শঙ্কা কাটেনি ঈদের সিনেমার

ঘনিয়ে এসেছে সময়। তবে এখনো জটিলতা থেকে মুক্ত হতে পারছে না ঈদের সিনেমা। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ঈদের সিনেমা উন্মুক্ত করায়, সেন্সর ছাড়পত্র নিয়ে যেকোনো নির্মাতাই মুক্তি দিতে পারছেন তার সিনেমা। এই নিয়ম চালু করার শুরুর দিকে রীতিমতো হিড়িক পড়ে যেত সিনেমা মুক্তির। এক ঈদে একই নায়ক-নায়িকার একাধিক সিনেমা দেখতে পেতেন দর্শক। এরপর ধীরে ধীরে শাকিব খানের ছবি একচেটিয়া ব্যবসা করার দরুন এক সময় শুধু এই নায়কেরই ছবি দেখা যেত ঈদে। দেখা গেছে নিজের সঙ্গে নিজেকেই লড়াই করতে হয়েছে শীর্ষ এই নায়ককে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে অনেক কিছু, কমে গেছে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যাও। এমতাবস্থায় এবার ঈদে দেখা দিয়েছে ব্যবসায়িক বিপর্যয়ের শঙ্কা। শুরুতে কয়েকটি সিনেমার নাম শোনা গেলেও একদম শেষ সময়ে বেড়ে গেছে মাত্রাতিরিক্ত সিনেমার সংখ্যা।

চলতি সপ্তাহে ঈদের ছবির তালিকায় যোগ হয়েছে  আরও একগুচ্ছ নাম। ঢালিউডে এমন দৃশ্য অনেক দিন দেখা যায়নি। যদিও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি, কোন কোন সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে এবার, তবে তালিকা অনুযায়ী দশের অধিক সিনেমা মুক্তির চূড়ান্ত প্রস্তুতির মিছিলে রয়েছে। একই সঙ্গে খবরটি খুশির এবং দ্বিধারও। ছবি ব্যবসায়ীদের মনেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অস্বস্তি। কারণ, দেশের সীমিতসংখ্যক প্রেক্ষাগৃহে এতগুলো সিনেমা একসঙ্গে জায়গা পাবে কীভাবে সেই প্রশ্ন এখন নির্মাতা, প্রযোজক, পরিবেশক থেকে শুরু করে হল মালিকদের মুখে মুখে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত দর্শকই বা পছন্দের একাধিক চলচ্চিত্র কীভাবে দেখবে? ব্যস্ত জীবনে সময় করে উঠতে পারবেন তো?

এবার ঈদে মুক্তির তালিকায় রয়েছে  রকস্টার, মাসুদ রানা, রইদ, মালিক, দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল, পিনিক, তছনছ এবং বনলতা সেন ও নাকফুলের কাব্য। তবে গতকাল নাকফুলের কাব্যটির মুক্তি স্থগিত করেছে এর প্রযোজনা সংস্থা বেঙ্গল মিডিয়া। বনলতা সেনও পড়েছে আইনি জটিলতায়। তারপরও কাটছে না শঙ্কা। বেশির ভাগ সিনেমাই বড় তারকা ও বড় বাজেটনির্ভর হওয়ায় মাল্টিপ্লেক্স ও সিঙ্গেল স্ক্রিন দুই ধরনের হলেই তৈরি হয়েছে তীব্র চাপ। একই সময়ে এতগুলো সিনেমা মুক্তি পাওয়ায় স্ক্রিন ভাগ হয়ে যাচ্ছে, ফলে অনেক সিনেমাই প্রত্যাশিত শো পাচ্ছে না। বিশেষ করে সিনেপ্লেক্সগুলোয় বড় বাজেট ও তারকানির্ভর ছবিগুলো অগ্রাধিকার পেলে মাঝারি বাজেটের সিনেমাগুলো আরও বেশি চাপে পড়ছে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জল জানিয়েছেন, যেহেতু ঈদের সিনেমা উন্মুক্ত, সেহেতু দর্শক যেটা ভালো মনে করেন, সেটাই দেখবেন। তাতে আমরা কোনো বাধা দেখি না। কিন্তু ঈদকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র মুক্তির এই দৌড় ও প্রবণতা প্রযোজকদের ঝুঁকির কারণ। আমরাও হয়তো লাভবান হতাম যদি ঈদ ছাড়াও ভালো ভালো ছবিগুলো আসত। সারা বছরই তখন ব্যবসা থাকত, হলও চাঙা হতো। প্রযোজকদের বলব, এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে। এখন দেখা যাক কোথাকার জল কোথায় যায়।’

বিষয়টি নিয়ে স্টার সিনেপ্লেক্সের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে এটি ইন্ডাস্ট্রির জন্য খুবই খারাপ ফল বয়ে আনবে। সারা বছর দর্শক সিনেমা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নতুন দর্শক তৈরি হচ্ছে না। হলমালিকরাও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।’ তিনি জানান, প্রদর্শক সমিতি, প্রযোজক ও পরিবেশকদের মধ্যে জরুরি সমন্বয় প্রয়োজন। কোন সময় কোন ছবি মুক্তি পাবে, সেটি নির্ধারণ করা গেলে সবাই উপকৃত হবেন।

অন্যদিকে মাসুদ রানা চলচ্চিত্রের প্রযোজক ও পরিবেশক আব্দুল আজিজ ধারণা করছেন, একসঙ্গে এত সিনেমা মুক্তির পরিস্থিতি কোনোভাবেই সুস্থ প্রতিযোগিতা নয়। তবে নিজের সিনেমা ঈদে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তকেই সঠিক বলে মনে করছেন তিনি। এই প্রযোজকের ভাষ্য, এটি কোনোভাবেই সুস্থ প্রতিযোগিতা না। কিন্তু ঈদ হচ্ছে সবচেয়ে বড় সিনেমা সিজন। সবাই চায় এই সময়ে দর্শকের কাছে পৌঁছাতে। সেই জায়গা থেকে আমরাও ‘মাসুদ রানা’ ঈদেই মুক্তি দিচ্ছি।

তবে প্রতিযোগিতার বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন মালিক চলচ্চিত্রের পরিচালক সাইফ চন্দন। তার মতে, ঈদ ছাড়া অন্য সময়ে বড় সিনেমা মুক্তি দেওয়া কঠিন। সাইফ চন্দন বলেন, ‘ঈদ ছাড়া কেন রিলিজ দেব, কোথায় রিলিজ দেব, কে দেখবে? এখানে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। এখানে আমরা সবাই কলিগ। প্রতিটি নায়ক, নায়িকা, নির্মাতা, প্রযোজক প্রত্যেকেই আপন।’ অন্যদিকে রইদ নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন বলছেন, গত দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক নির্মাতাই নিরাপদ সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি বলেন, ‘দুই বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা গেছে। কেউই আসলে চায় না এমন একটা টাইমে রিলিজ হয়ে গেল, যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অন্য কিছুর মাঝে পড়ে তার চলচ্চিত্রটি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। উৎসবকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র মুক্তিকে নেতিবাচকভাবে দেখছি না। আমাদের প্রযোজকও ইতিবাচকভাবেই দেখছেন পরিস্থিতি।’

সিঙ্গেল স্ক্রিনের প্রতিনিধিত্ব করে মধুমিতা সিনেমা হলের মালিক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, ‘এটা খুবই ব্যাড কালচার। একসঙ্গে এতগুলো ছবি ঈদে, ঈদের পর তো আমাদেরকে হলগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। তখন কী করব? কোনো ছবি থাকে না। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি এভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে। আমরা ‘রকস্টার’ দিয়ে শুরু করছি। এরপর দর্শক রেসপন্স বুঝে অন্য সিনেমাগুলো হলে তুলব।’