প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা আগামী দিনে একটি ভয়াবহ পারমাণবিক সংঘাতের রূপ নিতে পারে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে লন্ডন-ভিত্তিক স্বনামধন্য প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ (আইআইএসএস)।
সংস্থাটির মতে, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে সামরিক শক্তি প্রদর্শনে লিপ্ত হচ্ছে, তাতে যে-কোনো সময় দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী কমান্ড ও যোগাযোগ কেন্দ্রগুলো বড় ধরনের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের কথা জানিয়েছে। সিঙ্গাপুরে বসতে যাওয়া এশিয়ার বৃহত্তম বার্ষিক প্রতিরক্ষা সম্মেলনের ঠিক আগে প্রকাশিত এক কৌশলগত মূল্যায়নে আইআইএসএস জানিয়েছে, বিশ্ব আজ একটি নতুন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে এবং এই বিপজ্জনক প্রতিযোগিতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল।
আইআইএসএসের এই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার আঞ্চলিক শক্তিগুলো বর্তমানে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত দ্রুত বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, পারমাণবিক অস্ত্র নেই এমন দেশগুলোও দূরপাল্লার প্রচলিত হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করছে। এই দুই প্রবণতা অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি বড় আকারের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা তীব্র। চীন যে-কোনো মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তাইওয়ান থেকে দূরে রাখতে চায়। বিপরীতে, মার্কিন প্রশাসন তাইওয়ানের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চীনের চাপ মোকাবিলার কৌশল নিয়েছে। কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি বা সুরক্ষামূলক নিয়ম ছাড়াই দুই দেশ যদি এমন সামরিক অভিযানে জড়ায়, তবে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে পারমাণবিক যুদ্ধের সূত্রপাত করতে পারে।
আইআইএসএসের সিনিয়র ফেলো ড্যানিয়েল স্যালিসবারি এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, সাবেক স্নায়ুযুদ্ধের সময়েও ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে ঝুঁকি হ্রাসকরণের নানা প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা ও নিয়ম ছিল, কিন্তু বর্তমান চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেই আলোচনার সংস্কৃতি পুরোপুরি অনুপস্থিত। এমনকি সর্বশেষ ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলনেও পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে কোনো কথা হয়নি এবং বেইজিংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচির গোপনীয়তা এই আলোচনাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জিয়াং বিন এই প্রতিবেদনকে বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, তাইওয়ান ইস্যুটি সম্পূর্ণ চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এখানে কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মাও নিং-ও ওয়াশিংটনকে তাইওয়ান ইস্যুতে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন। অবশ্য বেইজিং বরাবরই বলে আসছে, তারা শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলন চাইলেও প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের বিকল্প হাতছাড়া করবে না।
আমেরিকান সায়েন্টিস্টস ফেডারেশনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে রাশিয়ার কাছে ৪,৪০০টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩,৭০০টি সক্রিয় পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে, যার তুলনায় চীনের সংগ্রহে রয়েছে মাত্র ৬২০টি। তবে মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, চীন অন্য যে-কোনো দেশের চেয়ে দ্রুত গতিতে নিজের পারমাণবিক সক্ষমতার আধুনিকায়ন করছে। পেন্টাগনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যেই চীনের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ১ হাজারে পৌঁছাতে পারে।
আগামী ২৯ থেকে ৩১ মে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী 'শাংরি-লা সংলাপ'। তিন দিনব্যাপী এই মেগা প্রতিরক্ষা সম্মেলনে তাইওয়ান সংকট, ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং এশিয়ায় মার্কিন নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হবে। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সেনাপ্রধান, গোয়েন্দা প্রধান ও কূটনীতিকরা অংশ নেবেন।
আগামী শনিবার ৩০ মে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এই সম্মেলনে বক্তব্য রাখবেন, তবে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডং জুন এতে অংশ নেবেন কিনা তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।