হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় অবস্থিত শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি এবং অগ্নিকাণ্ডের কারণে সরকারকে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, কেন্দ্রটির উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ১৮ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে, যা মাসে দাঁড়ায় প্রায় ৫৪০ কোটি টাকায়। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক অচলতায় সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শাহজীবাজার ১০০ মেগাওয়াট গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০২০ সালে পুরোদমে উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় এটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। ২০২১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার সময় এর টারবাইনের ব্লেড ভেঙে যায় এবং এরপর থেকেই দফায় দফায় যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিতে থাকে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিলে আবারও ব্লেড বিকল হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই কেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
প্রকল্প কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, গত চার বছরে এই কেন্দ্রটি মাত্র ১ হাজার ৬১০ ঘণ্টা সচল ছিল। এই সময়ে জাতীয় গ্রিডে ৬৪ কোটি টাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হলেও, পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি দৈনিক ২৪ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারত- যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। ফলে গত ছয় বছরে শুধু এই ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি থেকেই সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, প্রায় ২ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শাহজীবাজার ৩৩০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও চালুর পর থেকেই নানা যান্ত্রিক গোলযোগে পড়ে। পরবর্তীকালে ২০২২ সালের ২৯ মে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কেন্দ্রটির ট্রান্সফরমার পুড়ে গেলে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন মেরামত কাজ আটকে থাকায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, এই ৩৩০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় গত চার বছরে সরকার প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান জানান, বর্তমানে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট সচল করা সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দৈনিক প্রায় ৮ কোটি টাকা সাশ্রয় করছে। তবে বাকি দুটি ইউনিটও যদি দ্রুত চালু করা যেত, তাহলে প্রতিদিন আরও ১৬ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হতো।
টারবাইনের বারবার ত্রুটি হওয়া প্রসঙ্গে প্রকল্প ব্যবস্থাপক এ কে মফিজউদ্দিন আহমেদ জানান, ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের জন্য আন্তর্জাতিক মানের টারবাইন ব্যবহার করা হয়েছিল। কেন এটি বারবার বিকল হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞরা তদন্ত করছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯০ কোটি টাকা পিডিবি আটকে রেখেছে, যদিও ইতোমধ্যে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দ্রুত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ত্রুটিগুলো দূর করে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে না ফিরলে জাতীয় গ্রিডে যেমন বিদ্যুতের ঘাটতি থেকে যাবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের লোকসানের পাল্লাও ভারী হতে থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।