধ্যে এল নিনোতে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিস্থিতি আরও সঙ্গিন। এর প্রভাব অনেকটা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মতোই। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোয় কোনটা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আর কোনটা এল নিনোর প্রভাব তা পৃথক করা কঠিন।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) বলছে, এ বছরের দ্বিতীয়ার্ধের পর একটি এল নিনো তৈরি হতে পারে। এটা এতটাই শক্তিশালী যে, সুপার এল নিনোতে পরিণত হতে পারে। গণমাধ্যমের কল্যাণে অনেক সাধারণ মানুষও এল নিনো সম্পর্কে ধারণা রাখেন। এল নিনো হলো মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বৃদ্ধি ও তা কয়েক মাস স্থায়ী হওয়াজনিত পরিস্থিতি। আর সেই তাপমাত্রা যখন অস্বাভাবিকভাবে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি দীর্ঘস্থায়ীরূপ ধারণ করে তখন সেটা হয় সুপার এল নিনো। স্বাভাবিকভাবেই ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাব অনেক বেশি এলাকাজুড়ে এবং অনেকটা দীর্ঘস্থায়ী হয়। ইতোপূর্বে ১৯৮২-৮৩, ১৯৯৭-৯৮ ও ২০১৫-১৬ সালে এল নিনোর প্রভাবে অতিবৃষ্টিজনিত বন্যা, অনাবৃষ্টিজনিত খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, প্রভৃতি কারণে কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার (সিপিসি) বলছে, এবারের এল নিনো সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ৮১ শতাংশ, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হবে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে।

এল নিনোর সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে আবহাওয়া ওলটপালট করে দেয়। উল্লেখ্য, পূর্ব আফ্রিকার খরাপ্রবণ দেশ কেনিয়ার অবকাঠামো ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রস্তুতি খরাকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি। কিন্তু এল নিনোর প্রভাবে বিগত কয়েক বছর আবহাওয়া পরিবর্তিত হয়ে অস্বাভাবিক অতিবৃষ্টির কারণে উপর্যুপরি কয়েকটি বন্যায় সেখানে ভূমিধস ঘটে,

কৃষিজমি তলিয়ে যায়, হাজার হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত ও লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। কৃষি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কেনিয়া যেখানে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছিল তারা আজ ভয়াবহ খাদ্যসংকটে। অপরদিকে পূর্ব আফ্রিকার ‘হর্ন অব আফ্রিকা’র দেশ খ্যাত সোমালিয়া দীর্ঘস্থায়ী খরায় জর্জরিত হলেও সাম্প্রতিককালে এল নিনোর প্রভাবে রাজধানী মোগাদিসুসহ বিস্তীর্ণ এলাকা শুষ্ক মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে পড়ে। আবার একই অঞ্চলের স্থলবেষ্টিত কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ উগান্ডা, যেখানে আফ্রিকার বৃহত্তম ভিক্টোরিয়া হ্রদের বড় অংশের অবস্থান ও যে হ্রদ হলো বিশ্বের দীর্ঘতম নীল নদের উৎস সে দেশ আজ অনিয়মিত বৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কবলে পড়ে বহুমাত্রিক পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের মুখোমুখি।  এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ আফগানিস্তানের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক খড়া, তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে হিন্দুকুশ পর্বতমালার হিমবাহ গলে নদীতে পানি বেড়ে যাওয়া ও শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া,  তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের গরমিল প্রভৃতিতে কৃষির নাজেহালে মহাসংকটে দেশটি। এদিকে এল নিনো পাকিস্তানে সৃষ্টি করছে দ্বৈত সংকট। এর দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে অনাবৃষ্টিতে খরা ও পানি সংকট; অন্যদিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে উত্তরাঞ্চলের হিমালয়, কারাকোরাম ও হিন্দুকুশ পর্বতমালার হিমবাহগুলো দ্রুত গলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে কৃষি ও জনবসতির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। আর ভারতের হিমাচল, মিজোরাম, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গে ভারী বর্ষণের প্রভাব কেবল ভারতে না, বাংলাদেশেও পড়ছে। এ ছাড়া রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা ও মধ্য ভারতের কিছু অংশে খরার প্রভাবে কৃষি ও প্রাণপ্রকৃতি মারাত্মক ক্ষতির শিকার।

ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা খরা ও দাবানলের ঝুঁকিতে। জাপান ও তাইওয়ানের আবহাওয়াও চরমভাবাপন্ন। এ বছর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত। আগামী বছর তথা ২০২৭ সাল বিশ্বের সবচেয়ে উত্তপ্ত বছর হতে যাচ্ছে, যা ইতোপূর্বেকার সর্বোচ্চ উত্তপ্ত বছর ২০২৪ সালের রেকর্ড ভাঙতে পারে। এর পরিণতি পুরো বিশ্ব কমবেশি ভোগ করবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিজনিত

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে সম্প্রতি এল নিনোর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। নিকট অতীতে আমরা দেখেছি, এর প্রভাবে চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও ঢাকায় অতিবৃষ্টিতে জনজীবন কীভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। হতাহতসহ প্রায় ১৫ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল যখন অতিবৃষ্টিতে ডুবছে তখন উত্তর, পশ্চিমাঞ্চল অনাবৃষ্টি তথা খরার শিকার। বাংলাদেশে একই সময়ে খরা ও বন্যা এই দুই ধরনের চরম বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। উপকূলীয় জেলাগুলো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড হয় প্রায় প্রতি বছরই। কয়েক বছর আগেও এপ্রিল-মে (প্রাক-বর্ষা) ও অক্টোবর-নভেম্বর (বর্ষা-পরবর্তী) মাসে  সাধারণত ঘূর্ণিঝড় ও নিম্নচাপ বা লঘুচাপ সৃষ্টি হতো। কিন্তু বর্তমানে এসব দুর্যোগের কোনো ঋতু-সূচি নেই।

এল নিনোতে বাংলাদেশের জনজীবন বিপর্যস্ত, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত, বাস্তুচ্যুত থেকে বেশি সংকট সৃষ্টি হবে কৃষি খাতে। অনাবৃষ্টিজনিত খরায় বরেন্দ্র অঞ্চলে আমন ও সারাদেশে আউশ ধানের ফলন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলন কমছে গম ও আখের। বপনকালে অনাবৃষ্টি ও ফসল তোলার সময় অতিবৃষ্টিতে হাওর এলাকার বোরো ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বৃষ্টির অভাবে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দেশ ভয়াবহ খাদ্যসংকটে পড়তে পারে, এই আশঙ্কা অমূলক নয়। সংকট আরও বাড়বে যখন দেশের সম্ভাব্য খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলোতেও এল নিনোর প্রভাবে খাদ্যোৎপাদন কমে যাবে। অনাবৃষ্টিতে সিলেটে চায়ের উৎপাদন কমে গেছে। রংপুর বিভাগসহ ফরিদপুর ও পাবনা অঞ্চলে অনাবৃষ্টিতে পাট জাগ দেওয়ার উপযোগী পানির অভাবে এ খাত সংকটে নিপতিত। পশুখাদ্যের অভাব গবাদিপশু খাতকে সংকটে ফেলছে। পশু-পাখি-কীট-প্রতঙ্গ পড়ছে অস্তিত্ব সংকটে। এর পরিণতিতে বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ছে। বিস্তার ঘটছে সংক্রমণ ও অসংক্রমণ নানা রোগের। কেউ মরছে পানিতে ডুবে, আবার অনেকে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে পানির অভাবে। পাহাড় বা সমতল কোনো এলাকাই প্রাকৃতিক দুর্যোগমুক্ত নয়। আমরা বিদ্যমান জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সামাল দিতেই যেখানে কূলকিনারা পাচ্ছি না; সেখানে নতুন সংকট এল নিনো মোকাবিলায় কী করণীয় তার রোডম্যাপ তৈরি করা এখনই জরুরি।

বাংলাদেশকে বলা হয় জলবায়ু পরিবর্তনের নিরপরাধ শিকার (ইননোসেন্ট ভিকটিম)। বাস্তবতা তা নয়; বরং আমরা জলবায়ু সক্ষমতা নিজেই ধ্বংস করছি। একটাই আওয়াজ উন্নত বিশ্বের জীবাশ্ম জ্বালানির অতি ব্যবহার বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়িয়ে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। দাবি জলবায়ু তহবিলের। অথচ আমরা নিজেরাই পাহাড় ও গাছ কেটে বন ধ্বংস, নদী-খাল-হাওর ধ্বংস করছি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অবকাঠামো নির্মাণ, রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীর অপরিণামদর্শী বিভিন্ন কর্মকা-ের জন্য এল নিনোসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা ক্রমেই যে হারাচ্ছি, এ নিয়ে ভাবনা নেই! ভাটি বাংলার কোনো কোনো এলাকা বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে, আবার অন্যদিকে কাছের হাওরে পানি নেই! ঢাকা-চট্টগ্রাম ডুবছে। অথচ ঢাকার চারদিকের নদী-জলাশয় সেই পানি ধারণ করতে পারত। পাহাড় কেটে রেলপথসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণ ও রোহিঙ্গা বসতি স্থাপন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের এল নিনোসহ নানা কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা ধ্বংসের মুখে। অথচ সাগরপাড়ের জেলা চট্টগ্রাম কিন্তু সাগরের পানিতে ডুবছে না। বৃষ্টির পানি কয়েক কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সাগরে যাওয়ার পথ ধ্বংস করে সংকটে পড়ছে।  

এল নিনো প্রতিরোধ করা সহজ হবে না। উন্নত কিছু দেশের এল নিনোর ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য আছে। তাদের উন্নত অবকাঠামো এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম (যদিও এ বছর তীব্র তাপদাহে ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রের বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে)। এল নিনোর আশঙ্কায় মহাসংকটে বাংলাদেশের মতো আরও কয়েকটি দেশ। এর বিরূপ প্রভাবের অভিযোজন ঘটিয়ে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে জীবন, কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে এল নিনোর ক্ষতিকর প্রভাব সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়। জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, কৃষি ও জীবনযাপনকে দিতে হবে অগ্রাধিকার।

লেখক : দুর্যোগ, জলবায়ু ও পরিবেশ গবেষক। উপাচার্য, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত