বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক অনন্য অধ্যায়ের নাম। তিনি শুধু একজন রাষ্ট্রনায়কই ছিলেন না; ছিলেন এক দূরদর্শী কূটনীতিক, যিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এক সাহসী ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছিলেন। তাঁর সময়কার বিশ্ব ছিল শীতল যুদ্ধের বিভক্ত পৃথিবী-একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বলয়, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক জোট। এই জটিল আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জন্য এমন এক পররাষ্ট্রনীতি নির্মাণ করেন, যার ভিত্তি ছিল জাতীয় স্বার্থ, বহুমাত্রিক কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন এবং বিশ্বশান্তির প্রতি দায়বদ্ধতা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের অবস্থান ছিল অনেকটাই অনিশ্চিত। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈদেশিক নির্ভরশীলতা-সব মিলিয়ে রাষ্ট্রটি তখনও আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত। এমন এক সময়ে ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে, শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন নয়; বরং একটি শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ ও আত্মমর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতিই পারে বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার পথে এগিয়ে নিতে। তাই তিনি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’-এই নীতিকে নতুন বাস্তবতায় প্রয়োগ করেন আরও কৌশলী ও কার্যকরভাবে। জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর বাস্তববাদিতা। তিনি বুঝেছিলেন, আবেগ দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালিত হয় না; বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থই কূটনীতির মূল ভিত্তি। তাই তিনি একদিকে যেমন মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেন, অন্যদিকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। একইসঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি সমতার ভিত্তিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নকে গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে অনেক আরব রাষ্ট্র দ্রুত স্বীকৃতি দেয়নি। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক, বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিভাজন এবং অভ্যন্তরীণ নানা কারণের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ বাংলাদেশের প্রতি সতর্ক অবস্থানে ছিল। জিয়াউর রহমান সেই অচলাবস্থা ভেঙে মুসলিম বিশ্বের আস্থা অর্জনে সক্ষম হন। তিনি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্ক জোরদার করেন। এর ফলে বাংলাদেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয় এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্স অর্থনীতির নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করে। মুসলিম বিশ্বের আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ওআইসিতে বাংলাদেশের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতেও তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঐক্য বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ওআইসিতে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জন করে। তিনি শুধু আনুষ্ঠানিক সদস্য হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংকট নিরসনে সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছিলেন। বিশেষত ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলাকালে তাঁর শান্তি উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছিল। ইরান ও ইরাক-দুটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যকার ভয়াবহ যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। যুদ্ধটি শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মুসলিম ঐক্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছিল। এই প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান যুদ্ধ বন্ধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। তিনি ওআইসির প্ল্যাটফর্মে উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। মুসলিম বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক। জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক দর্শনের আরেকটি বড় অর্জন ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা প্রতিষ্ঠা। দক্ষিণ এশিয়া ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সীমান্তসংঘাত, দারিদ্র্য ও পারস্পরিক অবিশ্বাসে জর্জরিত একটি অঞ্চল। ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি পারস্পরিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারে, তাহলে পুরো অঞ্চলই উপকৃত হবে। এই ভাবনা থেকেই তিনি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠনের উদ্যোগ নেন। ১৯৮০ সালে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব পাঠান। তাঁর সেই দূরদর্শী উদ্যোগই পরবর্তীতে সার্ক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে। যদিও সার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে, কিন্তু এর বীজ বপন করেছিলেন জিয়াউর রহমানই। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এটি ছিল এক যুগান্তকারী কূটনৈতিক উদ্যোগ। কারণ, এটি ছিল সংঘাতের রাজনীতির পরিবর্তে সহযোগিতার রাজনীতিকে সামনে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান এক ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক একদিকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আবদ্ধ, অন্যদিকে পানি বণ্টন, সীমান্ত, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে নানা জটিলতায় পূর্ণ। জিয়াউর রহমান ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলেও তিনি বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেন। বিশেষ করে গঙ্গার পানি বণ্টন ইস্যুতে তিনি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসরে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবিকে তুলে ধরেন। তাঁর নীতি ছিল-বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু তা হবে মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন ছিল তাঁর পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। স্বাধীনতার পর চীন বাংলাদেশের প্রতি প্রথমদিকে ইতিবাচক অবস্থানে ছিল না। কিন্তু জিয়াউর রহমান বাস্তববাদী কূটনীতির মাধ্যমে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পথ তৈরি করেন। চায়নার সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার ফলে বাংলাদেশ নতুন বাণিজ্যিক ও সামরিক সহযোগিতার সুযোগ পায়। চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন বাংলাদেশের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও তিনি বাস্তবমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাঁর সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সাহায্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা অর্জন করে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কঠিন হবে। তাই তিনি বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দেন। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামেও তাঁর ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বিশ্বশান্তি, নিরস্ত্রীকরণ, উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক অধিকার এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে সোচ্চার অবস্থান গ্রহণ করেন। ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রতি তাঁর সমর্থন মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি করে। একইসঙ্গে তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ও নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির একটি মানবিক দিকও ছিল। তিনি কেবল রাষ্ট্রীয় কৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে দেখেননি; বরং মানুষের জীবনমান, অর্থনৈতিক সুযোগ ও বৈশ্বিক শান্তির সঙ্গে এর সম্পর্ককে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ফলে লাখো বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। আজ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স যে অন্যতম প্রধান শক্তি, তার ভিত্তি নির্মাণেও তাঁর কূটনৈতিক উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তাঁর পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদের এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়। তিনি যেমন বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তা ও সার্বভৌম মর্যাদাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তাকেও সমানভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে পররাষ্ট্রনীতি ছিল কেবল রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জনের একটি কার্যকর হাতিয়ার। আজকের বিশ্বে যখন ভূরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, পরাশক্তির প্রতিযোগিতা নতুন রূপ নিচ্ছে এবং ছোট রাষ্ট্রগুলোকে কৌশলী ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে, তখন জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তাঁর কূটনৈতিক দর্শন আমাদের শেখায়-একটি ছোট রাষ্ট্রও দূরদর্শী নেতৃত্ব, আত্মমর্যাদাবোধ ও বাস্তববাদী কৌশলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে তাঁর অবদান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে বহুমাত্রিক ও গতিশীল রূপ দিয়েছিলেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন, ওআইসিতে সক্রিয় ভূমিকা, ইরান-ইরাক যুদ্ধের শান্তি উদ্যোগ, সার্ক প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা-সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ স্থপতি।
ইতিহাসে কিছু মানুষ কেবল একটি সময়কে নেতৃত্ব দেন না; তারা ভবিষ্যতের জন্যও একটি দিকনির্দেশনা রেখে যান। জিয়াউর রহমান তেমনই এক রাষ্ট্রনায়ক, যিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির মানচিত্রে আত্মবিশ্বাসী একটি রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ছিল আত্মমর্যাদা, বাস্তববাদ, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বিশ্বশান্তির এক সমন্বিত দর্শন-যার প্রতিধ্বনি আজও বাংলাদেশের কূটনৈতিক অভিযাত্রায় অনুভূত হয়।
লেখক: উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়