আন্তর্জাতিক গাড়ি বাজারে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে বৈশ্বিক অটোমোবাইল সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং জাপানের নামী-দামী ব্র্যান্ডগুলো এখন চীনা কোম্পানিগুলোর কাছে ক্রমাগত বাজার হারাচ্ছে। চীনের এই আগ্রাসী উত্থান কেবল বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং ব্যাটারি প্রযুক্তি, উন্নত সফটওয়্যার, আধুনিক ডিজাইন এবং দ্রুত উৎপাদন প্রযুক্তিতেও তারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি সমাপ্ত ‘অটো চায়না ২০২৬’ প্রদর্শনীতে চীনের এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
চীনের এই অভাবনীয় অগ্রগতি দেখে খোদ পশ্চিমা ও জাপানি গাড়ি নির্মাতারাও বিস্ময় প্রকাশ করছেন। জাপানি অটো-জায়ান্ট হোন্ডার প্রধান নির্বাহী তোশিহিরো মিবে সাংহাইয়ের স্বয়ংক্রিয় কারখানাগুলো দেখার পর স্বীকার করেছেন যে, চীনা প্রযুক্তির সাথে প্রতিযোগিতা করা এখন প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ফোর্ডের প্রধান নির্বাহী জিম ফার্লি বর্তমান পরিস্থিতিকে পশ্চিমা গাড়ি নির্মাতাদের জন্য একটি ‘টিকে থাকার লড়াই’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
গাড়ি বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি ছিল যে এই প্রতিযোগিতাটি কেবল পরিবেশবান্ধব বা বৈদ্যুতিক গাড়ির। প্রকৃতপক্ষে এই লড়াইটি হচ্ছে ভবিষ্যতের ‘মোবিলিটি প্রযুক্তি’ বা স্মার্ট পরিবহন ব্যবস্থার নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে তা নিয়ে। চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো—যেমন শাওমি, হুয়াওয়ে এবং আলিবাবা—এখন সরাসরি গাড়ি তৈরিতে যুক্ত হয়েছে। ফলে আধুনিক গাড়িগুলো এখন কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং পরিণত হয়েছে ‘চাকার ওপর স্মার্টফোনে’। যেখানে শাওমির কারখানায় প্রতি ৭৬ সেকেন্ডে একটি গাড়ি তৈরি হচ্ছে, সেখানে বিওয়াইডি নিয়ে এসেছে মাত্র ৫ মিনিটে ৪০০ কিলোমিটার চলার মতো সুপার-ফাস্ট চার্জিং প্রযুক্তি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) উপাত্ত অনুযায়ী, শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সস্তা ব্যাটারির কারণে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ কম। বছরের পর বছর ধরে পাওয়া সরকারি ভর্তুকি এই খাতকে শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রেখেছে, যা নিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকা আপত্তি তুললেও চীনের উদ্ভাবন থেমে থাকেনি। বর্তমানে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর অংশীদারত্ব আগের চেয়ে অর্ধেক হয়ে ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে। এমনকি বিলাসবহুল গাড়ির বাজারেও হুয়াওয়ের প্রিমিয়াম সেডানগুলো এখন বিএমডব্লিউ বা পোরশের মতো ব্র্যান্ডকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে।
এই কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে বিদেশি কোম্পানিগুলো এখন তাদের পুরনো নীতি বদলে চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ফক্সওয়াগেন এক্সপেংয়ের সফটওয়্যার প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। আবার স্টেলান্টিস চুক্তি করেছে চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ডংফেংয়ের সাথে। অন্যদিকে জেনারেল মোটরস (জিএম) এবং বেশ কিছু জাপানি ব্র্যান্ড চীনের বাজারে বড় ধরনের লোকসান ও বিক্রয় ঘাটতির মুখে পড়েছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র ১০০ শতাংশের বেশি শুল্ক আরোপ করে চীনা গাড়ির প্রবেশ পথ আটকে দিয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও উচ্চ শুল্ক বসাচ্ছে, তা সত্ত্বেও চীনা ব্র্যান্ডগুলোর বৈশ্বিক বিস্তার থামানো যাচ্ছে না। বিওয়াইডি এবং চেরির মতো ব্র্যান্ডগুলো ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যের বাজারে দ্রুত নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু ইতিমধ্যে চীনের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে। এই বাস্তবতায় যারা চীনের সাথে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াবে তারাই টিকে থাকবে, আর যারা কেবল বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে তারা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়বে।
সূত্র: বিবিসি