গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) চলমান ইবোলা প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে ১ হাজার ৩০৯ জনে পৌঁছেছে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা ৪০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, কার্যকর টিকা ও চিকিৎসার অভাবে ভাইরাসটি এখন ‘দাবানলের মতো’ ছড়িয়ে পড়ছে।
সরকারের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নিশ্চিত ইবোলা আক্রান্তের সংখ্যা, মৃতসহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৭৩ জনে। আগের সপ্তাহের তুলনায় এটি প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ডিআর কঙ্গোতে যে গতিতে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে, তা এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত ইবোলা প্রাদুর্ভাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করা মহামারিতে পরিণত হয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এবার যে বান্ডিবুগিও (Bundibugyo) প্রজাতির ইবোলা ভাইরাস ছড়িয়েছে, এটি মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটানো চারটি পরিচিত ধরনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিরল। এই ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা বা কার্যকর চিকিৎসা নেই।
আফ্রিকান ইউনিয়নের জনস্বাস্থ্য সংস্থা আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (আফ্রিকা সিডিসি) প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুলসালামি নাসিদি আল জাজিরাকে বলেন, কার্যকর টিকার অভাবের কারণে ভাইরাসটি ‘দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে’।
তিনি আরও বলেন, চলমান সংঘাতপূর্ণ এলাকায় এই মহামারি ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা সংকট এবং সীমিত স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর কারণে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে মহামারি নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানীরা দ্রুত সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপ জানিয়েছে, দ্রুত উদ্ভাবিত একটি পরীক্ষামূলক বান্ডিবুগিও ইবোলা টিকার প্রথম ডোজ শুক্রবার একজন স্বেচ্ছাসেবকের শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছে।
গবেষণা দলের প্রধান তদন্তকারী ক্যাটরিনা পোলক বলেন, 'এই পরীক্ষার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক এবং বান্ডিবুগিও ইবোলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা উদ্ভাবনের বহুজাতিক সহযোগিতামূলক যাত্রার নতুন ধাপ।'
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাব ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকার গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনে অন্তত ২৮ হাজার মানুষকে আক্রান্ত করে এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটায়। সেই প্রাদুর্ভাবে প্রথম এক হাজার মৃত্যু হতে প্রায় আট মাস সময় লেগেছিল। কিন্তু ডিআর কঙ্গোর বর্তমান প্রাদুর্ভাবে একই সংখ্যক মৃত্যু ঘটেছে ১০ সপ্তাহেরও কম সময়ে।
আফ্রিকা সিডিসির মহাপরিচালক জ্যাঁ কাসেয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, 'এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। আজ যদি এটি থামানো না যায়, তাহলে এটি বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাবে পরিণত হতে পারে।'
ডিআর কঙ্গোর গোমা শহর থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক অ্যালেইন উয়াইকানি জানান, সরকারের প্রতিক্রিয়ায় সমন্বয় ও জরুরিতার অভাব রয়েছে। ফলে চিকিৎসাকর্মীরা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করছেন।
সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, এক চিকিৎসক ও এক স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। মে মাসে প্রাদুর্ভাব ঘোষণার পর থেকে ১০০ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর ঘাটতির পাশাপাশি অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ এখনো রোগটির অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করছেন। এতে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল ইতুরি প্রদেশের কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বেতন-ভাতা বকেয়া এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশের প্রতিবাদে ধর্মঘটে নেমেছেন।
গত সপ্তাহে বুনিয়ার কাছে রওয়ামপারা জেনারেল হাসপাতালে কর্মবিরতি শুরু হয়। হাসপাতালটিতে একটি বড় ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে, যার কিছু অংশ মে মাসে ক্ষুব্ধ জনতার হামলায় আগুনে পুড়ে যায়। হামলার সময় স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যেতে হয়েছিল।
শনিবার প্রাদেশিক রাজধানী বুনিয়ার এলিকিয়া ইবোলা ট্রিটমেন্ট সেন্টারেও নতুন করে ধর্মঘট শুরু হয়। চিকিৎসক, নার্স ও নিরাপত্তাকর্মীরা কাজ বন্ধ করে দিলে কেন্দ্রটির কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।
প্রায় ১০০ জন কর্মী চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে বিক্ষোভ করে জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকি ভাতা ও অন্যান্য পাওনা না পাওয়ায় মনোবল ভেঙে পড়েছে এবং রোগীদের সেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
ধর্মঘটে অংশ নেওয়া কর্মী মার্টিন বোলোম্বি বলেন, 'আমাদের পাওনা পরিশোধ করতে হবে। এরই মধ্যে চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগটি আরও ছড়িয়ে পড়ছে। ভেতরে থাকা আমার পরিচিত পাঁচজন ইতোমধ্যে মারা গেছেন। দ্রুত একটি সমাধান প্রয়োজন।'
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস সতর্ক করে বলেছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, বর্তমানে পরিচিত সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশকে শনাক্ত করে নজরদারির আওতায় আনা গেলেও এখনো অনেক গ্রাম রয়েছে, যেখানে স্বাস্থ্যকর্মীরা পৌঁছাতে পারছেন না।
ডব্লিউএইচও এর মহাপরিচালক পূর্বাঞ্চলীয় ডিআর কঙ্গোর চলমান সংঘাত বন্ধে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, শুধু চিকিৎসাসামগ্রী নয়, রাজনৈতিক উদ্যোগও জরুরি। কারণ নিরাপদ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা না গেলে ভাইরাসটি নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে।