নার্ভাস সিস্টেমকে খুব সাধারণ ভাবে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম ও পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেম। মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ড হলো সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের অংশ। আর পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেমের অংশ হলো সোমাটিক ও অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেম। সোমাটিক নার্ভাস সিস্টেম হলো যেটি আমাদের আয়ত্বাধীন। যেমন আমরা হাত, পা নাড়াচাড়া করি, কেটে গেলে ব্যথা পাই। অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেম আমাদের আয়ত্ত্বাধীন নয়। মানে এটি নিজে নিজে কাজ করে। অটো-পাইলটের মত। যেমন আমাদের রক্তচাপের প্রেসার, হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস এগুলো অটোমেটিক মেইনটেইন হয়। এ কাজটি করে অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেম।
অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি কি?
কোন কারণে অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেম যদি ফাংশন ঠিক মত না করে তবে তাকে অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি বলে। যেমন আমাদের রক্তচাপ ১২০/৮০ মিলিমিটার মার্কারি মেইনটেইন হয়। কিন্তু অটোনোমিক নিউরোপ্যাথিতে এটা ঠিক মত মেইনটেইন হয় না। যেমন, আমরা যদি বসে থাকি বা শুয়ে থাকি কিংবা দাঁড়িয়ে থাকি তাহলে রক্তচাপ কিন্তু একই থাকে। অটোনোমিক নিউরোপ্যাথিতে আক্রান্ত কেউ দাঁড়ালে তার রক্তচাপ কমে যায়। ফলে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বিঘ্নিত হয়। এতে করে মাথা ঘোরায় বা ক্ষেত্র বিশেষে অজ্ঞান হয়ে যায়। একে বলে অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন। এছাড়া শুয়ে পড়লে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।
হৃদস্পন্দনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন, হৃদস্পন্দন অতিরিক্ত কমে যেতে পারে বা অতিরিক্ত বেড়ে যেতে পারে। এটা থেকেও অজ্ঞান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া আরোও কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে যেমন পেট ভরা ভরা থাকা, খাবার ঠিক মত হজম না হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া। প্রশাব-পায়খানারও সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন মুত্র ধরতে না পারা বা ফোটায় ফোটায় মুত্র হওয়া। যৌনমিলনে সমস্যাও কিন্তু দেখা দিতে পারে।
সাহাবুদ্দিন চুপ্পু কেন অটোনোমিক নিউরোপ্যাথিতে আক্রান্ত?
অটোনোমিক নিউরোপ্যাথির অনেক কারণ আছে। মুল কারণ হল ডায়াবেটিস। ডায়াবেটিস নার্ভের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। ডায়াবেটিস ছাড়া আরোও কারণ আছে। সেটা আলোচনা না করি।
সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর দীর্ঘদিন থেকে ডায়াবেটিস। মনে হয় অনিয়ন্ত্রিত। ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন ও অনিয়ন্ত্রিত হলে নার্ভের ক্ষতি হয় বেশি। ৬০-৭০ শতাংশ ডায়াবেটিক রোগী কোন কোন ধরনের নিউরোপ্যাথিতে ভোগেন। আর অটোনোমিক নিউরোপ্যাথিতে ভোগেন ৩০ শতাংশ ডায়াবেটিক রোগী। এ ডায়াবেটিসের কারণে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু অটোনোমিক নিউরোপ্যাথিতে আক্রান্ত হয়েছেন।
সাহাবুদ্দিন চুপ্পু কেন অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন?
আমি আগেই বলেছি অটোনোমিক নিউরোপ্যাথির কারণে রক্তাচাপ ও হৃদস্পন্দন ঠিক মত মেইনটেইন হয় না। সব তথ্য বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশনে আক্রান্ত। মানে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু দাঁড়ালে রক্তচাপ মেইনটেইন হয় না। উল্টো রক্তচাপ কমে গিয়ে মাথা ঘোরানো ও জ্ঞান হারানোর অবস্থা হয়।
সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর চিকিৎসা কি?
সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বেস্ট চিকিৎসা হলো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা। স্ট্রিক্টলি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এরপর যেটা জরুরি তা হলো কিছু বিষয় মেনে চলা যেমন
১. পর্যাপ্ত পানি পান
দৈনিক ২–২.৫ লিটার (যেহেতু তার কিডনি রোগ আছে তাই নেফ্রলজিস্টের পরামর্শ নিতে হবে)
২. লবণ গ্রহণ বাড়ানো
দৈনিক ৬–১০ গ্রাম লবণ (যদি না কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকে)
৩. দ্রুত ৫০০ মি.লি. পানি পান
উপসর্গ শুরু হলে ৫–১০ মিনিটে ৫০০ মি.লি. পানি পান করলে সাময়িকভাবে রক্তচাপ বাড়তে পারে।
৪. Compression stockings
Waist-high compression stockings (৩০–৪০ mmHg) বেশি কার্যকর।
Abdominal binder অনেক রোগীর ক্ষেত্রে আরও উপকারী হতে পারে।
৫. ধীরে অবস্থান পরিবর্তন
হঠাৎ দাঁড়ানো যাবে না। আগে বসতে হবে তারপর ধীরে দাঁড়াতে হবে।
৬. Head-up sleeping
বিছানার মাথার দিক ১০–২০ সেমি উঁচু করে ঘুমাতে হবে।
৭. ছোট ছোট খাবার
বড় মিলের পরিবর্তে ছোট ও ঘন ঘন খাবার খেতে হবে
অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট এড়িয়ে চলতে হবে।
৮. Counter-pressure manoeuvres
উপসর্গ শুরু হলে:
পা ক্রস করে দাঁড়ানো, উরু ও নিতম্বের পেশী শক্ত করে ধরা, হাত শক্ত করে চেপে ধরা (handgrip)
সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর রোগের কি ওষুধ নাই?
জি, অবশ্যই আছে। কয়েক প্রকারের ওষুধ পাওয়া যায় যেমন মিডোড্রিন, ফ্লুড্রোকর্টিসন, ড্রোক্সিডোপা, পাইরিডোস্টিগমিন ইত্যাদি। এদের মধ্যে ফ্লুড্রোকর্টিসন, পাইরিডোস্টিগমিন দেশের ওষুধ কোম্পানি তৈরি করে।
সাহাবুদ্দিন চুপ্পু চিকিৎসা কি দেশে সম্ভব?
সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর চিকিৎসা পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা করেছি। কোনটা কি দেশে অসম্ভব? না, সব ধরণের চিকিৎসাই সম্ভব। আর এমন কোন তো জাদুকরী ওষুধ নাই যেটা প্রয়োগ করলে অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি রাতারাতি ভালো হয়ে যাবে।
আমাদের দেশে অসংখ্য উন্নত ও বিশ্বমানের ডায়াবেটোলজিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট ও নিউরোলজিস্ট আছেন। তাদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড করে দেশেই চিকিৎসা সম্ভব। এতে করে জনগণ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরে পাবেন।
সহযোগী অধ্যাপক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস