কালবৈশাখীর তাণ্ডবে সাতক্ষীরায় শিশু নিহত, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত

সাতক্ষীরার উপকূলে হঠাৎ আঘাত হানা কালবৈশাখী ঝড়ে তালগাছ চাপায় শারমিন (৯) নামে এক শিশু নিহত হয়েছে। একই ঝড়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। 

শুক্রবার (২৯ মে) বিকেলে শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুর গ্রামে মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে উপকূলীয় গাবুরা ইউনিয়নে ঝড়ের তাণ্ডবে কয়েকটি নিম্নআয়ের পরিবারের বসতঘরের টিনের চালা উড়ে গিয়ে মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। 

সাতক্ষীরার উপকূলজুড়ে হঠাৎ আছড়ে পড়া কালবৈশাখী ঝড়ে একদিকে যেমন কেড়ে নিয়েছে এক শিশুর প্রাণ, অন্যদিকে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বহু নিম্নআয়ের মানুষের বসতঘর। ঝড়ের তীব্রতায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও গাছ ভেঙে পড়ে প্রাণহানি ঘটেছে, কোথাও উড়ে গেছে ঘরের টিনের চালা, আবার কোথাও কৃষকের বছরের স্বপ্ন ভেসে গেছে ঝড়ের তাণ্ডবে।

একই দিনে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে তালগাছ চাপায় শারমিন (৯) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। নিহত শারমিন ওই গ্রামের আব্দুর রউফের মেয়ে।

নিহতের পরিবারের বরাতে শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, বিকেলে বাড়ির পাশে খেলছিল শিশু শারমিন। এ সময় হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় শুরু হলে একটি তালগাছ ভেঙে তার ওপর পড়ে। গুরুতর আহত অবস্থায় পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান জানান, সন্ধ্যায় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়।

এদিকে একই ঝড়ে শ্যামনগরের উপকূলীয় গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা এলাকায় কয়েকটি পরিবারের ঘরবাড়ি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিকেলে হঠাৎ শুরু হওয়া ঝড়ের তাণ্ডবে মুহূর্তেই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঝড়ের তীব্রতায় আশরাফুলের বসতঘরের ছয় থেকে সাতটি টিনের চালা উড়ে গিয়ে ভেঙে পড়ে। একই এলাকায় মোকছেদ গাজীর ঘরের দুই পাটের মধ্যে এক পাটের চাল সম্পূর্ণ ছিঁড়ে উড়ে গেছে।

ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত আশরাফুল বলেন, ‘ঝড় শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরের টিন উড়ে যায়। এখন পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে থাকতে হবে। নিজের টাকায় ঘর মেরামত করার সামর্থ্য নেই।’

মোকছেদ গাজী বলেন, ‘ঘরের চাল ভেঙে গেছে। সামনে বৃষ্টি হলে থাকার মতো অবস্থা থাকবে না। দ্রুত সহায়তা দরকার।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলেও নিম্নআয়ের মানুষের পক্ষে এমন ক্ষতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

স্থানীয় সচেতন মহল ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে বিত্তবান ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও এনজিওগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে জরুরি পুনর্বাসন ও সহায়তার দাবি জানানো হয়েছে।

এদিকে অনুরূপ কালবৈশাখী ঝড়ে সাতক্ষীরার কলারোয়া, আশাশুনি ও তালা উপজেলাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ঝড়ের দাপটে গাছ থেকে ঝরে পড়েছে প্রচুর আম। পাশাপাশি কৃষিজমিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম।

উপকূলবাসীর অভিযোগ, প্রতিবছর দুর্যোগের মুখে তাদের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়লেও টেকসই সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনও নিশ্চিত হয়নি। ফলে কালবৈশাখীর মতো আকস্মিক ঝড় এলেই আতঙ্ক, ক্ষতি আর অনিশ্চয়তা যেন উপকূলের মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।